আইরিশ সাইডব্যাককে দেখেই অনুপ্রাণিত, ভবানীই ছিলেন অমল দত্তের ‘ওভারল্যাপিং মাস্টার’

দেবাশিস সেনগুপ্ত

 

ভবানী রায় (Bhabani Roy) আর আমাদের মধ্যে নেই, এটা ভাবতেই কেমন লাগছে। এত বড়মাপের ফুটবলার (Footballer), অথচ সেইরকম মর্যাদা পেলেন না। এটাই দুঃখের বিষয়।

ভবানী রায়ের কথা বলতে গেলে ছ’দশক পিছিয়ে যেতে হবে। ১৯৬২তে বালী প্রতিভা, তারপরে উয়াড়ি ঘুরে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ অবধি তিনি ইস্টার্ণ রেলে খেলেছিলেন।

১৯৬৬ সালের ইস্টার্ন রেল দলের গোলকিপার নারায়ণ মণ্ডল দক্ষিণেশ্বরে ভবানী রায়ের বাড়ির কাছেই থাকতেন। একদিন তাঁর কাছে ভবানী খবর পেলেন, অমল দত্ত দক্ষিণেশ্বরের পাড়ায় আসছেন তাঁর প্রজেক্টর নিয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখাতে। সেই সময় কোচ অমল দত্ত প্রোজেক্টর ঘাড়ে নিয়ে  পেলে-গ্যারিঞ্চা-পুসকাসের খেলার ফিল্ম দেখিয়ে বেড়াতেন।

অতএব ভবানী রায় সেদিন পাড়ার মাঠে দৌড়ে গিয়েছিলেন অমল দত্তর প্রোজেক্টরবাহিত আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্বাদ নিতে। সেদিন অমল দত্ত দেখিয়েছিলেন ১৯৬৫র এপ্রিল মাসের ২৮ তারিখে স্ট্যানলি ম্যাথুজের ফেয়ারওয়েল ম্যাচের ফিল্ম।

ম্যাথুজ একাদশ বনাম বিশ্ব একাদশ। তাঁর সেই একান্ত নিজস্ব ব্র্যান্ডেড ধারাভাষ্য মারফত অমল দত্ত সেদিন বারবার বুঝিয়েছিলেন, কী ভাবে বিশ্ব একাদশের আইরিশ সাইড ব্যাক সুযোগ পেলেই ওভারল্যাপে উঠে গিয়ে আক্রমণ করছেন, আবার পরক্ষণেই নীচে নেমে গিয়ে সঠিক পজিশন নিচ্ছেন। তিনি বলেছিলেন, “এ জিনিস এর আগে কেউ দেখেননি এই ভারতের কোথাও”।

ভবানী রায়ের মনে সেই সময় ভীষণ ছাপ ফেলেছিল এই ওভারল্যাপের ব্যাপারটা। অন্যভাবে বলা যায়, কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলের মাইলফলক বছর ১৯৬৯ আসার তিন বছর আগে নিজের অজান্তেই অমল দত্ত ভবানী রায়কে ঐতিহাসিক ওভারল্যাপিং রাইট ব্যাক খেলার প্রথম পাঠ দিয়েছিলেন!

আরও পড়ুন: বন্য ভাল্লুকের ফুটবল জাদুতে মাতোয়ারা গ্রামবাসী, ভিডিও শেয়ারে এল মেসি-রোনাল্ডোর নাম!

সেই ১৯৬৬র কলকাতা লিগে ইস্টবেঙ্গল বনাম ইস্টার্ন রেল দলের প্রথম পর্বের খেলাতে ইস্টবেঙ্গল মাঠে ছিল প্রচুর ভিড় আর ততোধিক বেশী অব্যবস্থা। ইস্টার্ন রেলের জনা পঞ্চাশেক সদস্য মাঠে এসেও ঝামেলার জন্য মাঠে ঢুকতে পারলেন না। রেলের খেলোয়াড়রা মাঠের বাইরে পৌঁছলেন। কিন্তু ইস্টার্ন রেলের সদস্যরা তাঁদের অনুরোধ করলেন “আমরা মাঠে ঢুকতে পারিনি, আপনারাও যাবেন না খেলতে’।

