সৌরভ যা পারেন, দ্রাবিড় সেই ঝুঁকি নিতে পারেন না, মনে করছেন প্রাক্তনরা

0

শুভ্র মুখোপাধ্যায়

 

কথায় রয়েছে, সময়ের কাজ সময়তেই করতে হয়, না হলে সেটির আর দাম থাকে না।

রাহুল দ্রাবিড় ভারতীয় দলের সিনিয়র কোচের পদ প্রত্যাখ্যান করায় সেই প্রশ্ন উঠছে। ক্রিকেটমহলে বলা হচ্ছে, আর কবে ঝুঁকি নেবেন রাহুল? এটাই তো তাঁর উপযুক্ত সময় ছিল কোহলি, রোহিতদের কোচ হওয়ার।

অনেক ক্ষেত্রে তারকাদের নিজের চাওয়া-পাওয়ার বাইরে গিয়েও জনগনের কথা মানতে হয়, তাদের দাবিও মাথায় রাখতে হয়, সেটাই নিয়ম। সেই দাবির কথা কানেই তুললেন না দ্রাবিড়।

তাই আলোচনাও হচ্ছে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় যেটি পারেন, সেটি পারেন না রাহুল দ্রাবিড়। সৌরভ চেনা ছকের বাইরে গিয়েও ম্যাচ জেতাতে পারেন। পৃথিবী একটা দিকে, আর সৌরভ বিপরীত দিকে, সেই ‘মাঠের বাইরের ম্যাচ’ও ঘুরিয়ে দিয়েছেন মহারাজ। তিনি ঝুঁকি নেওয়ার বাদশা।

সেই কারণেই তাঁর উত্থান হয়েছে চমকপ্রদভাবে। তিনি একটা জায়গায় আটকে থাকেন না, নানা কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারেন। এবং সব কাজই করেন নিখুঁতভাবে। দ্রাবিড়কে অত ঝামেলায় যেতে হয়নি। তিনি আটপৌরে বাঙালির মতোই, ট্রেনিং করালাম, বাড়ি চলে এলাম…, এরকম গোছের ঝুঁকিহীন মানুষ।

না হলে দ্রাবিড়ের যা ক্রিকেট ক্যারিশমা ও জ্ঞান রয়েছে, অনেকের তা নেই। তিনি ক্রিকেটের আদর্শ শিক্ষক, তিনি ব্যকরণ মেনে ক্রিকেট খেলে এসেছেন। তিনি প্রশাসনিক বিষয়ে অত নাক গলাতে ভালবাসেন না। সেই কারণে তাঁর বন্ধু জাভাগল শ্রীনাথ ও অনিল কুম্বলে যখন কর্ণাটক ক্রিকেট সংস্থায় এলেন, সেইসময় রাহুলকে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন, তিনি সেই কথাতেও কান দেননি। কারণ তিনি সবসময় সেফ সাইডে থাকতে চেয়েছেন। সকলের পছন্দের মানুষ হিসেবে। তাই তিনি অজাতশত্রু ব্যক্তিত্ব। গ্রেগ চ্যাপেলের মতো হাজারো ঝক্কির মানুষের কাছেও তিনি প্রিয় হয়ে ছিলেন।

সৌরভ বারবার ঝুঁকি নিয়েছেন জীবনে। ক্রিকেটার হিসেবে নিয়েছিলেন, খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পরেও তিনি বারবার বাজি রেখে ম্যাচ জিতেছেন। সেই ম্যাচ যদিও প্রশাসনিক কিংবা সঞ্চালনা কিংবা ধারাভাষ্যের কাজেও। জানতেন, যদি ব্যর্থ হন, তাঁর জীবনে দারুণ প্রভাব ফেলবে। তারপরেও সিএবি প্রশাসনে এসেছিলেন। বাংলার কিছু কর্তারা তাঁর পিছনে লাগা সত্বেও তিনি হাল ছেড়ে বাড়ি চলে যাননি। মাটি কামড়ে পড়েছিলেন। শেষে তিনিই জিতেছেন। ওই কর্তারা মানে মানে সরে পড়েছেন।

