উত্তম-ললিতাকে পাশাপাশি দেখে সুপ্রিয়া বললেন, ‘এই তো বর-বউ, রুনু তোর আর বরের দরকার কী!’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বেণু আর রুনু, ইন্ডাস্ট্রির দুই বেস্ট ফ্রেন্ড। টলিউডে হলিউড ফ্যাশন, স্টাইল ইন্ট্রোডিউসড করেন ওঁরা দুজনই। তাঁদের ভালো নাম সুপ্রিয়া দেবী এবং ললিতা চট্টোপাধ্যায়। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ বাঁকা চোখেই দেখত সুপ্রিয়া-ললিতাদের যৌবন উদ্ভাসিত সাহসী সাজগোজ। ললিতা চট্টোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন “আমি আর বেণু ইচ্ছে করেই সাহসী সাজগোজ করতাম। হলিউড স্টাইল কখনই বাঙালিরা তখন সোজা চোখে নিত না। আর সুপ্রিয়া দেবীকে তো সমাজ কোনও দিনই সম্মান দেয়নি, তাই সমাজকে দেখিয়ে দেখিয়ে সুপ্রিয়া নিজের সাহসী সাজ করত। সঙ্গে ওঁর দোসর ছিলাম আমিও। আমাদের কোনও ফটোশ্যুট বা রাতপার্টির ছবি তখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াত সবার কাছে।”

ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন ললিতা চট্টোপাধ্যায়। ‘জয়-জয়ন্তী’, ‘অ্য়ান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘মেমসাহেব’ প্রভৃতি ছবিতে মহানায়কের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন। উত্তমের নায়িকা একটিতেই, ‘বিভাস’। বিলেতের মেম হয়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন কলকাতা শহরে। প্রথম বিয়ের সময় বিলেতও যান। পরে সংসার ভাঙায় কলকাতায় ফিরে আসেন। ললিতার অভিনয়ের শুরু উত্তম কুমারের সঙ্গেই। বৌদি অভিনেত্রী কাবেরী বসুর হাত ধরেই ললিতার উত্তমকুমারের সঙ্গে আলাপ এবং উত্তমই ললিতাকে তাঁর নায়িকা হওয়ার অফার দেন। বিলেত ফেরত ললিতা পড়াশোনা থেকে খেলাধূলা সবেতেই প্রথমা। ‘ফার্স্ট গার্ল’ ডাকা হত তাঁকে।

কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে ফিল্ম লাইনে চলে এলেন। বিয়ের পর ছবিতে আসা পুরোপুরি ভাবে। তবে ললিতা অতিআধুনিকা, চোস্ত ইংরাজি বলতে পারা মেয়ে বলে বাংলা ছবিতে নায়িকার চেয়ে ভ্যাম্পের রোল বেশি পেয়েছেন টলিউডের নিয়মে। পরে অবশ্য এই নিয়ে আফশোস করতেন। উত্তমবিহীন ইন্ডাস্ট্রি সেভাবে ললিতাকে কাজ দেয়নি চলচ্চিত্রে। শেষ ছবিতে করেছেন চলচ্চিত্র জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয়। আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তর ‘জোনাকি’। তার আগে গৌতম ঘোষের ‘শূন্য অঙ্ক’, অরিন্দম শীলের ‘আসছে আবার শবর’। এতে ভেবেছিলেন কাজ বাড়বে, কিন্তু কেউ তাঁকে ডাকেনি সেভাবে। একাকিত্বের কারণে বলতেন, পড়াশোনার পেশায় থাকলেই ভাল হত। শেষ জীবনে স্পোকেন ইংলিশ শিখিয়ে রোজগার করতেন কিছু। সে আর কত!

