মারাদোনা মানে মতাদর্শগত লড়াই, আমেরিকার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

দেবাশিস সেনগুপ্ত

২২শে জুন, ১৯৮৬।

হাওড়ার মফস্বলে একটা অ্যানটেনা সমৃদ্ধ সাদা কালো টিভিতেই স্বর্গীয় সুখ পেয়েছিলাম সেদিন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সেদিন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে স্বপ্নের গোল করেছিলেন আর্জেন্তিনার দশ নম্বর জার্সিধারী।

যে গোল তর্কাতীতভাবে বিশ্বকাপের সেরা গোল বলা হয় আজও। তার ঠিক আগেই পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন ওই বিখ্যাত পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি।

খেলাশেষে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ওটা ছিল “ঈশ্বরের হাত”। আর্জেন্টিনার ২-১ গোলে জেতা সেই ম্যাচে তাঁর প্রতিপক্ষ টিমে ছিলেন গ্যারি লিনেকার, যিনি সেদিন ইংল্যান্ডের একমাত্র গোলটি করেছিলেন। দিয়েগো মারাদোনার প্রয়াণের খবরে ইংল্যান্ডের সেই প্রাক্তন স্ট্রাইকার টুইট করে জানিয়েছেন, ‘‘আর্জেন্টিনা থেকে খবর এল মারাদোনা আর নেই। আমার প্রজন্মের সেরা ফুটবলার। তর্কহীন ভাবে সর্বকালের সেরা। অবশেষে ঈশ্বরের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে হয়ত শান্তি পাবে।’’

“ঈশ্বরের হাত” আজও ভোলা হয়নি লিনেকারের বা ইংল্যান্ডের। “ঈশ্বরের পা”দুটোও কোনদিন ভুলবে না তারা। ওই পায়ের জাদুতে মোহান্বিত হয়ে থাকত বিশ্ব ফুটবল।

১৯৮৬-র বিশ্বকাপ যদি মারাদোনার হয়ে থাকে, তা হলে ১৯৭৮-এর বিশ্বকাপ মারিও কেম্পেসের। সে বারের বিশ্বকাপে লুই সিজার মেনোত্তির দলে জায়গা হয়নি ১৮ বছরের মারাদোনার। তার চার বছর পরে ১৯৮২ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপে প্রথম মাঠে নামেন তিনি। তখন তাঁর সতীর্থ ছিলেন কেম্পেস। সেই কেম্পেস টুইট করেছেন, ‘‘আমাদের ছেড়ে আজ চলে গেল মারাদোনা। ওঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। ফ্লাই হাই দিয়েগো।’’

পেলে, মেসি, রোনাল্ডো থেকে শুরু করে বিশ্বের মহাতারকাদের শোকবার্তার সুনামি ধেয়ে আসছে। কারণ বিশ্ব জুড়েই কারও শৈশব, কারও কৈশোর, কারও যৌবন, কারও প্রৌঢ়ত্ব, আবার কারও বার্ধক্য জীবনের সঙ্গে জুড়েছিলেন রাজপুত্র।

মারাদোনা ৪টি বিশ্বকাপে কোয়ালিফায়ার আর ফাইনাল রাউন্ড মিলিয়ে ২৯টি খেলায় ১১টি গোল করেছেন (যার মধ্যে ফাইনাল পর্যায়ে ছিল ২১টি ম্যাচে ৮টি গোল), ১৮ বছরে (১৯৭৭-১৯৯৪) দেশের হয়ে মোট ৯১টি খেলায় করেছেন ৩৪টি গোল।

সিনিয়র ক্লাব পর্যায়ে ২২ বছর খেলে (১৯৭৬-১৯৯৭) ৪৯১ ম্যাচে করেছেন ২৫৯টি গোল। এবং তার চেয়ে অনেক বেশী করেছেন “অ্যাসিস্ট”। ১৯৯৪-২০১০, ১৬ বছরের কোচিং জীবনে ৭টি ক্লাবদলের সঙ্গে দেশের ফুটবল টিমেরও ম্যানেজার ছিলেন ৩ বছর (২০০৮-২০১০)।

অনবদ্য স্কিল আর সহজাত ফুটবলবোধ তাঁকে ফুটবলের ঈশ্বরের বরপুত্র বলে চিহ্ণিত করেছিল। খাটো উচ্চতা আর মাঝারি ধরনের দৈহিক গঠন তাঁকে দ্রুতগতি আর প্রতিপক্ষর দৈহিক চাপ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা দিয়েছিল। তাই তিনি পূর্ণ গতিতে ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষের গোল লাইনে পৌঁছানো এবং সতীর্থদের সঠিক পাস প্রদান অনেকটাই স্বচ্ছন্দে করতেন।

