‘এক অভিনেত্রীকে পরপর ৩ বার পুরস্কার দিয়ে হ্যাট্রিক করাবে বলে আমায় বাদ দেয়’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

লিলি ফুলের মতো ছোটবেলায় দেখতে ছিল মেয়ে। তাই ছোটমামা নাম রেখেছিলেন লিলি। যদিও আসল নাম জ্যোৎস্না। কিন্তু লিলি নামটাই সবার পছন্দ হয়ে গেল, সেই থেকেই লিলি। বাংলা ও হিন্দি ছায়াছবির উজ্জ্বল নাম লিলি চক্রবর্তী। উত্তম কুমার, অমিতাভ বচ্চন থেকে মিঠুন চক্রবর্তী যার রূপমুগ্ধ। সত্যজিৎ রায়, গুলজার থেকে ঋতুপর্ণ, সৃজিত, কৌশিক যাঁর গুণমুগ্ধ। তিনিই অকপট সাক্ষাৎকার দিলেন দ্য ওয়ালকে।

লিলি চক্রবর্তী সদ্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন সহ-অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে। ‘সাঁঝবাতি’ ছবিতে সুলেখা মিত্র চরিত্রটি করে পুরস্কৃত তিনি। এই একই রোলের জন্য বিএফজেএ পুরস্কারও গত বছর পেয়েছেন। যে পুরস্কার দুটি বহু কাঙ্ক্ষিত ছিল, তা অন্তত অনেক পরে হলেও পেলেন তিনি।

ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্থাৎ ব্ল্যাক লেডি পেয়ে কেমন লাগল? সহ-অভিনেত্রী ক্যাটেগরি হলেও আপনার দিদা চরিত্রটা ঘিরেই গল্পটা তাই প্রধান চরিত্রই বলা যায়।

হ্যাঁ, সুলেখা মিত্র চরিত্র। আমাকে ঘিরেই ‘সাঁঝবাতি’র গল্পটা। প্রাইজটা আমি আনতে যেতে পারিনি তাই আমার একজন প্রতিনিধিকে পাঠিয়েছিলাম সে গিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি তো আগে জানতাম না ফিল্মফেয়ার পাব। নমিনেশনে ছিল আমার চরিত্রটা। ওরা আমায় অনেকদিন ধরেই বলছিল যেতে। যখন খুব জোর করছিল, তখন আমি বলি, ‘জোর করছো কেন, আমি তো নমিনিতে আছি।’

তখন একটা হোয়াটসঅ্যাপ লিখে পাঠাল, ‘আপনি যদি না আসেন আপনার অ্যাওয়ার্ডটা কে নেবে?’ তখন বুঝতে পারলাম। তাও আমি ওঁদের আর ফোন করিনি। তারপর যাকে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলাম সে আমাকে ফোন করে জানাল ‘সাঁঝবাতি’র জন্য তোমাকে দেওয়া হয়েছে ফিল্মফেয়ার।

আমার খুব আনন্দই হল। সাঁঝবাতির প্রযোজক অতনু রায়চৌধুরী আমাকে বলেছিল ‘দিদি তুমি এই রোলটা করো, তোমাকে ভেবেই চরিত্রটা করা।’ তারপর লীনা গঙ্গোপাধ্যায় আর শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালক ছিল ‘সাঁঝবাতি’র। আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম ওঁদের জন্যই ফিল্মফেয়ার পুরস্কারটা পেয়েছি। এটা আমার অনেক দিনের আশা ছিল, ব্ল্যাক লেডি কবে পাব। ফিল্মফেয়ার অনুষ্ঠানে আগেও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গেছি, সবাইকে ব্ল্যাক লেডি হাতে নিয়ে ঘুরতে দেখেছি। খালি মনে হত আমি কবে ব্ল্যাক লেডি পাব। যাই হোক, পেলাম। আমি খুশি, সবাই খুব খুশি।

এই ‘সাঁঝবাতি’র জন্য গতবছর বিএফজেএ পুরস্কারও পেয়েছিলেন তো?