গাড়ি থেকে নামলেও প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মীরকাশিম, কাজল মুখোপাধ্যায়, কালন গুহরা আর মাঠমুখো হলেন না। ইস্টবেঙ্গলের খেলোয়াড়রা মাঠে নেমে পড়েছেন, এই অবস্থায় রেফারি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফিরে গেলেন।

গ্যালারিতে গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়ল, আগুনে পুড়ল গ্যালারির একাংশ। তারপরে যথারীতি পুলিশের লাঠিচার্জ, অনেক দর্শক আহত। এই ম্যাচে ওয়াকওভার পেল ইস্টবেঙ্গল। তারপরে সময় গড়াল সময়ের মত। ইস্টবেঙ্গল এগিয়ে চলল লিগ জয়ের দিকে।

ফিরতি লিগে আবার মুখোমুখি হল দুই দল। ইস্টার্ন রেলের কোচ বাঘা সোম তাঁর খেলোয়াড়দের ডেকে আব্দার করলেন প্রথম লিগের না খেলে হারানো দু’পয়েন্ট এবারে খেলে আর জিতে ফেরত পেতে। তাঁর কথায় উদ্দীপ্ত হলেন সব খেলোয়াড়।

জিতে মাঠ ছাড়ল ইস্টার্ন রেল, মীরকাশিমের থেকে বল পেয়ে অসুস্থ পিকে-র নঈমুদ্দিনকে কাটিয়ে উঁচু শটে ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার থঙ্গরাজকে পরাস্ত করা গোলে। অনেক চেষ্টাতেও সে গোল শোধ দিতে পারলেন না ইস্টবেঙ্গলের অভিজ্ঞ সুকুমার সমাজপতি বা আনকোরা হাবিব।

তাঁদের সামনে প্রাচীর হয়ে উঠলেন ইস্টার্ন রেলের দুই হাফব্যাক কালন গুহ এবং ভবানী রায়। বিশেষ করে ভবানী। লিগে সেবার এই একটি ম্যাচেই হেরেছিল ইস্টবেঙ্গল। সেবার লিগে মোহনবাগানের বিপক্ষেও অসামান্য খেলেছিলেন ভবানী।

ইস্টার্ন রেল প্রথমে গোল করে এগিয়ে গেলেও সেই গোল শোধ করে দিয়েছিলেন সেবারের লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা মোহনবাগানের অসীম মৌলিক। তারপরে ইস্টার্ন রেলের খেলোয়াড়রা মরিয়া লড়াই শুরু করেন ম্যাচটা অন্ততঃ ড্র রাখতে। তাঁদের ডিফেন্ডারদের হার মানাতে না পেরে অবশেষে অনেকদূর থেকে শট করে গোল করেন কান্নন। এই ম্যাচ থেকেই ভবানী রায়ের নামটা জায়গা করে নিল দুই বড় ক্লাবের রিক্রুটারদের গোপন ডায়েরিতে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭তে ভবানী রায় সই করেছিলেন মোহনবাগানে।এর ৪৯ বছর পরে, ২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে ভবানী রায় জানিয়েছিলেন, তার আগের কয়েক বছর ইস্টার্ন রেলের হাফব্যাক পজিসনে কালন গুহের সঙ্গে তাঁর জুটিতে খেলা দেখেই মোহনবাগান ক্লাব তাঁকে সই করিয়েছিল হাফব্যাক হিসেবে।

সেবার মোহনবাগানের হাফব্যাকে ছিলেন সি পাল, বিমল চক্রবর্তী, শ্রীকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, লতিফ প্রভৃতি খেলোয়াড়। খুব একটা সুযোগ পাননি ভবানী রায় ওই বছর এবং ১৯৬৮তেও।

১৯৬৭তে মোহনবাগানের রক্ষণে ছিলেন সুশীল সিনহা, মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রেশ্বর প্রসাদ, অধিনায়ক জার্নেল সিং, বিক্রমজিৎ দেবনাথ, আলতাফ প্রমুখ তারকা খেলোয়াড় আর ১৯৬৮তে এদের সঙ্গে রক্ষণে যোগ দেন নঈমুদ্দিন।

দুরন্ত গতি আর যে কোনও পজিশনে খেলে দেওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ, বরাবর এই দুটি জিনিসই সম্পদ ছিল তাঁর। ১৯৬৭তে চুনী গোস্বামীর পাশে একটা কলকাতা লিগ ম্যাচে ইনসাইড ফরোয়ার্ড খেলেছিলেন তিনি। তিনি স্টপার হিসেবেও খেলেছিলেন সুশীল সিংহের পাশে।