সুপ্রিয়ার পরপরই একই বছর ২০১৮-র মে মাসে চলে গেলেন ললিতা।

কিন্তু ওঁদের যৌবনের ঝলমলে দিনগুলো যে বড় মায়াবী! পাওয়ার হাউস উত্তম কুমারকে ঘিরেই বসত সব পার্টির আসর। সুপ্রিয়া, অঞ্জনা ভৌমিক, শ্যামল মিত্র, তরুণ কুমার, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়– সবাই মিলে করতেন পার্টি, সঙ্গে খাওয়াদাওয়া আর গানের ঘরোয়া জলসা। সেই পার্টিতে সুপ্রিয়ার একটা গান ধরা বাঁধা ছিল, ‘অশ্রুনদীর সুদূর পারে।’ উত্তম আর শ্যামল মিত্র তো গাইতেনই।

ললিতা সে সময় চোখ ঝলসানো ডাকসাইটে সুন্দরী, যাঁর থেকে চোখ ফেরাতে পারতেন না মহানায়কও। আবার ললিতারও উত্তমের প্রতি ভাল লাগা ছিল। কে না প্রেমে পড়বে মহানায়ক পাশে বসে থাকলে! কিন্তু লক্ষণরেখা কতটা, জানতেন ললিতা। ঝলমলে ললিতাকে দেখে উত্তম তাকালে উত্তমের চোখ চেপে ধরতেন সুপ্রিয়া, ‘দেব না দেব না! কিছুতেই রুনুকে দেখতে দেব না!’ মজা করেই বলতেন বেণু।

তবে ললিতার প্রথম আলাপ উত্তমের সঙ্গেই। উত্তম-ললিতা জুটির ‘বিভাস’ ছবি হিট করে। প্রথমদিকে ললিতাকে বেশ সন্দেহের চোখেই দেখতেন সুপ্রিয়া দেবী। কিন্তু ধীরে-ধীরে বন্ধুত্ব সেই সন্দেহকে ঢেকে দেয়। বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে ওঠেন দু’জনে।

একবার তো ললিতার জন্মদিনে বিয়ের মতো করে তত্ত্ব পাঠিয়েছিলেন সুপ্রিয়া। মাছ, মিষ্টি, শাড়ি, গয়না আরও কত কী! ময়রা স্ট্রিটে উত্তম-সুপ্রিয়ার সংসারে লক্ষ্মী পুজো, গণেশ পুজো, সরস্বতী পুজো– সবেতেই নেমতন্ন থাকত ললিতার। আবার বেণু রুনু খেয়াল হলে একসঙ্গে ‘ডে আউট’ করতে চলে যেতেন নিউ মার্কেট। সুপ্রিয়া সিল্কের শাড়ি, সোনার লকেট কিনে দিতেন ললিতাকে।

তবে ললিতা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “বেণু বলত, বড় গিন্নির (উত্তমের প্রথমা স্ত্রী গৌরী দেবী) অতিরিক্ত চাহিদার জন্যই উত্তমের শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। উত্তম যখন অসুস্থ হল, বেণু কী সেবাই না করেছে। যদিও শেষের দিকে আর্থিক নিরাপত্তা এবং অধিকারবোধ নিয়ে তিক্ততা এসে গেছিল উত্তম-বেণুর ভিতরে।”

ললিতা যখন দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেন যাত্রার পাহাড়ি ভট্টাচার্যকে, তখন ললিতা চেয়েছিলেন উত্তমকুমার তাঁদের বিয়েতে সাক্ষী থাকুন। কথা রেখেছিলেন উত্তম। ঘরোয়া রেজিস্ট্রি বিয়ে। উত্তম এসে ধুতি পাঞ্জাবি পরে বেনারসি পরিহিতা ললিতার পাশে বসেছেন। ঠিক তখন সুপ্রিয়া ঢুকে বলল, “এই তো বর-বউ হয়ে গেছে। আর দরকার নেই তো বরের। রুনু তোর আর বরের দরকার কী।”