হ্যাঁ বিএফজেএ আমি নিজে আনতে গেছিলাম গত বছর। তখন করোনা সংক্রমণ আসেনি। তাই যেতে পেরেছিলাম।

বিএফজেএ পুরস্কার হাতে লিলি।

আপনার প্রথম যৌবনে বা যখন আপনি মধ্যগগনে, তখন পুরস্কার নিয়ে আপনার অপ্রাপ্তি আছে? কারণ অনেক ভাল চরিত্র করেও পুরস্কারের তালিকা আপনার অভিনয় জীবনে নিতান্ত কম।

সে এখন আর বলে কী হবে! অনেক পুরস্কার আমার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলা চলে। আমি যখন ‘ফুলেশ্বরী’তে অভিনয় করলাম তনু বাবু (তরুণ মজুমদার) একদিন মেক আপ রুমে এসে বললেন ‘লিলি দেবী এই বৌদি চরিত্রে আপনি প্রাইজ পাবেনই পাবেন।’ কিন্তু পেলাম না। এরকম পরপর তিন বার ভাল চরিত্র করেও পুরস্কার পাইনি। তখন সবথেকে জনপ্রিয় ছিল বিএফজেএ পুরস্কার।

একজন অভিনেত্রীকে তিন বার পুরস্কার দিয়ে হ্যাট্রিক করাবে বলে ওঁকেই তিন বার তিন বছর বিএফজেএ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

কে ছিলেন সেই অভিনেত্রী?

না, আমি বলব না সেটা। এখন বলে তো কোনও লাভ নেই অত বছর আগের কথা, যা হবার হয়ে গেছে। যাই হোক, আমি আর সে নিয়ে কষ্ট বয়ে বেড়াইনি। কষ্ট কি আর হয়নি! দর্শক দেখে প্রশংসা করছে আমার অথচ পুরস্কারের বেলায় জোটেনি।

আমি জানি তখন ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই আমাকে ইগনোর করত। কিন্তু আমার বর আমাকে খুব সার্পোট করতেন। উনিই ছিলেন আমার মনের জোর। উনি বলতেন ‘দেখো, ওই পুরস্কারটা তোমার ভাগ্যে ছিল না। আর জানোই তো সবাই তোমাকে অবহেলা করে। তাই কষ্ট পেয়ো না। তোমার গুণ তোমায় ঠিক একদিন সম্মান দেবে।’

আসলে আমি যতই ভাল রোল করি, সেই প্রশংসাটাও ইন্ডাস্ট্রির ওঁদের মুখ থেকে কখনও শুনিনি। বাইরের লোক দর্শকরা প্রশংসা করেছে কিন্তু পুরস্কার কমিটি সেই সময় আমার অভিনয়ের প্রশংসা করেনি, করতে চাইনি।

আক্ষেপ আজ আর নেই। আজ আমি শেষ জীবনে হলেও বিএফজেএ এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কার দুটোই পেলাম। কিন্তু আমি ‘সাঁঝবাতি’র জন্য বিএফজেএ পুরস্কার নেওয়ার সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম ‘একজনকে হ্যাট্রিক করানোর জন্য আমাকে দেওয়া হয়নি এ পুরস্কার আগে। আমি অনেকগুলো ভাল ভাল রোল করেছিলাম। কেদার রাজা, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, ফুলেশ্বরীতে খুব গুরত্বপূর্ণ চরিত্র করেছিলাম, যা দেখে দর্শক উচ্ছসিত হয় আজও। কিন্তু বিএফজেএ-র তখনকার কমিটি আমার পুরস্কার কেড়ে নিয়েছিল।

‘কেদার রাজা’তেও আপনিই নায়িকা ছিলেন। এই ‘কেদার রাজা’ করতে গিয়েই তো পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘হংসমিথুন’ ছবিতে আপনার নায়িকার রোল হাতছাড়া হয়ে যায়?