বোর্ড প্রেসিডেন্ট পদেও সেরকমভাবেই এসেছেন। অন্য কেউ হলে অত ঝামেলার মধ্যেই যেতেন না। তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রশাসনিক ক্ষমতার জন্য নিজের কৌশল সাজিয়ে গিয়েছেন। তিনি বড় প্রশাসকও, দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেট অধিনায়কের মতোই।

না হলে যে দ্রাবিড় সিনিয়র কোচ হিসেবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, তাঁর সামনে কেউ নেই। তিনি বিরাট কোহলিদের কোচ হলে কেউ আবেদনই করবেন না। তিনি সেই পথে পা বাড়ালেন না। অথচ তাঁকে এই অবস্থায় ভারতীয় দলে দরকার ছিল। রবি শাস্ত্রী কোচ থাকা মানে ভারতীয় ক্রিকেট পিছনের দিকে হাঁটা, কারণ শাস্ত্রীর আর কোচ হিসেবে কিছু দেওয়ার নেই।

দ্রাবিড় এর আগে জুনিয়র দলের কোচ হিসেবে সফল হয়েছেন, তাঁর হাত ধরে সাপ্লাইলাইন উঠে আসছে। ভারত ‘এ’ দলের কোচ হিসেবেও সফল। এমনকি ভারতীয় ‘বি’ দলকে নিয়ে শ্রীলঙ্কায় সদ্য ওয়ান ডে সিরিজ জিতেছেন। তিনি এমনিতেই অটোমেটিক চয়েস, তারপরেও তিনি সিনিয়র দলের কোচ না হয়ে জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে পড়ে রইলেন।

বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটারদের একাংশ রাহুলের এই সিদ্ধান্তকে মানতে পারছেন না। সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে অরুণ লাল কিংবা উৎপল চট্টোপাধ্যায়রাও বলছেন, রাহুলের এই ঝুঁকি নেওয়া উচিত ছিল। অরুণ লাল মনে করছেন, রাহুল ইতিমধ্যেই প্রমাণিত দেশের সেরা কোচ হিসেবে। সেখানে কেন তিনি পিছিয়ে এলেন বোধগম্য হল না। মহারাজ এখানেই শচীন, দ্রাবিড়দের টেক্কা দিতে পেরেছেন, বারবার।

উৎপলের মতোই সম্বরণও বলছেন, দ্রাবিড়ের হাতে তৈরি নতুন টিম ইন্ডিয়ার অধিকাংশ ছেলেরা, এই সময় কোচ হলে তিনি ওই দলের ক্রিকেটারদেরও আরও ভাল করে দেখতে পারতেন। অবশ্যই কোচ হওয়া উচিত ছিল দ্রাবিড়ের।

উৎপল জানালেন, ‘‘সৌরভ বোর্ড প্রেসিডেন্ট ও দ্রাবিড় সিনিয়র দলের কোচ, এরচেয়ে ভাল কম্বিনেশন ভারতীয় ক্রিকেট হতো না, রাহুল সেই সুযোগটা হতে দিলেন না।’’ বাংলার নামী প্রাক্তনদের আরও ধারণা, এখনই দ্রাবিড়ের বয়স প্রায় ৫০ হতে চলল, এটাই উপযুক্ত ছিল তাঁর কোচ হওয়ার ক্ষেত্রে। রবি শাস্ত্রী বহুদিন কোচিং করালেন, তিনি নিজেও এই চ্যালেঞ্জ আর নতুনভাবে নিতে চাইছেন না। তাই দ্রাবিড় কোচ হলে ভারতীয় ক্রিকেটের আরও ভাল হতো।

অথচ লড়াই থেকে সরে এসে দ্রাবিড় যেমন নিজেকে বঞ্চিত করলেন, তেমনি তাঁর ক্রিকেট মস্তিষ্ক থেকে দেশের ক্রিকেট প্রেমীরাও সমানভাবে বঞ্চিত হলেন, এ কথা মানতেই হবে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.