তিনি স্বতন্ত্র ছিলেন অন্য জায়গায়। সবাই ফুটবলকে স্রেফ একটা খেলা ভাবতে ভালবাসে, আর মারাদোনা ভাবতেন লড়াইয়ের হাতিয়ার। মাঠে তাঁর ফুটবলের সমান্তরাল আর একটা লড়াই তিনি আজীবন চালিয়ে গিয়েছিলেন।

মাঠে যখন তাঁকে বিপক্ষের ডিফেন্ডাররা ঘিরে ফেলতেন, তিনি ওই গাট্টাগোট্টা চেহারা নিয়ে সব ভেদ করে দৌড়তেন। সেই দৌড়ের বিরুদ্ধে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে জেহাদ থাকত। ওই লড়াই তাঁকে বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল। মাঠে যখন তিনি চমকপ্রদ প্রতিভার বিচ্ছুরণে একটার পর একটা গোল করতেন বা করাতেন, তখন মাঠের বাইরের সমান্তরাল সেই লড়াইটা তাঁকে বসিয়ে দিয়েছিল বিশ্বের যাবতীয় “হ্যাভ নট”দের পাশে, তাঁদের সামগ্রিক একমাত্র বাঁচার রসদ হয়ে।

সেই লড়াই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল কিউবায় চিকিৎসা করাতে যেতে, ফিদেল কাস্ত্রোর বাড়িয়ে দেওয়া হাত শক্ত করে ধরতে। ২০০০ সালে মাদকাসক্তিজনিত রিহ্যাবে যাবার প্রয়োজন দেখা দিলে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দেন ফিদেল কাস্ত্রো, “লা পেডেরেরা” ক্লিনিকে তাঁকে রাখবার ব্যবস্থা করে।

তখন মারাদোনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাবার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিউবায় চলে যান এবং সুস্থ হয়েই আর্জেন্টিনাতে ফেরেন। এবং এখান থেকেই তৃতীয় বিশ্বের সামনে একটি অসমবয়সী অনুকরণযোগ্য একটি বন্ধুত্ব জন্ম নেয়, ফিদেল কাস্ত্রো এবং দিয়েগো মারাদোনার মধ্যে।

মারাদোনার বাঁ পায়ে কাস্ত্রোর প্রতিকৃতি উল্কি করা ছিল। মারাদোনা তাঁর আত্মজীবনী “এল দিয়েগো” উৎর্গ করেছিলেন কয়েকজন মানুষের প্রতি, যাঁদের মধ্যে ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন অন্যতম। বইটিতে তিনি লিখেছিলেন, “ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতি, এবং তাঁর মাধ্যমে কিউবার সকল মানুষের প্রতি।” সেই লড়াই তাঁর হাতে এঁকে দিয়েছিল আর্জেন্টিনার বিপ্লবপুরুষ চে গুয়েভারার উল্কি।

সেই লড়াই মারাদোনাকে শিখিয়েছিল হুগো স্যাভেজকে শ্রদ্ধা করতে, তিনি ভেনেজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সমর্থক ছিলেন। ২০০৫ সালে, স্যাভেজের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য তিনি ভেনিজুয়েলা যান। সেই সাক্ষাতের পরে মারাদোনা বলেছিলেন যে তিনি এসেছেন একজন “মহান ব্যক্তির” সাথে সাক্ষাৎ করতে, কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি সাক্ষাৎ করলেন এমন একজন ব্যক্তির সাথে যিনি মহানের চেয়েও বেশি।

“আমি স্যাভেজে বিশ্বাসী, আমি স্যাভিস্তা। ফিদেল যা করেন, স্যাভেজ যা করেন, আমার কাছে সেগুলোই ঠিক।” বলেছিলেন দিয়েগো। ২০০৭ সালের আগস্টে, স্যাভেজের একটি সাপ্তাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেন, “আমি সবকিছুকেই ঘৃণা করি যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে। আমেরিকাকে ঘৃণা করি আমার সর্বশক্তি দিয়ে।” কে এত সাহস নিয়ে এই কথা বলার ক্ষমতা রাখেন?

সেই লড়াইয়ের জেরেই ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার মার দেল প্লাটায় সামিট অফ দ্য আমেরিকাস-এ তিনি আর্জেন্টিনায় জর্জ ডব্লিউ বুশের উপস্থিতির বিরোধিতা করেছিলেন আর সেই লড়াইয়ের জেরেই ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে, মারাদোনা ইরানের জনগনকে সমর্থন জানানোর জন্য একটি সইকরা জার্সি দান করেন। এটি পরে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাদুঘরে রাখা ছিল।

সেই লড়াই তাঁকে শিখিয়েছিল করোনা অতিমারির সময়ে নিজের ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের জার্সি দান করে দিয়ে অতিমারির বিরুদ্ধে জনতার পাশে দাঁড়াতে। একদম ছোটবেলায় দারিদ্র্যকে চেখে দেখা মারাদোনার লড়াইতে অনুঘটকের কাজ করত। তাঁর প্রতিষ্ঠান বিরোধী মনোভাবের অঙ্কুরও পোঁতা হয়েছিল ঐ ছেলেবেলাতেই, যখন মাত্র ৮ বছর বয়সেই তাঁকে এস্ত্রেয়া রোজার যুব টিমের হয়ে খেলতে দেখা যায়। ১৬ বছর বয়স থেকেই তিনি সিনিয়র টিমে জায়গা করে নেন, আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স দলে।

