জ্যাক দা রিপার, কালো চুলের সেই নৃশংস খুনি ধরা পড়ল ১৩০ বছর পর

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সালটা ১৮৮৮৷ ৩১ অগস্ট ভোর ৪ টে নাগাদ লন্ডন শহরের এ-প্রান্তে ও-প্রান্তে ডিউটির শেষ টহলটুকু দিচ্ছিলেন এক কনস্টেবল। হঠাৎ এক আর্তচিৎকার শুনতে পান তিনি। আওয়াজ অনুসরণ করে ছুটে গিয়ে দেখেন এক মহিলা রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছেন। কিন্তু কাছে গিয়ে যা দেখেন তাতে শিরদাঁড়ায় রীতিমতো ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। ধারালো কোনও অস্ত্রের একটা মাত্র নিখুঁত টানে মহিলার গলা দু’ফাঁক৷ গভীর ক্ষত তলপেটেও৷ নাড়িভুঁড়ি, জরায়ু বাইরে পরে আছে। রিপোর্টে জানা যায়, নিহত মহিলার নাম মেরি অ্যান নিকলস। পেশায় যৌনকর্মী এই মহিলাকে প্রথমে গলা কেটে খুন করা হয়৷ পরে, তাঁর তলপেট কেটে বের করে নেওয়া হয় জরায়ু৷
হত্যার নৃশংসতা চমকে দিয়েছিল তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনকে৷ ভোররাতে হওয়া এই নৃশংস খুনের কোনও হদিশ পাবার আগেই শহরের বুকে ঘটে যায় আরও এক ভয়ংকর খুন। নতুন শিকার এবারও এক দেহপোজীবিনী। নাম অ্যানি চ্যাপম্যান৷ নিকলস হত্যার আট দিনের মাথায় শনিবার ভোর ছ’টা নাগাদ লন্ডনের পথে একইভাবে পাওয়া যায় তাঁর দেহ৷ একইভাবে গলা কাটা, এবার গলায় অবশ্য দু’টি কাটার দাগ ছিল৷ এঁরও তলপেট হালকা কিন্তু ক্ষুরধার কোনও অস্ত্রের টানে ফাঁক হয়ে গেছিল৷ ময়না তদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, গলা আর পেট একই অস্ত্রের টানে কাটা হয়েছে৷ ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের মত ছিল, রীতিমতো দক্ষ হাতের টানেই প্রাণ গিয়েছে দুই মহিলার। তবে দ্বিতীয় খুনটির ক্ষেত্রে একটা ক্লু পাওয়া যায়। নিহত চ্যাপম্যানের মৃত্যুর মাত্র আধ ঘণ্টা আগেই নাকি কালো চুলের এক ‘ভদ্র চেহারার’ মানুষের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল তাকে।

খোদ লন্ডন শহরের বুকে ঘটে যাওয়া এই ভয়ংকর দুটো খুনের তদন্ত করতে নেমে পরে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড।প্রাথমিকভাবে যে ক্লু পাওয়া গেছিল তার উপর ভিত্তি করে কালো চুলের সন্দেহভাজন এক চিকিৎসকের খোঁজ করতে শুরু করে স্কটবাহিনী। কারণ গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল অত নিঁখুতভাবে শরীর কেটে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বের করে নেওয়া কোনও চিকিৎসক ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্ত এত অল্প ক্লুয়ের উপর ভিত্তি করে খুনিকে খুঁজে পাওয়া কি সহজ? খুনের জোরালো কোনও মোটিফও পাওয়া যায় নি। ফলে পুলিশ অনুমান করতে শুরু করে, হয়তো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণেই করা হয়েছিল খুন দুটো। কিন্ত খুনি কোথায়? বহু তল্লাশি করেও তাঁর খোঁজ মেলেনি।