১৯৬৮তে মোহনবাগান যখন শ্রীলঙ্কা সফরে গেল সেই সময় মোহনবাগানের নঈম আর আলতাফ ভারতের হয়ে খেলছিলেন। রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের নিদারুণ অভাব দেখা দিল মোহনবাগানে। আর তাই দেখে শ্রীলঙ্কা সফরের ম্যানেজার করুণা ভট্টাচার্য তাঁকে বললেন, ‘‘তুই এখানে সাইড ব্যাক খেলে দে।’’ সেই থেকে মোহনবাগানের রাইট ব্যাক হয়ে গেলেন ভবানী রায়।

১৯৬৯ সালে যেবার  মোহনবাগানের কোচ হয়ে এলেন অমল দত্ত, সেদিনই ভবানী রায় অবচেতনে বুঝে গিয়েছিলেন যে মোহনবাগান, বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের জন্যও একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসতে চলেছে।

অমল দত্তও জহুরীর চোখ দিয়ে নিশ্চয়ই সেটাই বুঝেছিলেন। মোহনবাগানের জন্যও সেটা ছিল এক সন্ধিক্ষণের সময়। মোহনবাগানে তখন সর্বেসর্বা ধীরেন দে। এমতাবস্থায় মোহনবাগানের ফুটবল দলের নতুন কোচ দায়িত্ব নিলেন মোহনবাগান আর ভারতীয় ফুটবলকে একটা বিরলতম উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। আজন্ম ফুটবল সাধক অমল দত্ত বেরিয়ে আসতে চাইলেন প্রচলিত ফুলব্যাক হাফব্যাক সিস্টেম থেকে। মাঠের দুই প্রান্ত কে আক্রমণ এবং রক্ষণে সমানভাবে ব্যবহার করতে চাইলেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা অমল দত্ত।

মোহনবাগান কর্তাদের মধ্যে তখন প্রচুর আলোড়ন হল এটা নিয়ে এবং যথারীতি প্রবল বাধার মুখোমুখি হতে হল বোহেমিয়ান অমল দত্তকে। কোচ তাঁর যুক্তি, বুদ্ধি আর সমস্ত অর্জিত জ্ঞান দিয়ে নতুন পদ্ধতিটি বোঝানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু ধীরেন দে, শৈলেন মান্না, চুণী গোস্বামী, কাউকে প্রচলিত সিস্টেমের বিরুদ্ধে যেতে পাশে পেলেন না। মরিয়া কোচ তখন যুক্তি, বুদ্ধির বাইরে গিয়ে পরিষ্কার হুমকি দিলেন এই বলে যে কোচ হিসাবে তিনি থাকলে পদ্ধতিগত বিষয়ে (৪-২-৪) শেষ কথা বলার অধিকার তাকেই দিতে হবে।

ভারতীয় ফুটবল তখনও সাইড ব্যাকের ব্যবহার যেভাবে করেনি, কলকাতা ময়দান তখন ভারতীয় ফুটবলকে তাই শেখাতে চললো অমল দত্তর হাত ধরে।

উইং ব্যাক হিসাবে কোচের প্রথম পছন্দ ছিলেন আলতাফ। কিন্তু হঠাৎ আলতাফ কোচকে বলেন যে তিনি উইং ব্যাক খেলতে পারবেন না। শোনা যায়, তৎকালীন কর্তাদের মধ্যে থেকেই এজন্য কলকাঠি নাড়া হয়েছিল। আলতাফের গতি, তারুণ্য, চনমনে ভাব এবং ডিফেন্সিভ কোয়ালিটি উইং ব্যাক খেলার জন্য একদম ঠিকঠাক ছিল।

এতে দমে না গিয়ে কোচ উইং ব্যাকের জন্য তৈরি করে নেন ভবানী রায়কে। শোনা যায়, প্র্যাকটিসের সময় ভবানী রায় এবং কোচকে তুমুল টিকা টিপ্পনী শুনতে হত প্রায় রোজই।পরে আলতাফও লেফট উইং ব্যাকের জায়গা নিতে রাজী হয়ে যান। ভুল বোঝানো হয়েছিল নঈম আর হাবিবকেও। কোচের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি নঈমের গুরুত্ব বুঝে ফেলেছিল এবং তিনি নঈমকে ফুলব্যাক থেকে নিয়ে আসেন হাফব্যাক