সেই লড়াই তাঁকে টানা সাত বছর (১৯৮৪-৮৫ থেকে ১৯৯০-৯১) খেলিয়ে নিয়েছিল ইতালিয়ান ফুটবলের দুর্বল, অকুলীন নাপোলির হয়ে, তাদের এক নতুন উচ্চতায় তুলে দিতে। নাপোলিতে মারাদোনা তাঁর ফুটবলক্ষমতার শিখরে পৌঁছে যান। নিমেষের মধ্যে তিনি ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সেই সময়টিই ছিল নাপোলির ইতিহাসের সর্বকালের সফলতম যুগ।

মারাদোনার নাপোলি ১৯৮৬–৮৭ ও ১৯৮৯–৯০ মরশুমে সিরি এ চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ১৯৮৭–৮৮ ও ১৯৮৮–৮৯ মরশুমে তারা রানার্স হয়। এছাড়া মারাদোনার সময়ে নাপোলি একবার কোপা ইতালিয়া জেতে (১৯৮৭) এবং একবার রানার্স (১৯৮৯) হয় এবং ১৯৯০ সালে ইতালীয় সুপার কাপ জিতে।

১৯৮৭–৮৮ মরশুমের সিরি এ-তে মারাদোনা সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। নাপোলির হয়ে সাত বছরে মোট ১৮৮ ম্যাচে ৮১ গোল করেছিলেন মারাদোনা। পরবর্তীকালে নাপোলিতে থাকাকালীন মারাদোনার পারফরম্যান্সের প্রতি সম্মান জানিয়ে নাপোলির ১০ নম্বর জার্সিটি সরকারিভাবে সংরক্ষিত রাখা হয়।

১৯৮৬–৮৭-তে নাপোলি সিরি এ জেতার পরে নাপোলিতে কয়েকদিন আগে মৃত কোনও এক ফুটবলপ্রেমীর কবরের গায়ে লেখা, “তুমি জানো না, তুমি কি হারিয়েছ” সম্ভবত মারাদোনার ফুটবল জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

সেই লড়াই ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেই ২৫শে জুন ১৯৮৬তে তাকে দিয়ে বলিয়ে নেয় “আমার বুয়েনস এয়ারসের শহরতলীর ভিলা ফিওর্তিওর সমস্ত বাচ্চাকে আমি মেক্সিকোয় উড়িয়ে এনে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখাতে চাই।” ভিলা ফিওর্তিওর বস্তিতে শৈশবের বেড়ে ওঠার সময়ের গরীবির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইর দিনগুলো সারা জীবন তাঁর মনের মনিকোঠায় ভেসে না বেড়ালে এটা সম্ভবই হত না।

“হ্যান্ড অফ গড” গোলের পাশেই তিনি রেখে গেছেন তাঁর ঠিক পরে করা “শতাব্দীর সেরা” গোলটি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জেতার কৃতিত্বের পাশেই তিনি রেখে গেছেন ড্রাগ বিতর্ক। ঠিক সে ভাবেই তাঁর ফুটবলের পাশেই তিনি রেখে গেছেন মাঠের বাইরের সমান্তরাল লড়াইটাও।

তিনি শুধু ফুটবলার ছিলেন না। ছিলেন দুর্বল, লড়াকু মেহনতী মানুষের বন্ধু ও হাতিয়ার। যতদিন এই পৃথিবীতে ফুটবল থাকবে, তিনি বেঁচে থাকবেন এই পৃথিবীতে। যতদিন এই পৃথিবীতে লড়াকু মেহনতী মানুষ থাকবে, তিনি বেঁচে থাকবেন এই মানুষগুলির মধ্যে।

বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের একটা ব্ল্যাক ডে হিসেবেই থেকে গেল ২৫ নভেম্বর তারিখ। ২০০৫য়ে বিশ্ব ফুটবলের আর এক প্রতিভা জর্জ বেস্ট, ২০১৬তে কিউবার বিশ্বজননায়ক ফিদেল কাস্ত্রোর পরে ২০২০তে বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদী উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক মারাদোনাও না ফেরার দেশে চলে গেলেন ওই একই তারিখে।

জীবনের সিংহভাগ তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর ফুটবল ও তা থেকে পাওয়া লড়াই করার বাসনাকে কেন্দ্র করেই। বিদায়, দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। আপনার মৃত্যু নেই, শুধু ছুটি নিয়েছেন কয়েকটা দিনের, আবার ফিরবেন মারাদোনা হয়েই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More