পার্থপ্রতিমই একটা সাজানো ঘটনা ঘটিয়েছিল আমাকে বাদ দেবে বলে। পুরোটাই ইচ্ছে করে করেছিল পার্থপ্রতিম। ‘কেদার রাজা’র আগেই আমার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল পার্থপ্রতিমের, ‘হংসমিথুন’-এ নায়িকার রোল করার।

শুভেন্দুদা হিরো ছিলেন। পার্থপ্রতিমরা জানত আমি ‘কেদার রাজা’র আউটডোরে আছি। হঠাৎ আউটডোরে প্রোডাকশান ম্যানেজারকে দিয়ে খবর পাঠাল, পরের দিনই শ্যুটিং ওদের ছবির। আমাকে যেতে হবে। আমি বললাম ‘কী করে সম্ভব! আমার এখানে ‘কেদার রাজা’র আউটডোর চলছে। তোমরা তো ডেট দিতে বলোনি আগে থেকে।’ আমি যেতে পারিনি।

ওরা জানত আমি যেতে পারব না, তাই বলে দিল লিলি চক্রবর্তীকে বাদ দিয়ে দাও। আসলে পার্থপ্রতিমের সঙ্গে তখন অপর্ণা সেনের মাখোমাখো সম্পর্ক। তাই অপর্ণাই নায়িকা হলেন। অপর্ণাকে নেবে বলেই আমাকে প্ল্যান করে বাদ দিল। এমনকি আমাকে ওরা অ্যাডভান্সও করে দিয়েছিল। আমি টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। সেটা নেয়নি, উল্টে দোষ স্বীকার করে বলেছিল ‘ভুলটা তো আপনার নয়। ওটা তো আমাদের দোষ। আমরা তো চেয়েছিলাম আপনি করুন।’

যাই হোক আমার অপ্রাপ্তি আর কিছু নেই। যা পাইনি আগে, শেষ বয়সে এসে সব পেয়ে গেছি। আমার আজ আর কারও ওপর কোনও দুঃখ, অভিমান নেই। সবাই ভালবেসেই আজও আমাকে কাজে নেয়।

‘গৃহদাহ’ তেও তো শুনেছি আপনার রোল কেড়ে নেন এক নায়িকা?

হ্যাঁ, যিনি অভিনয়ে চমকে দেন বাঙালিকে। তখন তাঁর অনেক নামডাক। তিনি আমার রোল কেড়ে নেন। অফারটা আমায় খোদ উত্তমদাই দিয়েছিলেন। ‘গৃহদাহ’র প্রযোজক ছিলেন উত্তম কুমার। উত্তমদা ঠিক করেছিলেন আমাকে মৃণালের চরিত্রে নেবেন। উত্তমদা আর মিসেস সেন দুজনের সঙ্গেই আমার স্ক্রিন শেয়ার করার কথা। যদিও আমি সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘বিপাশা’তে আগে কাজ করেছি। আর উত্তমদার সঙ্গে ‘দেয়া নেয়া’ বিশাল হিট। কিন্তু ‘গৃহদাহ’তে আমার মৃণাল করা হল না। উত্তমদার কাছের এক নায়িকা ‘গৃহদাহ’র কাস্টিং শুনে বললেন ‘লিলি কেন? আমি ওর থেকে কম টাকায় কাজ করে দেব। তুমি আমাকে নাও।’

তাঁরা শুধু উত্তম কুমারের নায়িকা ছিলেন না আরও বেশি কিছু ছিলেন। তাই সেই ঘনিষ্ঠ অভিনেত্রীর কথাই উত্তমদাকে শুনতে হয়। আমার আর মৃণাল করা হল না। তিনি করলেন।

তিনি তো তাহলে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ? পরে আপনি সাবুদির সাথে কাজ করেছেন?

