পোস্টার-টাকা চেয়ে হুমকি-এমনকি গুলির অভিযোগও, ফের মাওবাদীদের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে জঙ্গলমহল

স্বাধীনতা দিবসের সকালে কালা দিবস পালনের ডাক দিয়ে পোস্টার পড়েছিল বাঁকাশোল গ্রামে। খুব সম্প্রতি দাবি মতো টাকা না দেওয়ায় বেলপাহাড়ির এক বাসিন্দাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে। আবারও কি ফিরছে আতঙ্কের দিন? প্রশ্ন ঘুরছে জঙ্গলমহলে।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আবারও কি ফিরছে আতঙ্কের দিন? জঙ্গলমহলের ইতিউতি কান পাতলে এখন শোনা যাচ্ছে এই প্রশ্নটাই। রাতের অন্ধকারে মাঝেমধ্যেই ঘুম ভাঙছে অচেনা পায়ের শব্দে। পোস্টারে হুমকির স্মৃতিও ফিরছে জঙ্গল লাগোয়া ঝাড়গ্রামের একাধিক গ্রামে। এমনকি সংগঠন মজবুত করতে টাকা তোলার চেষ্টাও শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।

খুব সম্প্রতি দাবি মতো টাকা না দেওয়ায় বেলপাহাড়ির এক বাসিন্দাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতের অন্ধকারে বাঁশপাহাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের পচাপানি গ্রামে একটি গ্যাস এজেন্সির মালিক বিদ্যুত দাসকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় তারা। প্রাণে বাঁচতে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন তিনি। এতে পা ভাঙে ওই ব্যবসায়ীর। বান্দোয়ান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। ঝাড়গ্রাম জেলা পুলিশ অবশ্য এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটেছে।

জানা গেছে, জুলাই মাসের ২৭ তারিখ বিদ্যুতের বাড়িতে মাওবাদী নেতা মদন মাহাতোর সই করা একটা চিঠি এসেছিল। সেই চিঠিতে দু’লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল তাঁর কাছ থেকে। ২৯ জুলাই পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল টাকা দেওয়ার জন্য। টাকা না দেওয়ায় একমাসের মাথায় তাঁর বাড়িতে হামলা চালানো হয় বলে মনে করছেন এলাকার মানুষ। তাই গুলির শব্দ শুনেও ভয়ে বাইরে আসেননি পড়শিদের কেউ।

স্বাধীনতা দিবসের সকালে বেলপাহাড়ি ব্লকের ভুলাভেদা গ্রাম পঞ্চায়েতের ভুলাভেদা থেকে বাঁশপাহাড়ি যাওয়া পথে ঝাড়গ্রাম পুরুলিয়া পাঁচ নম্বর রাজ্য সড়কের উপর বাঁকশোল, শালতল নামে দু’টি গ্রামে কালা দিবস পালনের আর্জি জানিয়ে মাওবাদীদের নাম নামাঙ্কিত পোস্টার পড়ে। ঘুম ভাঙতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এলাকার মানুষ। খবর পেয়ে পোস্টারগুলি নিয়ে যায় বেলপাহাড়ি থানার পুলিশ। এই ঘটনায় ঝাড়গ্রামের পুলিশ সুপার অমিত কুমার ভরত রাঠোর মাওবাদীদের নাম না করেই জানিয়ে ছিলেন, এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাঁদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই একসময় মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে ভিত নড়ে যায় সংগঠনের। গত কয়েক বছরে তাঁদের কার্যকলাপ আস্তে আস্তে স্মৃতি হতে থাকে জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে। কিষানজীর মৃত্যুর পর প্রথম সারিতে থাকা মাওবাদী নেতৃত্বের অনেকেই ধরা পড়ে যান। বাকিরাও সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর থেকে ন’মাসে-ছ’মাসে হঠাৎ করে কোথাও দুয়েকবার পোস্টার উদ্ধার হলেও, মাওবাদী কার্যকলাপের তেমন কোনও ঘটনা আর সামনে আসেনি। কারণ এলাকার উন্নয়নে সরিক হয়েছেন তাঁদের অনেকেই।

কিন্তু এত বছর পরে আবার যেন সিঁদূরে মেঘ। বেলপাহাড়ির বিভিন্ন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাওবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পুলিশের কাছে যাঁদের সম্পর্কে তেমন কোনও তথ্য ছিল না, তাঁরাই এখন নতুন করে  সংগঠনের ভিত শক্ত করার চেষ্টা শুরু করেছেন। তাঁরা যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন গ্রামের মানুষের সঙ্গে।

পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলেও তাঁদের আনাগোনা বাড়ছে বলে টের পাচ্ছেন বাসিন্দারা। সংগঠনের সক্রিয় মেম্বাররা দু-একজন করে গ্রামে আসছেন। মাওবাদীদের নিয়ে নরম মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে তৈরি হচ্ছে আন্দোলনের রূপরেখা। এখন আন্দোলনের থেকে অনেক দূরে। কিন্তু একসময়ের স্কোয়াড লিডার প্রশান্ত মাহাতো উপর দায়িত্ব ছিল বিনপুর থেকে মধুপুরের। তাঁর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার অনেক উন্নয়ন করেছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, ক’টা যুবকের সরকারি চাকরি হয়েছে? দু টাকা কিলো চাল দিলেই কি সাধারণ মানুষের পেট ভরে যাবে? তিনি বলেন, ‘‘বিনপুরের পাটাঝড়িয়া,নেড়ে,আঁধারনয়ন এই আদিবাসী গ্রামগুলিতে প্রতিটি পরিবারে মিনিমাম একজন গ্র্যাজুয়েট ছেলে আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা ছেলেও সিভিকের চাকরি পর্যন্ত পায়নি। এটা কি উন্নয়ন?’’

তাঁর অভিযোগ সব জায়গাতেই রাজনীতি চলছে। প্রাক্তন মাওবাদীদের নিয়েও তিনি সরব। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা বর্তমান সরকারের সাথে সহমত পোষণ করছে, তাঁরাই সরকারি সুযোগসুবিধা পাচ্ছে। যাঁরা করছে না তাঁদের কাছে কোনও সুযোগ সুবিধা পৌঁছাচ্ছে না।’’

বাছবিচার করে উন্নয়নের এই অভিযোগ গ্রামবাসীদের সর্বস্তরে। আর সেটাই মাওবাদীদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করছে বলে মনে করছেন বাঁকুড়ার বারিকুল, খাতড়া, রানিবাঁধের মতো একদা মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকার মানুষজনও। নাম প্রকাশ করে সামনে আসতে চাইছেন না কেউ। কিন্তু তাঁদের অনেকেই বলছেন, উন্নয়ন যে অনেক হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু পাশাপাশি গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে স্বজনপোষণ-দুর্নীতির ভুরিভুরি অভিযোগ। মানুষের এই ক্ষোভটাকে কাজে লাগিয়েই ফের হারানো জমি ফেরতের চেষ্টা চলছে। এরজন্য এখন মহিলা স্কোয়াডের উপরেই বেশি ভরসা রেখেছেন মাওবাদী নেতৃত্ব। গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে কথা বলে অভাব অভিযোগ শুনে নিতে রাতের অন্ধকারেও তাই অচেনা পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে মাঝেমধ্যেই। যদিও পুলিশ এখনই এ ব্যাপারে মুখ খুলতে নারাজ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More