যে কোনও কারণেই হোক, দুটো খুনের পর বেশ কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিল খুনি। কিন্তু ঠিক একমাস পরেই সেই অজ্ঞাতপরিচয় খুনি আবার ফিরে এল আরও ভয়ংকর ভাবে। সেবার একইদিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পাওয়া গেল দু’দুটি ক্ষতবিক্ষত দেহ। এবারও খুনির শিকার দুজন মহিলা। তাঁদের নাম এলিজাবেথ স্ট্রাইড ও ক্যাথরিন এডোজ। পেশায় এরাও যৌনকর্মী। হত্যার ধরনও একেবারে এক৷ ক্যাথারিনের গলা ছিল দু-ফাঁক করা। তলপেটের নীচ থেকেও কাটা। ভেতরের বাম কিডনি আর জরায়ুর সিংহভাগ কেটে নিয়ে গিয়েছে সেই নৃশংস ঘাতক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিল, এই হত্যাকাণ্ডের কিছু আগেই এক কালো চুলের লোককে ক্যাথারিনের সাথে দেখেছিলেন তাঁরা। তবে এলিজাবেথের মৃত্যুটা একটু আলাদা। খুবই নিখুঁতভাবে তাঁর কাঁধের বাঁ-দিক থেকে কেটে দেয়া হয়েছিল প্রধান ধমনি। একইদিনে ঘটে যাওয়া এই দুটো খুন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে নাড়িয়ে দেয়। কাগজে কাগজে পুলিশের অকর্মণ্যতা নিয়ে শুরু হয় লেখালিখি। দীর্ঘদিন ধরে খোঁজ লাগিয়েও সেই ভয়ংকর খুনির কোনো হদিশ করতে না পেরে পুলিশের খাতায় অজ্ঞাতপরিচয় খুনির একটি নাম দেওয়া হয়। সেই নাম ‘জ্যাক দ্যা রিপার’আবার বেশ কিছু দিনের বিরতি। ঠিক একমাস পর আবারও হাড় হিম করা একই ঘটনার সাক্ষী হয় লন্ডন শহর। পাওয়া যায় মেরি ক্যালির লাশ তার নিজের ঘরে। এই ৫ নম্বর খুনটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ানক। গলা থেকে মেরুদণ্ড পর্যন্ত কাটা ছিল মৃতদেহের। তলপেটের কোনও অঙ্গই ছিলনা। এমনকি মেরির হৃ্ৎপিণ্ডটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই পাশবিক খুন পুরো লন্ডন শহরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেসময়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই ৫টি খুন, যাকে একত্রে ‘ক্যানোনিকাল ফাইভ’ বলা হয়, তার পরই অদৃশ্য হয়ে যান জ্যাক দ্যা রিপার। অনেকে মনে করেন এরপর তিনি মারা যান বা কোনও অজ্ঞাত কারণে খুন করা ছেড়ে দেন।

এরপরও কিন্তু লন্ডনে আরও ৬টি খুন হয়। সেগুলোও কম বীভৎস ছিল না! এর মধ্যে কখনও লাশের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া হয়েছিল, তো কখনও আঘাতে আঘাতে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল মৃতদেহ। কিন্তু রিপারের ওই পাঁচটি খুনের ধরনের সাথে বাকিগুলোর মিল সেভাবে পাওয়া যায়না। কাছাকাছি সময়ে হওয়া মোট ১১টা খুন, যার কোনটারই কিনারা হয়নি, তার মধ্যে প্রথম ৫টি বাদ দিয়ে বাকি ৬ টি খুন’কে রিপারের খুন বলে মেনে নেননি অপরাধবিজ্ঞানীরা।

জ্যাক দা রিপারের ৫ শিকার

পরপর ঘটে যাওয়া এই খুনগুলোর তদন্তে নেমে সেসময় ২,০০০ জনেরও বেশি মানুষকে সন্দেহভাজন হিসাবে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৩০০ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে, প্রায় ৮০ জনকে আটক ক’রে এই সমস্ত নৃশংস হত্যার পিছনে আসল খুনির পরিচয় খুঁজতে গিয়ে নানা রকম তথ্য সামনে আসে লন্ডন পুলিশের। অবাক করে দেওয়ার মতো এইসব তথ্য আরও বিভ্রান্ত করে তোলে পুলিশকে। তদন্তে অনেকে রিপারকে রাণী ভিক্টোরিয়ার নাতি প্রিন্স আলবার্ট বলেও সন্দেহ করেছিলেন। মনে করা হয়েছিল কোনও এক পতিতার সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত হন, এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পতিতাদের খুন করা শুরু করেন।

আসলে সেই সময় রাশিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া থেকে দলে দলে ইহুদি শরণার্থীরা আশ্রয়ের খোঁজে ভিড় করছিল লন্ডনে। তার ফলে পুরোনো লন্ডনে হু হু করে বেড়ে গেছিল জনসংখ্যা। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল দরিদ্র ইহুদি। এই ইহুদি মহিলাদের মধ্যে অনেকেই অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয় শরীর বিক্রির পথে যেতে। তবে প্রিন্স আলবার্টের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি শেষপর্যন্ত ধোপে টেকেনি, কারণ তিনি মোটেও সিফিলিসে আক্রান্ত ছিলেন না। সে তথ্যটি জানা গিয়েছিল পরে। তবে, এসবের মাঝে আসল খুনি কিন্তু অধরাই থেকে যায়।

