নীরজদের নিয়ে মাতামাতি অন্যায় নয়, দয়া করে প্যারা অ্যাথলিটদের কৃতিত্ব ভুলে যাবেন না

শেষাদ্রি সান্যাল

 

গত ৫ সেপ্টেম্বর (September) টোকিওতে (Tokyo) প্যারালিম্পিক (Paralympics) শেষ হয়েছে। ভারতের পদকপ্রাপ্তির সংখ্যা এবার নজির স্পর্শ করেছে। সবদিক থেকে এগিয়ে ভারতের এই প্যারা (Para) অ্যাথলিটরা। অথচ কী অদ্ভুত লাগছে, যখন টুর্নামেন্ট চলছিল, একটা উন্মাদনা ছিল তাঁদের নিয়ে। আর দিন দশেকও হয়নি, তাঁদের নিয়ে কোনও আলোচনা নেই।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) দিন তিনেক আগেই প্যারা অ্যাথলিটদের সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি স্বভাবসিদ্ধ ঢঙেই তাঁদের উদীপ্ত করেছেন। এও জানিয়েছেন, তিনিও অনুপ্রেরণা পান তাঁদের দেখে। তিনি প্রশাসনিক শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে তাঁর কাজ করেছেন। কিন্তু জনমানসে ওই প্যারা অ্যাথলিটদের ঘিরে এমন কোনও অনুষ্ঠান হল না, যা তাঁদের কীর্তিকে আরও একবার মনে করায়।

এটাই দূর্ভাগ্য তাঁদের কাছে। আমরা অ্যাথলিট বলতে বুঝি সৌম্য দর্শন, সুন্দর একটা চেহারার ক্রীড়াবিদকে। চোখের সামনে ভেসে উঠবে প্রকাশ পাড়ুকোন ও পুল্লেলা গোপীচাঁদকে। আমরা কি ভাবব প্রমোদ ভগৎ, কৃষ্ণ নাগারদের কথা? নাকি মনে পড়বে অবনী লেখরা, কিংবা ভাবিনা প্যাটেলদের মুখ?

এগুলি আমাদের মধ্যে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, যেটি সাধারণ, তাকে ঘিরেই আমাদের জগৎ। কিন্তু যে এক হাতে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণী পেল, তার প্রতি সহানুভূতি থাকবে, কিন্তু তার শ্রেষ্টত্ব মানতে পারব না, এটাই আমাদের রীতি। তাই প্যারা অ্যাথলিটদের কথা আমরা ভুলতে থাকব, এখনই ভুলে গিয়েছি, আরও ভুলে যাব কয়েকদিন পরে।

আরও পড়ুন: দুটি নয়া নিয়মে হবে আইপিএলের ফ্রাঞ্চাইজি নির্ধারণ, ১৭ অক্টোবর নিলামের দিন

নীরজ চোপড়া, মীরাবাই চানু, লভলিনাদের যতটা গুরুত্ব দেব, শারীরিকভাবে পিছিয়ে পড়া অ্যাথলিটদের দেব না। আমাদের চোখে ভাসবে নীরজের সেই বডি ফেইন্ট, তাঁর দেহের ভাষা, তাঁর চাউনি, গ্যালারির দিকে তাকিয়ে হাত তোলা। কিন্তু দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া, কিংবা সুমিত আন্টিলরাও কোনও অংশে কম লড়েননি। তাঁরাও একই কায়দায় জ্যাভলিন ছুঁড়ে দেশের জন্য পদক এনেছেন। তবুও আমরা সব ভুলে যাব, হয়তো ইচ্ছে করেই!

আমি নিজে একজন ব্যাডমিন্টনের জাতীয় খেলোয়াড় হিসেবে এই বিষয়টি বুঝি। আমাকেও দুঃখ দেয়। প্যারালিম্পিকের সময়ই তো মনোজ সরকার নামে এক তারকা ব্রোঞ্জ জয়ের পরে আমাকে অনেকেই ফোন করে জানতে চেয়েছে, ‘‘হ্যাঁ গো, মনোজ আমাদের বাংলার? বাংলার হলে কোথায় থাকে, কিছু জানো?’’

আমি এইসব প্রশ্নে অবাকই হয়েছি। কারণ অ্যাথলিটদের কোনও অঞ্চল থাকে না, তাঁরা সব সীমার উর্ধ্বে অবস্থান করেন। তিনি দেশের হয়ে খেলতে গিয়ে পদক পেয়েছেন, তারপরেও বাংলার হলে বাড়তি কৃতিত্ব থাকবে, অন্য রাজ্যের হলে তা কি হবে না?

সব উন্মাদনাই একটি নির্দিষ্ঠ সময়ের জন্য। তারপর নীরজদের শহরে আনার জন্য উন্মাদনা থাকবে, অথচ পিছনের সারিতেই থাকবেন প্যারা অ্যাথলিটদের মতো নায়করা। আমি আমার উপমাই দিচ্ছি, এতদিন ধরে আমি শুধু প্যারা ব্যাডমিন্টন তারকা বলতে জানতাম, মানসী যোশীর কথা, কিন্তু এবার প্রমোদ, মনোজরা আমাদেরও চোখ খুলে দিয়েছে।

সমাজের যে কোনও স্তরে শারীরিকভাবে পিছিয়ে থাকাদের আমরা কেমন অন্য চোখে দেখে থাকি। আর সেখানে খেলার মতো কঠিন মঞ্চে ওই অ্যাথলিটরা যে সাফল্য পাচ্ছেন, সেটি আমরাও সহজভাবে নিতে পারছি না, এটা আমাদের মানসিক সমস্যা, ওদের নয়।

অনেকেই আমরা সিন্ধুকে দেখে জানতে চাই, তাঁর লড়াইয়ের কথা, তাঁর উঠে আসার গল্প, কিন্তু আমরা যদি মনোজ, প্রমোদদের কাছে জানতে চাই, সেটি হবে একেবারে আলাদা সংগ্রামের কথা। কারণ তাঁরা সমাজের সর্বস্তরের লড়াইয়ের পাশে নিজেদের শারীরিক সমস্যা নিয়েও লড়ছে। এটাই তাঁদের এগিয়ে থাকা, তাঁদের কৃতিত্ব।

যদিও আমাদের কাছে তারা হিরো হিসেবে প্রতিপন্ন হয় না, কারণ আমাদের চোখে হিরো কিংবা আইডল মানে সুন্দর একটা পুরুষ ও মহিলা ক্রীড়াবিদ, এখানেই এই অসাম্যের ছবি প্রকট হয়ে ওঠে।

সবার শেষ বলব সুবিধে-অসুবিধের কথা। আমাদের মূল ধারার অ্যাথলিটরাই নানা সুবিধে থেকে বঞ্চিত হয়। আর প্যারা অ্যাথলিটদের ক্ষেত্রে কতটা অসাম্য রয়েছে, সেটি তাদেরই কোনও ক্রীড়াবিদ বলতে পারবে। কারণ টেকনিক্যালি ভাল না হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে গিয়ে কোনও লাভ হয় না। শুধু মনের জেদ, ইচ্ছেশক্তি দিয়ে ভারত মহাসাগর সাঁতরানো যায় না। দরকার অত্যাধুনিক সুবিধেও। (লেখিকা ব্যাডমিন্টনের প্রাক্তন জাতীয় খেলোয়াড়)

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More