আমার সেজকাকু মান্না দে (বিশেষ জন্মদিন পর্ব)

সুদেব দে

আগামী ১লা মে আমার সেজকাকু, আপনাদের অতিপ্রিয় শিল্পী মান্না দে’র জন্মদিন। আর তাই এবারের পর্বে বিশেষ করে কথা বলব কাকার জন্মদিন আর তার উদযাপন নিয়ে।বছরের মধ্যে যে দিনগুলো আমার সবচেয়ে প্রিয়, তার অন্যতম এই ১ মে। কারণ, ১লা মে আমার সঙ্গীতগুরু, আমার সেজকাকু মান্না দে’র জন্মদিন। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি এই দিনটাকে অনেকেই বলে থাকেন ‘মে ডে- মান্না ডে’। কাকার জন্মদিনকে ঘিরে কত যে স্মৃতি! আগের কোনও কোনও পর্বে তেমন দুএকটি ঘটনার উল্লেখও করেছি। ছোটবেলা থেকে দেখছি, আমাদের বাড়িতে ১ মে দিনটা যেন উৎসবের দিন। এখন অবশ্য আনন্দের পাশাপাশি শোকেরও দিন ১ মে। কাকার জন্মদিন, অথচ তাঁর সঙ্গে কথা হবেনা, তাঁকে প্রণাম করতে পারব না, এটা ভাবলেই ইমোশনাল হয়ে পড়ি। কাকা নেই, কিন্তু প্রতিবছর ফিরে আসে ১ মে, এই দিনটা আমার জীবনেও এক বিশেষ দিন, মহৎ দিন।

কাকার জন্মদিন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অনেক কথাই ভিড় করে আসছে মনে৷ ছোটবেলা থেকেই কাকার জন্মদিনকে ঘিরে যেসব স্মৃতি জমে আছে মনের মধ্যে, যে স্বপ্ন গড়ে উঠেছে – সেইসব স্মৃতি আর স্বপ্নই আজ এই পর্বে ভাগ করে নেব আপনাদের সঙ্গে।

কাকার কিছু কিছু প্রিয় জিনিস আমার জানা। যদিও নিজের দীর্ঘ জীবনে নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন কাকা। একজন মানুষের মুড তো সারাজীবন সমান থাকে না। অবস্থা ব্যতিরেকে তাঁর অভিব্যক্তিও বদলে যায়। তবু তাঁর সঙ্গে কথা বলে যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার, তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই কথাগুলো বলতে পারছি। আর সেটুকুই আমার অধিকার।

অনেকেই জানতে চান কাকার প্রিয় গায়কগায়িকা কারা ছিলেন? এ প্রসঙ্গে বলি, কাকা সবসময় যাদের নাম করতেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বড়ে গুলাম আলি খাঁ, মহম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর এবং সর্বোপরি তাঁর নিজের ছোটকাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে। প্রথমেই তাঁর নামটাই রাখা দরকার, কারণ শুধু প্রিয় গায়ক নন, কৃষ্ণচন্দ্র দে’ ছিলেন সেজকাকার সঙ্গীতগুরুও। প্রিয় সঙ্গীতপরিচালক কারা ছিলেন? বিভিন্ন সময় গান শেখানো বা কথাবার্তা প্রসঙ্গে তিনি আমাকে যেটুকু বলেছিলেন, তার ভিত্তিতে বলতে পারি, কাকার প্রিয় সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন, শঙ্কর জয়কিষন, রাহুল দেব বর্মন, বাংলায় নচিকেতা ঘোষ এবং সুধীন দাশগুপ্ত। এই মানুষগুলোকে নিয়ে অনেকসময় অনেক আলোচনাই করেছেন, যা পরে সুযোগ পেলে আপনাদের নিশ্চয়ই শোনাব, তবে আজ এই জন্মদিন স্পেশাল এপিসোডে তাঁর প্রিয় জিনিসগুলোর কথাই বিশেষভাবে তুলে ধরতে চাই।

কাকার ভীষণ প্রিয় অভিনেতা ছিলেন রাজকাপুর, বাংলায় উত্তম কুমার। আর প্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন নার্গিস। আমার সঙ্গে যেটুকু কথা হয়েছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি তাঁর প্রিয় চিত্র পরিচালক ছিলেন রাজকাপুর আর বাংলায় তপন সিনহা। অবশ্য অন্য জায়গায় কাকার অভিব্যক্তি আলাদা হলে বিস্মিত হব না৷ প্রিয় গীত রচয়িতা ছিলেন হিন্দিতে শৈলেন্দ্র জি, আর বাংলায় পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। প্রিয় রাগ ছিল ইমন, ভৈরবী আর ভূপালী।

