হিন্দুকন্যাকে দত্তক নিয়েছিলেন বিসমিল্লাহ খান, গোটা ভারতবর্ষকেই যেন ধারণ করেছিলেন সুরে সুরে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সানাই এমন এক বাদ্যযন্ত্র, যার সুর বাজলেই আনন্দ ও বিষাদ মিলিয়ে এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়ে যায় নিমেষে। আর এই সানাই বলতেই বিসমিল্লাহ খানের নামটি ভেসে আসে সবার আগে। আগেকার দিনে সব যৌথ পরিবারে পুজো-পার্বন, বিয়ে, অন্নপ্রাশন এসব নানা শুভ অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। আর সবার বাড়িতেই থাকত বিসমিল্লাহ খানের একটা সানাইয়ের ক্যাসেট। সেটাই চালানো হত সব শুভ অনুষ্ঠানে। যেন সব শুভ কাজের বার্তা বয়ে আনত বিসমিল্লাহর সানাই। প্রতিটি হিন্দু অনুষ্ঠানে অপরিহার্য এই মানুষটির সানাইয়ের মূর্চ্ছনা।

কবি কুন্তল মুখোপাধ্যায় তাই তো সেই কবে লিখেছিলেন নহবত,

“বিয়েবাড়িতে একলা হওয়াই আমার স্বভাব, তবু
সব বাড়িতেই একটি দৃশ্যে থমকে যাচ্ছে প্রাণ,
দেখেছি হিন্দু ললনাদের
প্রতিরাত্রে বিয়ে দিচ্ছেন বিসমিল্লাহ খান।”

শুধু বিয়েই বা কেন, কাশী বিশ্বনাথের সন্ধ্যারতি কিংবা বেনারস বা হরিদ্বারের গঙ্গা আরতিতেও বিসমিল্লাহর সানাইয়ের সুর না বাজলে আরতি পূর্ণতা পায়না। আরতির অগ্নিশুদ্ধি আর সানাইয়ের সুরে ধর্মান্ধতার অন্ধকার মুছে মানবতার বার্তা প্রতিভাত হয় প্রতিদিন। শীতল জলের ঢেউয়ে ভেঙে ভেঙে যায় ঈশ্বরের চোখের জল।

বিসমিল্লাহ খানের প্রকৃত নাম ছিল কামরুদ্দিন খান। জন্মলগ্নে তাঁকে প্রথম দেখেই ‘বিসমিল্লাহ’ বলেছিলেন ঠাকুরদা রসুল খান, সেই থেকেই তাঁর নাম হয় বিসমিল্লাহ। ১৯১৬ সালের ২১শে মার্চ তারিখে তাঁর জন্ম হয় বিহারের বক্সার জেলার দুমরাঁও গ্রামে। তাঁর মায়ের নাম ছিল মিঠান আর বাবার নাম ছিল পয়গম্বর বক্স খান, তিনিও সানাই বাদক ছিলেন।

বিসমিল্লাহ ছিলেন পিতা-মাতার দ্বিতীয় সন্তান। ছ’বছর বয়সে তিনি গ্রাম ছেড়ে বেনারসে চলে যান তাঁর কাকার কাছে, যেখানে বারানসীর বিশ্বনাথ মন্দিরে সানাই বাজিয়ে থাকতেন তাঁর কাকা ও অন্যান্য সানাই বাদকরা! সেখানেই বিসমিল্লাহরও সানাই বাজানো শুরু হয় সঙ্গীতগুরু আলি বক্স বিলায়তুর কাছে। এর পরে তিনি চলে এলেন কলকাতা। কলকাতায় সর্বভারতীয় সঙ্গীত সম্মেলনের আসর বসে ১৯৩৭ সালে, সেখানেই প্রথম সানাই বাজিয়ে বাজিমাত করলেন বিসমিল্লাহ।

১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরেই তিনি সানাইয়ে বাজিয়েছিলেন বিশেষ রাগ, যা তাঁর জীবনে ও ভারতের ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসেও দিল্লির লালকেল্লায় সানাইতে রাগ কাফি বাজিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন বিসমিল্লাহ খান। এর পর থেকে সে অনুষ্ঠান রেডিও এবং পরবর্তীকালে দূরদর্শন সরাসরি সম্প্রচার করে ছড়িয়ে দেয় সারা দেশে, যা বিসমিল্লাহকে এনে দেয় বিশাল পরিচিতি।

ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, ইরাক, ইরান, জাপান– পৃথিবীব্যাপী সানাই অনুষ্ঠানের সফর করেন বিসমিল্লাহ। তাঁর এই সানাই অনেক প্রখ্যাত চলচ্চিত্রেও ধরে রাখা হয়েছে। বিসমিল্লাহ অভিনয় করেছেন ‘সানাদি আপ্পন্না’ নামের কন্নড় চলচ্চিত্রে, সানাই বাজিয়েছেন ‘গুঞ্জ উঠি শেহনাই’ হিন্দি ছবিতে। এছাড়াও তাঁকে ‘জলসাঘর’-এও সানাই বাজাতে দেখা গেছে, যে ছায়াছবির পরিচালক ছিলেন সত্যজিৎ রায়।

গৌতম ঘোষ বিসমিল্লাহ খানের জীবনী পর্দায় ধরে রাখতে তাঁকে নিয়ে তৈরী করেন তথ‍্যচিত্র ‘সঙ্গ মিল সে মুলাকাত’। নন্দনে যখন তথ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হয়, সত্যজিৎ রায় দেখার পর মন্তব্য করেছিলেন “বিসমিল্লাহ ভাল সানাই বাজায় জানতাম, এত ভাল মিষ্টি সুরে কথা বলে আজ জানলাম। বিসমিল্লাহ বেনারসকে বলেন বানারস। সত্যিই তো যেখানে শিল্প রস বানানো হয়।” ঐতিহাসিক হয়ে থাকে সত্যজিতের মন্তব্য।

বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়ার পরেও একেবারে সাধাসিধে জীবন যাপন করতেন বিসমিল্লাহ। শিয়াপন্থী ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান হয়েও তিনি কিন্তু উদার মনোভাব পোষণ করতেন সব ধর্মের প্রতি। তাই তো মা সরস্বতী ছিলেন তাঁর আরাধ্যা। যে উত্তরপ্রদেশে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, পরিবার গড়া– সব কিছু, সেই উত্তরপ্রদেশ মানেই তিনি বুঝেছেন কাশী বিশ্বনাথ, গঙ্গার দশাশ্বমেধ ঘাট, মণিকর্ণিকা ঘাট। মানবতার ধর্ম বুকে নিয়ে সব ধর্মের শিল্পগুণটুকু ছেঁকে নেন তিনি নিজের জীবনে।

বিসমিল্লাহর আট সন্তান, তিন পুত্র আর পাঁচ কন্যা। তার পরেও বিসমিল্লাহ বাঙালি হিন্দুর কন্যা সোমা ঘোষকে দত্তক দেন। সোমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুগায়িকা। বিসমিল্লাহহ ও সোমা দুজনে বহু জায়গায় যৌথ অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন। সেই থেকেই বিসমিল্লাহ সোমার শিক্ষক ও সহশিল্পী থেকে পিতা হয়ে ওঠেন। বিসমিল্লাহর অন্য শিষ্য-শিষ্যারাও ছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

নাজিম ও নায়ার হোসেন নামে বিসমিল্লাহর নিজের দুই পুত্র, সানাই বাজিয়ে প্রবহমান সেই ঐতিহ্য ও পরম্পরা ধরে রেখেছেন। কিন্তু বিসমিল্লাহ ও সোমা ঘোষের জুটি প্রচারে এসেছে সবচেয়ে বেশি। এক জন মুসলিম হয়েও হিন্দু কন্যাকে দত্তক নিয়ে, সম্পত্তির ভাগের উত্তরাধিকারিণীও করেছেন তাঁকে। ভারতীয় লোকসভাতেও মন্ত্রীদের সামনে বিসমিল্লাহ ও সোমা যৌথ অনুষ্ঠান করেছিলেন।

খান ‘পদ্মশ্রী’ ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ’-সহ ভারত সরকারের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’ সম্মানে ভূষিত হন। ভারতের সর্বোচ্চ চারটি অসামরিক সম্মানই তিনি পেয়েছেন। তাঁর আগে ‘ভারতরত্ন’ পেয়েছিলেন এমএস শুভলক্ষ্মী ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি তৃতীয় ভারতরত্ন! এছাড়াও পেয়েছেন ‘সঙ্গীত নাটক আ্যাকাডেমি’ এবং ‘তানসেন সম্মান’ পুরস্কার। তাঁর নামে চালু করা হয়েছে ‘উস্তাদ বিসমিল্লাহহ খান যুবা পুরস্কার’। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্র বিশ্বভারতীও সাম্মানিক ডিলিট দিয়ে সম্মান জানিয়েছে তাঁর প্রতি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বেনারসের হাসপাতালে বিসমিল্লাহ প্রয়াত হন ২০০৬ সালের ২১শে অগস্ট।

বাঁদিক থেকে ওস্তাদ আল্লারাখা, ওস্তাদ আলি আকবর খান, জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং ওস্তাদ বিসমিল্লা খান।

কিন্তু এ বছরের মৃত্যুদিনের ঠিক আগেই বিসমিল্লাহর উত্তরপ্রদেশের বসতভিটে ভেঙে ফেলেছেন তাঁর নাতিরা। কারণ এই আদি বাড়ি ভেঙে শপিং মলের ব্যবসা ভাল হবে। সরকারের তরফ থেকেও ভিটে সংস্কারের দায়িত্ব কখনও নেওয়া হয়নি। তাই বিসমিল্লাহর উপাসনাস্থল গুঁড়িয়ে গেল বুলডোজারে। কেবল যে ঘরে থাকবেন বলে আজীবন বহির্বিশ্বের নানা উপহার হেলায় ঠেলে দিয়েছেন তিনি, খারিজ করেছেন আমেরিকায় থাকার প্রস্তাবও, সে ঘরই আর রইল না।

বিসমিল্লাহর ঘরে যে ইট-সিমেন্টের প্রাচীন গাঁথনি ছিল, তা তিনি কখনও বদলাননি বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়ার পরেও। প্রাচীন ঘরে যে সারিসারি সাজানো ছিল বিসমিল্লাহর কাজ, পুরস্কার, ছবি তা আর রই না। কেউ প্রতিবাদ না করলেও এবারেও এগিয়ে এসেছেন বিসমিল্লাহর দত্তককন্যা সোমা ঘোষ। তিনি তীব্র প্রতিবাদ করে বলেছেন, এ অন্যায়। গর্জে উঠেছে সারা ভারতবর্ষও। কিন্তু ভাঙা ঘর আর ফিরবে না। ইতিহাসের দলিল মুছে গেল।

এ দেশ তাঁর ভিটেটুকু রক্ষা করতে পারেনি। তবু এ দেশের ঘরে ঘরে নানা শুভ উৎসবে তিনি রয়ে যাবেন সুরে সুরে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More