ডেভিলিয়ার্স এবং ক্রিকেট দেবতার গল্প

0
অরিন্দম মুখোপাধ্যায়

বহুমুখী প্রতিভা ভীষণ জটিল একটা শব্দ। যার সাথে জড়িয়ে থাকে প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তির বিরাট অনিশ্চয়তা। মানুষ যখন কোনো এক কাজে পারদর্শী হয়, সেই কাজকেই ভালোবেসে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন জীবনের যাত্রাপথ খুলে যায় তার সামনে। সে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলে। সমস্ত বাধা বিপত্তিকে জয় করে। নিজের গন্তব্যের উদ্দেশে চলতে থাকে তার যাত্রা। কারণ সে জানে, তার কাজে কোনও ঘাটতি নেই। সে জানে এই কাজে তার নিজের দক্ষতা আর  আত্মবিশ্বাস ঢাল হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। তৈরি হয় বিজয়গাথার এক অনন্য গল্প…

কিন্তু বহুমুখী প্রতিভা ? যখন কেউ একসাথে অনেক কাজে সমানভাবে পারদর্শী হয় , যখন সব কাজেই সে নিজেকে ডুবিয়ে দেয় ভালোবেসে, যখন তার সেই সব  কাজই উৎকর্ষতার চরম সীমা লাভ করে, তখন নিজের আগামী যাত্রাপথ নির্ধারণ করা এক বিশাল বড় প্রশ্ন হয়ে এসে দাঁড়ায় সেই ব্যক্তির সামনে। তার নিজের অন্তরের ডাককে শুনতে পাওয়া বড় কঠিন হয়ে যায় তার কাছে..

ঠিক এমনইতো হয়েছিল, সাউথ আফ্রিকার রাগবি ইউনিয়নের এক ডাক্তারের ছেলের সাথে। খেলাধূলা অন্ত প্রাণ সেই ছেলে যে খেলায় হাত দিত তৈরি করত রূপকথা। গল্ফ, রাগবি, টেনিস, সাঁতার,যে ক্ষেত্রেই সে নামত তৈরি হতো বিজয়গাথার এক অনন্য কাহিনী। ভীষণ সমস্যায় পড়ে গিয়েছিল সে। নির্ধারণ করতে পারছিল না, কোন ক্ষেত্রকে সে বেছে নেবে নিজের আগামীকালের বিচরণভূমি হিসাবে। কিন্তু এসবের মধ্যেই একদিন তাঁর মন ডাক দিলো। বিধাতা তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তানকে লিখে পাঠালেন ঠিকানা। আর সেই ছোট ছেলেটা নিজেকে সঁপে দেওয়ার জন্য বেছে নিল ক্রিকেটকে। যা তাঁর অন্যতম ভালোবাসা ছিল। আর সেদিন থেকেই শুরু হলো তাঁর যাত্রা। এক অসামান্য প্রতিভার যাত্রা। শ্রেষ্ঠত্বের উদ্দেশে।

সাল ২০১৮, ২৩ শে মে। গোটা বিশ্বে নেমে এলো এক শূন্যতা। ক্রিকেটকে  বিদায় জানাচ্ছে তার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। আপামর ক্রিকেট ভক্তদের চোখ দিয়ে ঝরে পড়ছে কান্নার অজস্র ফোঁটা। আর বিধাতা হাসছেন। তাঁর মনে পড়ছে অজস্র স্মৃতি। তাঁর গর্ব হচ্ছে নিজের নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের উপর। চোখের সামনে ভাসছে তাঁর শ্রেষ্ঠ রত্নের অসংখ্য কীর্তিকলাপ।

ওয়ানডে, টেস্ট – দু ক্ষেত্রেই দ্রুততম সেঞ্চুরির দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে। মনে পড়ছে ক্রিজ আঁকড়ে পড়ে থেকে সেই ৩৩ রানের কথা। ক্রিকেটের উভয় ফর্ম্যাটেই পঞ্চাশের অধিক গড় নিয়ে ক্রিজকে বিদায় জানাচ্ছে তাঁর সন্তান। এই ভেবেই তার সারা গায়ে কী যেন একটা বয়ে যাচ্ছে। যেন বিষাদে ডোবা শান্তির এক অদ্ভুত অনুভূতি বয়ে বেড়াচ্ছে তাঁর গোটা শরীরে। তাঁর কষ্ট হচ্ছে। ফেটে যাচ্ছে বুক। ব্যাটিং, ফিল্ডিং,ক্যাপ্টেন্সি, কিপিং এবং বোলিং। ক্রিকেটের প্রতিটা ক্ষেত্রে সে  তার ঝুলি উজার করে দিয়েছে ক্রিকেটদেবতার উদ্দেশে। ভরিয়ে দিয়েছে তাঁর রত্নের ভান্ডার। নিজের প্রতিভাকে হাতিয়ার বানিয়ে কোটি,কোটি মানুষকে দিয়েছে আনন্দের অসীম অনুভূতি। নিজের আবিষ্কৃত বিভিন্ন শটের দ্বারা লিখেছে বিনোদনের এক অপরূপ রূপকথা। তৈরি করেছে এক সোনায় মোড়া স্মৃতিসৌধ। যেখান থেকে সে বিদায় নিচ্ছে আজ। তবে খালি হাতে। কিছুই সে চায়নি। তার বদলে শুধু দিয়ে গিয়েছে। আর আজ সেই চলে যাচ্ছে তার বিচরণভূমি ছেড়ে, চিরকালের জন্য।

সেই দৃশ্য দেখছেন তিনি। দেখছেন আর কাঁদছেন। নিজের দেওয়া সেই ডাকের জন্য যেমন তার গর্ব হচ্ছে ঠিক তেমনই নিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তানকে খালি হাতে বিদায় দিতে ফেটে যাচ্ছে ক্রিকেটদেবতার বুক। তার কোনও চেষ্টার মর্মই তিনি দেননি। বার বার খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন তাকে। আর বদলে তার থেকে চেয়ে নিয়েছেন অসামান্য কিছু ইনিংস। মনমাতানো কিছু ক্যাচ। বাড়িয়ে নিয়েছেন নিজের শৌর্য। স্বার্থপরতার মায়াজালে ডুবে নিজের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ঠেলে দিয়েছেন এক গভীর গিরিখাতে। যেখানে তার গায়ে লেগেছে চোকার তকমা। তাই আজ কাঁদছেন ক্রিকেট ঈশ্বর। নিজের সন্তানকে এভাবে চলে যেতে দেখে চোখ দিয়ে ঝরে যাচ্ছে জল।

ঠিক তখনই,  দূরে আকাশে  সন্ধে নামছে। সমস্ত ক্রিকেটভক্ত মুছে নিচ্ছে তাঁদের চোখ আর সবাইকে ছেড়ে এক বিরাট  অসীম দিগন্তের দিকে পা বাড়াচ্ছেন তিনি। শেষবারের মতো ব্যাট কাঁধে নিয়ে ক্রিজ পার করে বেরিয়ে যাচ্ছেন স্টেডিয়াম ছেড়ে, ক্রিকেটদেবতাকে চিরকালের জন্য ঋণী করে, যে ঋণ হয়তো তিনি কোনওদিন শোধ করতে পারবেন না।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.