হ্যাঁ। সাবুদির সঙ্গে প্রচুর দেখা হয়েছে। পরে কাজও করেছি আমরা। আমি সাবুদির সঙ্গে ওসব নিয়ে আলোচনাই করিনি কখনও। কিন্তু সেই বড় মাপের নায়িকা আমার মতো কমবয়সি এক তরুণীর সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত ছুড়ে দিয়েছিলেন।

তবে যা গেছে গেছে। আমি কোনও দিন ফিরেও তাকাইনি। আমি জানি আমার ভাগ্যে যা আছে আমি ঠিক পেয়ে যাব। আমি যদি সৎ হই, আমি যদি অভিনয়কে ভালবেসে থাকি আমার যা প্রাপ্য আমি পেয়ে যাব। পাচ্ছিও এখন ভগবানের আশীর্বাদে।

‘গৃহদাহ’তে কাজ না করলেও ‘ভোলা ময়রা’য় উত্তমদার সঙ্গে কাজ করে দুঃখ অনেকটাই পুষিয়ে গেছিল। ‘ভোলা ময়রা’ করতে বম্বে থেকে ওই যে চলে এলাম, আর বম্বে যাওয়া হল না। থিয়েটারের জন্য জ্ঞানেশদা (মুখোপাধ্যায়) আমাকে আটকে দিলেন।

‘ফুলেশ্বরী’ করে আপনি বিএফজেএ পুরস্কার পেলেন না, কিন্তু ওই বৌদির রোল দেখেই আপনাকে ‘জন অরণ্য’তে সত্যজিৎ রায় কাস্ট করলেন কমলা বৌদির রোলে?

সত্যজিৎ বাবুর সঙ্গে আমার অনেক আগেই আলাপ হয়েছিল। যখন ‘অপুর সংসার’ হবে-হবে তখন উনি আমাকে ডেকেছিলেন। তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। আঠেরো বছর বয়স ছিল আমার। তো সত্যজিৎ বাবু আমার ছবিও অনেক তুলেছিলেন। সত্যজিৎ বাবু বলেছিলেন ‘আমার আর একটি মেয়ের সঙ্গে কথা হয়ে আছে। ওর একটা অসুবিধে আছে ব্যক্তিগত, সেটা যদি সলভ হয়ে যায় তাহলে হয়তো তোমাকে নিতে পারব না। তখন তুমি দুঃখ কোরো না।’

শেষ অবধি শর্মিলাই করল অপুর সংসারে। আমি আর দুঃখ-টুঃখ করিনি। যাই হোক, ‘ফুলেশ্বরী’ দেখে উনি আমাকে নিজে চিঠি লিখে ডেকে পাঠালেন। তার মাঝখানেও সত্যজিৎ বাবুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এয়ারপোর্টে, আমিও বম্বে যাচ্ছি উনিও যাচ্ছেন, একবার বোধহয় গোর্কি সদনেও দেখা হয়েছিল। আমি আর সামনে গিয়ে কখনও ওঁকে বলিনি, আপনার বাড়ি আগে ‘অপুর সংসার’-এর সময় গিয়েছিলাম। কোনও দিন ছবিতে নিতেও বলিনি। কিন্তু  ‘ফুলেশ্বরী’ দেখে ওঁর মনে হয়েছিল ‘জন অরণ্য’র কমলা বৌদির চরিত্রটা আমাকে মানাবে।

সেই রোলটা নিয়েও অনেক অভিনেত্রী দাবি করেছিল ‘আমায় দিন।’ তাঁরা বৌদিকে (বিজয়া রায়) গিয়ে ধরেছিল যে আপনি বললে সত্যজিৎ রায় দেবেন। বৌদিও সত্যজিৎ বাবুকে বলেছিলেন ‘ওরা সবাই বলছে কমলা বৌদির রোলটা করতে চায়।’ কিন্তু সত্যজিৎ বাবু বলেছিলেন, ‘না। এটা লিলিই করবে। লিলি ছাড়া কমলা বৌদি আর কাউকে মানাবে না।’

মানে সেটাও আমার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল আর কা! আসলে ওরা অনেক নামকরা অভিনেত্রী, ওরা ভেবেছিল ওরা বললে সত্যজিৎ রায় নিশ্চয়ই লিলিকে বাদ দিয়ে ওদের নেবেন। কিন্তু নেননি।