মোহনবাগানের কপালে লেখা হয়েছিল ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫য়ের সেই কালো ইতিহাস। অমল দত্ত বিদায় নিতে বাধ্য হলেও তাঁর ৪-২-৪ আর ওভারল্যাপ সিস্টেম থেকে গিয়েছিল মোহনবাগান আর ভারতীয় ফুটবলে। এবং ওই ১৯৬৯য়েই মারডেকা ট্রফিতে ভারতীয় দলের কোচ জার্নাল সিংও ভবানী রায়কে ওভারল্যাপ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।

ভবানী রায়ের কথা বলতে গিয়ে এসব কথা আসছে কেন? ১৯৬৮ আর ১৯৭১য়ে সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা দলের খেলোয়াড়, ১৯৬৯য়ের মারডেকা ট্রফিতে ভারতীয় দলের খেলোয়াড়, ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ এই ছয় বছর টানা মোহনবাগানের খেলোয়াড় আর ১৯৭২য়ে মোহনবাগানের অধিনায়ক হওয়া ভবানী রায়ের কথা বলতে গেলে কোচ অমল দত্ত, ওভারল্যাপ পদ্ধতি আর ১৯৬৯য়ের শীল্ড ফাইনালের কথাকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

রেকর্ড বুক জানায় যে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ এই ছয় বছরে মোহনবাগানের হয়ে তাঁর অর্জন ছিল ৭টি ট্রফি। চার বার রোভার্স কাপ (১৯৬৮, ১৯৭০, ১৯৭১ আর ১৯৭২), এক বার কলকাতা লিগ (১৯৬৯), এক বার আই এফ এ শিল্ড (১৯৬৯) আর ১৯৬৮র অমৃতবাজার শতবার্ষিকী ফুটবল ট্রফি। মোহনবাগান রোভার্স কাপ জয়ের হ্যাটট্রিক করেছিল ১৯৭২ সালে (ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে যুগ্মবিজয়ী), ভবানী রায়ের অধিনায়কত্বে। কিন্তু ওভারল্যাপ পদ্ধতি নামক নবজাগরণের শরিক হিসেবে ভারতীয় ফুটবলে চিরদিন থেকে যাবে তাঁর নাম, অমল দত্তর সঙ্গেই।

তাঁর নিজের কথায় “সত্যি কথা বলতে, সাই়ড ব্যাক, হাফব্যাক, স্টপার, ইনসাইড ফরোয়ার্ড, যে কোনও পজিশনে আমাকে খেলতে তৈরি করার পিছনে ছিলেন কোচ বাঘা সোম, ইস্টার্ন রেলে থাকার সময়। তবে সে রকম ফুটবলার তো এ দেশে আমার আগে বা পরে কতজনই আছে! কিন্তু ভারতীয় ক্লাব ফুটবলে আমার আগে যা কাউকে খেলতে দেখা যায়নি সেই ওভারল্যাপিং রাইট ব্যাক পজিসনে আমাকে খেলিয়ে ইতিহাসে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছেন অমল দত্তই। ধন্যবাদ অমল দত্ত।“

এহেন ভবানী রায় দীর্ঘ রোগভোগের পরে গতকাল ৭৫ বছর বয়সে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ২০১৬র ১০ জুলাই প্রয়াত অমল দত্তর সঙ্গে গতকাল থেকে হয়ত আবার জুটি বেঁধেছেন তিনি অনন্তর মাঠে।

আজ থেকে ৫২ বছর আগের মোহনবাগান মাঠের প্র্যাকটিস সেশন, ড্রেসিংরুমে কোচ অমলদার সঙ্গে ফুটবলার ভবানী রায়ের স্ট্র্যাটেজিক আলোচনা, সে বারের লীগ, শীল্ড আর বছরভর অন্য টুর্ণামেন্টের কিছু মুভমেন্ট, এই সবকিছু  হয়ত গতকাল থেকে টাইমমেশিনে ফিরে পেলেন তাঁরা দু’জনে, পুরনো সিনেমার মত।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More