বলিউডে স্বর্ণযুগের বাঙালি নায়ক অভি ভট্টাচার্য, গ্ল্যামার দুনিয়া পেরিয়ে আধ্যাত্মিকতায় বিলীন জীবন

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

টলিউড ও বলিউডের এককালের প্রথম সারির অভিনেতা ছিলেন অভি ভট্টাচার্য। বাংলা থেকে বম্বে পর্যন্ত নাম করেন তিনি। স্বর্ণযুগের বলিউড ছবির নায়ক হিসেবে তিনি আজও বিখ্যাত। বাঙালি পরিবারের ছেলেটি সে সময়ে বলিউড জয় করেছিলেন। শেষে বম্বেতেই বাড়ি কিনে থেকেছেন।

আজ তিনি বিস্মৃত হলেও, তাঁর বর্ণময় জীবন কাহিনি রোমাঞ্চ জাগায়। ১৯২১ সালে জন্ম তাঁর। পরিচালক নীতিন বোসের হাত ধরে রুপোলি জগতে প্রবেশ। নীতিন বোস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’ ছবিটি করেছিলেন বাংলায়, তার নায়ক করেন অভি ভট্টাচার্যকে। রমেশের ভূমিকায় ছিলেন অভি, কমলার ভূমিকায় মীরা মিশ্র।

১৯৪৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর স্বাধীন ভারতে মুক্তি পেয়েছিল নবাগত অভি ভট্টাচার্যর প্রথম ছবি, তাও কিনা বম্বে টকিজের ব্যানারে। প্রথম বাংলা ছবি হিট করে। এর পরে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি অভি ভট্টাচার্যকে। পরে এই নৌকাডুবিই আবার হিন্দি ভার্সনে ‘মিলন’ নামে পরিচালনা করেন নীতিন বোস। তাতে নায়ক হন দিলীপ কুমার।

প্রথম ছবি সফল হওয়ার পর থেকেই একের পর এক বলিউড হিন্দি ছবির নায়ক হন তিনি। এই সময়ই অভি ভট্টাচার্যর জীবনে সুবর্ণ সময়। ‘জাগৃতি’, ‘বিরাজ বহু’, ‘অপরাধী কৌন’, ‘অনুরাধা’, ‘শোলা অউর শবনম’, তাঁর কেরিয়ারের আইকনিক হিট হয়ে ওঠে। এই ছবিগুলির জন্যই তিনি ভারতীয় ছবিতে আলোচিত হতে পারেন আজও।

বাংলাতেও ঋত্বিক ঘটকের অমর সৃষ্টি ‘সুবর্ণরেখা’ ছবির লিড নায়ক ছিলেন অভি ভট্টাচার্য। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন। ঋত্বিকের ‘মেঘ ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’-এর পরে দেশভাগ ট্রিলজির তৃতীয় ছবি ছিল এটি। অভি ভট্টাচার্য অভিনীত এই চরিত্র এবং ছবিটি বিপুল আলোচিত, প্রশংসিত হয়েছিল। অভি যেমন বলিউডের বাণিজ্যিক ছবি করেছিলেন, তেমন ঋত্বিক ঘটকের আর্ট ছবিতেও ছিলেন একেবারে নিঁখুত।

এর পরে তিনি আবার ফিরে যান বলিউডে। বিমল রায়, গুরু দত্ত, শক্তি সামন্ত, সত্যেন বোস, রমেশ সিপ্পি, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ পরিচালকের ছবিতে অভিনয় করেন। দেবকী কুমার বসুর তামিল ছবি ‘রত্নদীপম’ (১৯৫৩)-এও অভিনয় করেন। তবে ষাটের দশকের শুরু থেকেই নায়ক রোলের সমাপ্তি ঘটে তাঁর কেরিয়ারে। এর পরে চরিত্রাভিনেতার চরিত্রে আরাধনা, অমর প্রেম, সীমা– এসব বেশ কিছু ছবিতে কাজ করেন। ভিলেন রোলও করেছিলেন বিনোদ খান্না ও যোগিতা বালি অভিনীত ‘মেমসাহেব’ ছবিতে। গুলজারের প্রথম ছবি ‘মেরে আপনে’-তেও কাজ করেছিলেন।