আবার পনেরো বছর পর সত্যজিৎ বাবু ডাকলেন। বললেন ‘শাখা প্রশাখা’তে বড় বউয়ের রোল করতে হবে।

আমার ভাগ্যে আর কিছু না থাক, ভাল ভাল পরিচালকদের সঙ্গে প্রচুর কাজ করেছি। বম্বেতেও করেছি, কলকাতাতেও করেছি। কিন্তু কোনও দিনও রোল পেতে কোন পরিচালকের বাড়ি হত্যে দিয়ে পড়ে থাকিনি। পরিচালকের সঙ্গে দেখা করা অনেকের সাপ্তাহিক রুটিনের মধ্যে পড়ত। তখন ভাবতাম লিলি তুমি কেন পারো না!

এই সমস্ত কারণেই হয়তো আজও টিকে আছি। আমার সমসাময়িক কেউ কেউ অভিনয়ে কল্কে না পেয়ে রাজনীতিতে মাথা গলিয়েছে। কাউকে শেষ বয়সে রোলের জন্য মাথা নোয়াতে হয়। অনেকে বাড়িতে বসে থেকে হতাশ। তাঁদের থেকে তো আমি ভাল আছি, অনেক সম্মান নিয়ে আছি। সৎ থাকলে জীবন তোমাকে ঠকাবে না।

আপনি যেমন সব প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন তেমন সব প্রজন্মের হিরোদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। একটু যদি নাম গুলো বলি …

উত্তম কুমার

‘দেয়া নেয়া’র দেওর-বৌঠান করে আমায় উত্তমদা বৌঠান বলেই ডাকতেন। উত্তমদার সঙ্গে আর একটা ছবিও করেছিলাম কয়েকদিন, ‘হার মানিনি’। কিন্তু উত্তমদার অকাল প্রয়াণে ছবিটা আর শেষ হল না। সেটাও আক্ষেপ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

সৌমিত্রদার সঙ্গে ছবিও যেমন করেছি তেমন নাটকেও কাজ করেছি। সৌমিত্রদার পরিচালনাতেও নাটক করেছি ‘ন্যায় মূর্তি’, ‘নামজীবন’। আবার শ্রুতি নাটক ‘শেষের কবিতা’ বিকাশ রায় পরিচালনা করেন। তাতে আমি লাবণ্য আর সৌমিত্রদা অমিত রায়।

অমিতাভ বচ্চন

টালিগঞ্জের আর্টিস্টদের নিয়ে একবার একটা গেট-টুগেদারের আয়োজন করা হয়। অমিতাভ কলকাতা এসেছিলেন ‘তিন’ ছবির শ্যুটিংয়ে। সেদিন অমিতাভের সঙ্গে মঞ্চ আলো করে বসে শর্মিলা, অপর্ণা, সন্দীপ রায় আর ‘তিন’ ছবির প্রোডিউসার সুজয় ঘোষ। কথায় কথায় ‘আলাপ’ ছবির প্রসঙ্গ উঠল, সঞ্চালক মীর অমিতাভকে বলে উঠল ‘দেখুন তো, দর্শকাসনের প্রথম সারির ওই ভদ্রমহিলাকে চিনতে পারেন কিনা?’

আমি হাত তুললাম। অমিতাভ কয়েক সেকেন্ড একেবারে চুপ, তারপর বলে উঠলেন ‘ আরে লিলিজি! ক্যায়সে হ্যায় আপ?’ মঞ্চ থেকে নীচে নেমে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। অমিতাভের হাতের স্পর্শে ওঁর সঙ্গে কাজ করার দিনগুলো মনে পড়ে গেছিল।

