অনাদরে, অবহেলার মধ্যেই কোভিডই কেড়ে নিল ফুটবল প্রাবন্ধিক শিবরাম কুমারের জীবন

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁকে দেখে মনেও হতো না তাঁর মস্তিষ্কে এমন রত্নভান্ডার লুকিয়ে রয়েছে। প্যান্টকে পেটের ওপরে তুলে জামা গুঁজে পরতেন।

ময়দানের কলকাতা ক্রীড়া সাংবাদিক তাঁবুতে আসতেন বিকেলের দিক করে, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়। এসেই ক্লাবের কেয়ার টেকার নর সিংকে লাল চা-র অর্ডার দিতেন, সঙ্গে থাকত একটা মোটা লাঠি। নিজে একটা চেয়ারে বসতেন, আর লাঠিটাকে রাখতেন অন্য একটা চেয়ারে।

অনুজ সাংবাদিকদের দেখা মাত্রই প্রশ্ন করতেন, ‘‘কি ভাই, কাজ কেমন চলছে? কোন মাঠ থেকে আসা হল?’’ এত অমায়িক ব্যবহারের মানুষ ছিলেন, কোনওদিন যদি শুনতেন ক্লাবে কারোর স্মরণসভা রয়েছে, যতই অসুবিধে থাকুক, তিনি আসবেনই।

ময়দানের সেই অজাতশত্রু যশস্বী সাংবাদিক, ফুটবল প্রাবন্ধিক ও ইতিহাসবিদ শিবরাম কুমার চলে গেলেন শনিবার সকালেই। কোভিডই কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ। বয়স হয়েছিল ৮০। বরানগর বিটি রোডের এক বেসরকারী হাসপাতালে এই প্রবীণ সাংবাদিকের জীবনাবসান ঘটেছে।

আদতে হুগলি জেলার বাসিন্দা ছিলেন, প্রখ্যাত ক্রীড়া সম্পাদক রাখাল ভট্টাচার্যের অধিনে কাজ শুরু করেছিলেন। সাতের দশকে কলকাতা গড়ের মাঠে তখন বেশ কিছু ক্রীড়া পত্রিকা প্রকাশ হয়। ‘ক্রীড়া-আনন্দ’, ‘অলিম্পিক’, ‘গড়ের মাঠ’, খেলার মাঠ,  ‘মাঠে-ময়দানে’ এবং ‘গ‍্যালারি’। তখনও ‘খেলার আসর’ বা ‘খেলার কথা’ বাজারে আসেনি। ক্রীড়া আনন্দ পত্রিকায় সেইসময় ছিলেন নামী ধারাভাষ্যকার অজয় বসু, এছাড়াও ছিলেন সন্তোষ শীল, প্রদীপ রায়ের মতো নামী লেখক ও ধারাভাষ্যকাররাও। তারকা ভিড় ছিল ওই ম্যাগাজিনে।

সাতের দশকে শিবরাম কুমার শুরু করেছিলেন সাপ্তাহিক ক্রীড়া পত্রিকা ‘গ‍্যালারি’। ওই সময় খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল শিবরামবাবুর ‘গ‍্যালারি’। ওই কাগজে লেখার পর অনেকেই সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

প্রায় একক উদ্যোগে আর বি প্রণীত কলকাতা ফুটবল বইটি সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করে প্রকাশ করেন তিনি। এই জন্য তিনি প্রভাবতী প্রকাশনী নামে একটি প্রকাশনার কাজ শুরু করেন।

তাঁর লেখা প্রথম বই ছিল ‘পেলে ফুটবলের বাদশা’। পরে লিখেছিলেন ‘ক্রিকেটের জাদুকর স্যার ডন’। সম্পাদনা করেছেন ‘মোহনবাগান অমনিবাস’, ‘কলকাতা স্পোর্টস কুইজ’, ‘বিখ্যাত ক্রিকেটারদের ছেলেবেলা’ এবং ‘সোনার ফ্রেমে মোহনবাগান ১৯১১’।

গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে শিবরাম কুমার পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে দুই পুত্রের বাড়িতে শয্যাশায়ী হয়ে কাটিয়েছেন। গত তিন সপ্তাহ ধরে শারীরিক অসুস্থতার মাত্রা বেড়ে গেলে ডাক্তারের পরামর্শে ১৬ এপ্রিল জেনিথ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তাঁর কোভিড পজিটিভ ধরা পড়ে।

সব থেকে বড় কথা, এত নামী ফুটবল লেখক হয়েও কোনওদিন তাঁকে সরকারী স্বীকৃতি টুকু দেওয়া হয়নি। এমনও দিন গিয়েছে বাড়িতে রেশন তোলার অর্থ পর্যন্ত ছিল না। কারোর কাছে অর্থও চাইতেন না, নিজের লেখা বই বরানগর বাজারে বিক্রি করে সংসারের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। অনাদরে, অবহেলাতেই কেটেছে তাঁর জীবন।

 

 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More