সুযোগ পেলেই সুপ্রিয়া এমন ঠাট্টা করতেন। কিন্তু এও জানত বেণু, তাঁর বেস্ট ফ্রেন্ড রুনু তাঁর ঘর ভাঙবে না। কথা তুলবেন পাঠকরা, সুপ্রিয়াও তো একজনের ঘর ভেঙেই সংসার গড়েছিল। আসলে কিন্তু উত্তম কুমারই ভাঙা সংসার থেকে ছুটি নিয়ে সুপ্রিয়ার কাছে আশ্রয় চেয়ে থাকতে এসেছিলেন।

সেসময় সুচিত্রা-সুপ্রিয়া সম্পর্ক নিয়েও নানা কানাঘুষো চলত। খুব একটা এই নিয়ে কখনও মুখ খুলতেন না সুপ্রিয়া দেবী। সুচিত্রা সেন মহানায়িকা স্টেটাসে নিজের পার্সোনাল মেকআপ রুম তৈরি করে ফেলেন। এটা করে সুচিত্রা একটা নারীবিপ্লব এনেছিলেন ইন্ডাস্ট্রিতে। তাঁর আগে কোন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত মেক আপ রুম ছিল না।

ললিতা এ প্রসঙ্গে বলতেন, “রমাদির মতো বেণুও আলাদা মেক আপ রুম দাবি করেছিল। আমি বেণুর দাবিতে দোষ দেখি না। ও অভিনেত্রী হিসেবে কারও চেয়ে কম ছিলনা। সংসারে রান্নাবান্না, উত্তম সেবা, অতিথি আপ্যায়ণ সব একা হাতে করেও কী করে যে অত দুরন্ত অভিনয় করত মেয়েটা!”

তবে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে সুপ্রিয়া দেবী একবার ললিতাকে সাবধান করেছিলেন।

‘হার মানা হার’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে একই মেক আপ রুমে লাঞ্চ খেতেন ললিতা চট্টোপাধ্যায়। সুচিত্রাই ডেকে ললিতার সঙ্গে আলাপ জমান, যে অধিকার অনেকেই পাননি। ললিতা তো আনন্দে আত্মহারা। ললিতা একদিন সুচিত্রা সেনের পায়ের সামনে বসে বলেছিলেন, “আপনি আমার কাছে দেবী। আপনি যে আমায় এত ভালবাসা দিয়েছেন আমি ধন্য। আমি আপনার বিশাল ফ্যান।”

‘হার মানা হার’-এ ললিতা করেছিলেন একজন নায়িকার চরিত্র, এনাক্ষী দেবী। তাঁকে বিয়ে করে আনবেন ছবিতে সুচিত্রার দাদা অমরনাথ মুখার্জী। তাই সুচিত্রার বৌদির রোল করেন ললিতা, জুনিয়র হয়েও। তা ললিতা সুচিত্রার সেই বিশেষ খবর সুপ্রিয়াকে এসে বললেন, “বেণু তোরা সুচিত্রা সেনকে যতই মেজাজি আর নাক উঁচু বল, কই আমায় তো খুব ভালবেসে একসঙ্গে লাঞ্চ করেন।”

সুপ্রিয়া সব শুনে বলেছিলেন, “এখন এরকম করছে তো, শ্যুটিং শেষ হলে তোকে চিনতেই পারবে না।” ঠিক তাই হল। ‘হার মানা হার’-এর শ্যুটিং শেষ হয়ে গেল। যে যার অন্য ছবির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তার পরেই ললিতা আর ম্যাডামের নাগাল পাননি। হাজার যোগাযোগ করলেও সুচিত্রা সেন আর যোগাযোগ রাখেননি ললিতার সঙ্গে।

আসলে সুচিত্রা সেন সিনেমার সিনটাকে ভাল করতেই সহ-অভিনেত্রীকে তাঁর সঙ্গে সহজ করে নিচ্ছিলেন। তার পর নিজের ব্যক্তিগত রাজত্বে ললিতার জন্য লক্ষণরেখা টেনে দেন।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More