চিরঞ্জিৎ, প্রসেনজিৎ, জিৎ

অভিনেতা চিরজঞ্জিৎ পরিচালক চিরঞ্জিৎ দুজনের সঙ্গেই কাজ করেছি। খুব বুদ্ধিমান শিক্ষিত। আর বুম্বা তো সবসময় প্রিয়। ইন্ডাস্ট্রির জন্য যেভাবে ভাবে তা নজিরবিহীন। জিতের সঙ্গে ‘পিতৃভূমি’তে কাজ করেছিলাম। জিৎকে বলব যে ধরনের ছবি আজকাল ও করে সেগুলো কমিয়ে আগের পিতৃভূমির জিৎকে ফিরে পেতে চাই। ঐ বাঙালি জিৎকেই ভাল লাগে।

দেব

দেবের একটা ভাল কাজ করার চেষ্টা আছে সবসময়। ‘সাঁঝবাতি’ ছবিটাতেই দেখেছি দেব আমার আর সৌমিত্রদার সঙ্গে যখন অভিনয় করছে তখন নিজের অভিনয়, উচ্চারণ ভাল করার জন্য কত চেষ্টা করেছে। সবাইকে মাতিয়ে রাখে দেব।

করোনার মধ্যেও আপনি এই বয়সে ‘বৃদ্ধাশ্রম ২’ সিরিয়ালে কাজ করছেন। আর কী কী কাজ আছে হাতে?

হ্যাঁ, দেবীদাস ‘বৃদ্ধাশ্রম’ করতে অনুরোধ করেছিল। সেই দেবীদাসই করোনায় চলে গেল। আমারও তো করোনা হয়েছিল, তাই এখন কিছুদিন কাজ করছি না। তবে করব না বলিনি। আপাতত করছি না, রোগটা এত ছড়াচ্ছে বলে।

লাস্ট করলাম কৌশিক গাঙ্গুলfর ‘অর্ধাঙ্গিনী’। ওটা এখনও রিলিজ হয়নি। আর Sকটা ছবিতে কাজ করলাম, যাতে আমার সঙ্গে পরাণদা (বন্দ্যোপাধ্যায়) আছেন।

আমি এখন বেরোচ্ছি না বাড়ি থেকে। তবে করোনাটা আমায় কাবু করতে পারেনি। আমার প্রেসার-সুগার সবই কমের দিকে। ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে আছি। ভাল আছি।

এখন তো বাড়িতে বেশি সময়, একাই থাকেন?

আমাদের এই আবাসনে তিনটে ফ্ল্যাট আছে সামনাসামনি একই ফ্লোরে। একটাতে থাকে বোন আর ওঁর স্বামী, আরেকটায় বোনঝি আর ওর হাজব্যান্ড, আর একটাতে আমি একা থাকি। কিন্তু সারাদিনই তিন ফ্ল্যাটে যাতায়াত আছে। খাওয়া-দাওয়া একসঙ্গে হয়। আমি আর আমার বোনেরা একসঙ্গেই লাঞ্চ, ডিনার করি। বোনের কড়া শাসন, ‘রান্না একদম নয়। তুমি রেস্ট নাও। আমি আছি কী করতে!’

বোনঝির যখন বিয়ে হয়নি তখন বোন, বোনঝি ওরাই আমাকে এখানে নিয়ে এসছিল। বলল “তুমি একদম একা হয়ে গেছো মেসো চলে যাওয়ার পর। তোমার তো দেখাশোনা করারও একটা লোক দরকার। যাই হোক, ওরা থাকাতে আমার সুবিধেই হয়েছে। আমরা সবাই মিলে আনন্দ করেই আছি আর এখনও কাজ করে যাচ্ছি দর্শকদের ভালবাসায়। নতুন প্রজন্মও আমাকে খুব ভালবাসে।

আমি তো বলব আমার যৌবনে আমি যা অবহেলা পেয়েছি ইন্ডাস্ট্রিতে, তারচেয়ে এই নবীন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করে অনেক বেশি সম্মান, ভালবাসা, ভাল রোল, পুরস্কার সবই পাচ্ছি। আজ আর কোনও আক্ষেপ নেই। নিজের সন্তান না থেকেও সন্তানসম সবার থেকে যা ভালবাসা পাই, তাদের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে যেন শেষ জীবন অবধি কাটিয়ে দিতে পারি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More