বই পড়তে খুব ভালবাসতেন কাকা। গানের পরে বলতে গেলে এটাই ছিল তাঁর প্রিয় অভ্যেস। যখন যেমন সময় পেতেন বই নিয়ে বসে যেতেন। বায়োগ্রাফি পড়তে কী যে ভালোবাসতেন কাকা! জীবনচরিত আর ক্লাসিকস, এই ছিল তাঁর প্রিয় বই৷

মনে আছে, একবার খুব লজ্জা আর সঙ্কোচ নিয়েই জিজ্ঞেস করেছিলাম তাঁর প্রিয় সঙ্গীর ব্যাপারে। শত হলেও তিনি আমার গুরুজন, তাই ভয় ছিল পাছে প্রশ্ন শুনে রাগ করে বসেন। কিন্তু দেখেছি, প্রিয় সঙ্গী হিসাবে তিনি বরাবরই নির্বাচন করেছেন আমার কাকিমা সুলোচনা দেবীকে। এর ব্যতিক্রম কখনও হয়েছে বলে মনে হয় না। ভীষণ পারিবারিক মানুষ ছিলেন কাকা। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে, অবসর যাপন করতে ভালোবাসতেন। রান্নার আয়োজন করা আর নিজে হাতে রান্না করে মানুষকে খাওয়ানো এ ছিল কাকার অন্যতম শখ বা বিনোদন। রান্না করতে ভারি ভালোবাসতেন আমার সেজকাকা, এটা অনেকেই জানেন না। নিজে কিন্তু খুবই মিতাহারী মানুষ ছিলেন কাকা। খেতেন অল্প পরিমাণে। কোনও একটা খাবার হয়তো ভালোলাগলো, কিন্তু ভালো লেগেছে বলেই অনেকখানি খাবেন, এমন মানুষ একেবারের ছিলেন না। মাপা খাওয়া আর ডিসিপ্লিনড জীবন- এই ছিল কাকার পছন্দ। খাবারের মধ্যে খুব ভালোবাসতেন বেগুন ভাজা, কচি পটল ভাজা, শুক্তো, লুচি, ফিসফ্রাই, চিংড়িমাছ আর দইবড়া। এমনি মাছ মাংসের পদ ভালোবাসতেন, কিন্তু খুব প্রিয় খাবার বলতে এগুলোই ছিল। আর মিষ্টির পছন্দটা নির্ভর করত সময়ের উপর। যেমন শীতকালে নতুন গুড়ের মিষ্টি বেশ পছন্দ করতেন। সিমলা পাড়ায় আমাদের বাড়ি। আর সিমলা পাড়ার তো মিষ্টি বিখ্যাত। তার মধ্যে কাকার পছন্দ ছিল ঘিয়ের মিহিদানা, ছানার পোলাও, আর মালপো খেতেও ভালোবাসতেন খুব। তাঁর প্রিয় খাদ্যের লিস্টে এগুলো থাকবেই।

চার ভাইয়ের মধ্যে আমার বাবা প্রণব দে ছিলেন বড়, সেজকাকা ছিলেন তিন নম্বর। ভাইদের মধ্যে বাবার খুব প্রিয় ছিলেন সেজকাকা। ছোটবেলায় দেখেছি, কাকা যখন কলকাতায় থাকতেন, তখন তিনি যা যা খেতে ভালোবাসেন ঠিক সেইসব জিনিসই বাজার করে নিয়ে আসতেন বাবা। আমার কত ছোটবেলার স্মৃতি, এখনও মনে পড়ে বাবার সঙ্গে হাতিবাগান বাজারে বা মাণিকতলা বাজারে গিয়ে কাকার পছন্দের জিনিস কেনা। ‘মানা এগুলো খেতে ভালোবাসে’, তাই বেছে বেছে সবজি, মাছ-মাংস কিনে আনতেন বাবা। বাবা তো অনেকদিন আগেই গত হয়েছেন। কিন্তু তারপরও আমি, আমার স্ত্রী, আর বাড়িতে বিশেষ করে আমার বড়দিদি মমতা কাকার জন্মদিনের সময় তিনি যে যে জিনিস খেতে ভালোবাসেন, মাংস, ফুসফ্রাই- এসব রান্না করে খাওয়াতেন। আমার স্ত্রী রিনাকেও দেখেছি, পোস্ত, চিংড়িপোস্ত বা চিংড়িমাছের ভালো ঝাল, যেগুলো খেতে ভালোবাসতেন কাকা সেসব পদই রান্না করত। মাছের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিল চিংড়ি আর ভেটকি। ফ্রেস পোনা মাছও পছন্দ করতেন। আর তার সঙ্গে লুচি মাংস এসব তো থাকতই। বড়দি আর ছোটকাকিমার হাতের রান্না খেতে ভারি ভালোবাসতেন কাকাবাবু। আর আমার মা, মানে ওঁর বড়বৌদি যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন উনিই নিজের হাতে খাবার বেড়ে খাইয়েছেন কাকাকে, ছোটবেলা থেকে তেমনটাই দেখেছি আমরা।