১৯৭১ সালে বাঁকবদল ঘটে অভিনেতা অভি ভট্টাচার্যর জীবনে। তাঁর নায়ক জীবন আধ্যাত্মিক জীবনে মোড় নেয়। তিনি ধর্মীয় গুরু দাদাজির সান্নিধ্যে এসে বদলে যান পুরোপুরি। দাদাজির প্রকৃত নাম ছিল অমিয় রায়চৌধুরী। তিনি একজন দেবতার প্রতিকৃতি স্বরূপ ছিলেন বলে আজও মনে করেন অনেক ভক্ত। শোনা যেত, এই দাদাজির জন্মের সময়ে আঁতুড়ঘর গোলাপ আর চন্দনের সুবাসে ভরে যায়। পরে অমিয় দাদাজীর গা থেকেও নাকি এই সুগন্ধ পাওয়া যেত। কোন সুগন্ধী মাখতেন না তিনি, এটাই নাকি তাঁর প্রাকৃতিক গন্ধ ছিল গায়ের।

বিশেষ করে এই সুগন্ধের জন্য দাদাজি সর্বত্র জনপ্রিয় ও পূজনীয় হয়ে উঠেছিলেন পরে। মাত্র ন’বছর বয়সে দু’বছরের জন্য তিনি বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যান। ফিরে আসেন তার পরে, কিন্তু মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে পর্বত বা জঙ্গলে সাধনা করতে চলে যেতেন। এক বিচিত্র জীবন ছিল তাঁর। কিন্তু পরে ব্যাঙ্ক ও বিমা কোম্পানির প্রতিষ্ঠিত পদেও ছিলেন দাদাজি। এর পরে ফের আধ্যাত্মিক জগতে নিবিড় ভাবে প্রবেশ করেন তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর। রাম ঠাকুরের শিষ্য ছিলেন দাদাজি।

এই দাদাজির সান্নিধ্যে এসে অভি ভট্টাচার্য জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পান ধর্মীয় ভক্তিরসে। এমনকি এই সময় তিনি ধর্মীয় চরিত্রই সিনেমাতে বেশী করতেন। হরিশচন্দ্র শৈব্যা, হরিদর্শন, তুলসী পরিবার, বিষ্ণু পুরাণ, মহাভারত প্রভৃতি। অভি ভট্টচার্য ‘ডেস্টিনি উইথ দাদাজি’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন, যাতে তিনি দাদাজির সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর উপলব্ধির বর্ণনা দিয়েছিলেন। বইটিকে দাদাজির জীবনী গ্রন্থ বলা যায়, যা আজও ভক্তদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়।

তবে যে শান্তির খোঁজেই অভি এ পথে যান না কেন, সে সময়ে এক জন রুপোলি পর্দার অভিনেতার এই আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ বেশ আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ছবির সংখ্যাও কমিয়ে দেন অভি ভট্টাচার্য। এমনকি ১৯৮০ সালের পর থেকে দাদাজির সঙ্গে ধর্মচিন্তা বিশ্বেব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বিশ্ব ভ্রমণে পাড়ি দেন অভিনেতা। এর পরে কিছুদিন অভির মুম্বইয়ের বাড়িতে ছিলেন দাদাজি। পরে কলকাতার ‘সোমনাথ হলে’ অভি ভট্টাচার্য দাদাজির ধর্মচিন্তার উৎসব ও সম্মেলনের আয়োজন করতেন। বাপ্পি লাহিড়িও খুব আসতেন দাদাজির আশীর্বাদ নিতে।

অভি ভট্টাচার্যর স্ত্রী-র নাম ছিল প্রণতি ঘোষ। সে সময়ে একটা মজার ব্যাপার চালু ছিল অভি ভট্টাচার্যর ঘুম নিয়ে। সবাই জানতেন, দেখেওছিলেন অনেকে, যে যে যেখানে সেখানে যে কোনও অবস্থায় অভি ভট্টাচার্য ঘুমিয়ে পড়তে পারতেন। এমনকি দাঁড়িয়েও ঘুমোতে পারতেন তিনি।

সুবর্ণরেখা ছবি যদি অভি ভট্টাচার্যকে বাংলায় প্রশংসা এনে দেয়, তাহলে বলিউডের বক্সঅফিস সাফল্য ও সর্বভারতীয় পরিচয় দিয়েছিল সত্যেন বসুর ‘জাগৃতি’ ছবি। এই ছবির জন্যই ফিল্মফেয়ার সম্মান পান তিনি। ছবিটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছিল। তবে এসবের ঊর্ধ্বে উঠে জীবনকে তিনি সমর্পণ করেছিলেন দাদাজির চরণে। তাই অভিনেতা হয়েও অভি ভট্টাচার্যর ধর্মীয় বইয়ের লেখক হিসেবে এবং দাদাজির শিষ্য রূপে আজও ভক্তবৃন্দের মাঝে চিরপ্রণম্য। ১৯৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More