ভিক্টোরিয়ার নাতি প্রিন্স এলবার্টও ছিলেন সন্দেহভাজনদের তালিকায়

তবে এসবের মাঝে যে ব্যক্তিকে সন্দেহের তালিকায় সব থেকে উপরে রাখা হয়েছিল তার নাম অ্যারন কসমিনস্কি। তিনি একজন ইহুদি। পোল্যান্ড থেকে এসেছিলেন তিনি। মানসিকভাবে অসুস্থ অ্যারনকে সেই সময় খুনি বলে দাবি করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ তখন অব্দি পাওয়া যায়নি। পরে মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে মারা যান অ্যারন। মনে করে নেওয়া হয়েছিল, রিপারের রহস্য অ্যারনের সাথে ওখানেই শেষ হয়।

অ্যারনই কি আসল জ্যাক দা রিপার!

এরপরের ঘটনা ১২৫ বছর পর। রাসেল এডওয়ার্ডস নামে এক ধনী ব্যক্তি জ্যাকের জীবন নিয়ে খুব বেশি কৌতূহলী ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি নিলামে একটি শাল কেনেন। ওই শালটি জ্যাকের চতুর্থ শিকার ক্যাথরিনের মৃতদেহের পাওয়া গেছিল। তদন্তের কিনারা না হওয়ায় এক কনষ্টেবল ওই শালটি স্মারক হিসেবে নিজের কাছে রাখবেন বলে উচ্চপদস্থ অফিসারদের অনুমতি নিয়ে শালটি বাড়ি নিয়ে আসেন। খুনির শাল অনুমান করেই হয়তো অবিকৃত অবস্থায় ওভাবেই সযত্নে তুলে রাখেন। উত্তরাধিকার সূত্রে সেই শাল হাতে আসে ডেভিড মেলভিল-হায়েসের। নিজের কাছে না রেখে সেই ঐতিহাসিক শাল ১৯৯১ সাল নাগাদ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অপরাধ-সংগ্রহশালায় দান করে দেন ডেভিড। ২০০১ সালে ডেভিড আবার সেটি ফেরত নিয়ে আসেন এবং ২০০৭ সালে তা নিলামে ওঠে।

শালটা আদৌ ক্যাথরিনের ছিল কি না, সেটা জানতে রাসেল কৌতূহলবশত শালটির বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করান। আধুনিক পরীক্ষাগারে ওই শালের গায়ে দুজন আলাদা ব্যক্তির শতাব্দী-প্রাচীন ডিএনএ খুঁজে পান বৈজ্ঞানিকেরা। সন্দেহের নিরসন করতে রাসেলের অনুরোধে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শাল থেকে সেই নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তারপর ক্যাথরিনের পরিবারকে অনুরোধ করে তার উত্তরসূরীর সাথে এই দুরকম ডিএনএ-ই মিলিয়ে দেখা হয়। আর আশ্চর্যজনকভাবে ক্যাথরিনের উত্তরসূরীর সঙ্গে হুবহু মিলে যায় একটি ডিএনএ। অর্থাৎ শালে পাওয়া দুটি ডিএনএ-র একটা যে ক্যাথরিনের, সে ব্যাপারে নিঃসংশয় হলেন বিশেষজ্ঞরা।

তাহলে অন্য ডিএনএ-টা কার? সেটা খুনি জ্যাক দা রিপারের ডিএনএ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই এবার সন্দেহের তির ঘুরল কসমিনস্কির উপর। তাঁকে দীর্ঘদিন সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল পুলিশ। এবার ডিএনএ পরীক্ষা হল কসমিনস্কির উত্তরসূরীর সঙ্গেও। আর অবিশ্বাস্যভাবে মিলে গেল সেই পরীক্ষার ফলও। তাহলে কি কসমিনস্কিই ছিলেন সেই হাড়-কাঁপানো ভয়ানক খুনি জ্যাক দ্য রিপার! ঘটনার ১২৫ বছর পর একটা শালের সাক্ষ্য থেকে তাহলে কি কিনারা হল শতাব্দীর অন্যতম বীভৎস সিরিয়াল কিলিংয়ের? অবিশ্বাস্য হলেও সেটাই কিন্তু বলছে আধুনিক বিজ্ঞান।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More