সেজকাকুর সঙ্গে আমি, স্ত্রী রিনা আর মেয়ে সুলগ্না

খেলা দেখতে খুব ভালোবাসতেন কাকা। ক্রিকেট আর ফুটবল দুইই ছিল প্রিয় খেলা। বিশেষ করে, বিদেশি ফুটবল খেলা দেখতে খুবই ভালোবাসতেন উনি। তবে কমবয়সে, বম্বেতে থাকাকালীন শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে মাঠে মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গলের ম্যাচ দেখতেও গেছেন। কট্টর মোহনবাগান সাপোর্টার ছিলেন কাকা৷ আর শচীন কর্তা ছিল ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার। ক্রিকেট খেলাও পছন্দ করতেন। প্রিয় ক্রিকেটার যদ্দূর মনে পড়ছে শচীন টেন্ডুলকর। বিভিন্ন সময়ে আরও বেশ কিছু ক্রিকেটারের নাম উল্লেখ করলেও শচীনের প্রতিভায় খুবই মুগ্ধ ছিলেন সেজকাকা।

জন্মদিনে প্রচুর মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন কাকা৷ উপহারও পেতেন প্রচুর। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রচুর মানুষ তাঁদের সাধ্যমতো নানা জিনিস উপহার দিতেন কাকাকে। আর কাকা জন্মদিনে কলকাতায় থাকলে তো কথাই নেই। সারা ভারতবর্ষ, সারা পৃথিবী থেকে ওঁর কত যে গুণমুগ্ধ ভক্ত ফোন করতেন সেদিন! শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে যেত। ফুলের তোড়া উপচে পড়ত বাড়িতে। ফার্স্ট মে সত্যিসত্যিই উৎসব ছিল আমাদের বাড়িতে।
মৃত্যুর আগে শেষ দশবছর বাদ দিলে জন্মদিনটা মোটামুটি কলকাতাতেই থাকতেন কাকা। সেসময় অনুষ্ঠানও থাকত নানা জায়গায়। তিবে একটা জিনিস দেখতাম, জন্মদিনে এই ভালোবাসা, ফুল দেওয়া খুব পছন্দ করলেও, দামি উপহার দেওয়া একেবারেই পছন্দ করতেন না কাকা। এতে অস্বস্তি হত তাঁর৷ বলতেনও সেকথা। অনেককেই বলেছেন, ‘এসব দামি উপহার আমায় দেন কেন! আমার খুব সঙ্কোচ হয় এসব নিতে’। জীবনে অনেক মানুষকেই দেখেছি, যারা দামি উপহার পেতে ভালোবাসেন। কিন্তু কাকা ছিলেন একেবারে উলটো। দামি উপহার, হয়তো কেউ মন থেকে ভালোবেসেই দিচ্ছে… তবু নিতে গিয়ে খুব সংকুচিত হয়ে যেতেন কাকা। একই জিনিস আমাদের ক্ষেত্রেও দেখেছি। যখন বড় হয়েছি, উপার্জন করেছি, আমি বা আমার স্ত্রী কাকার জন্য হয়তো কিছু উপহার কিনেছি, তখনও কাকা একইরকমভাবে বাধা দিয়েছেন, বিব্রত হয়েছেন। এরকমই মানুষ ছিলেন আমার সেজকাকা। এত ডাউন টু আর্থ মানুষ, কিন্তু বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যেত না।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

আমার সেজকাকু মান্না দে (একাদশ পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More