বোলপুর বলে, ‘ভগবানের দরজা সব সময়ে খোলা থাকে’, পদ্মশ্রী পেলেন ১ টাকার ডাক্তার

দ্য ওয়াল ব্যুরো, বীরভূম: ডায়লিসিস হয়েছিল শনিবার। তাই শুয়ে পড়েছিলেন একটু তাড়াতাড়ি। হঠাৎই ফোন এসেছিল ভারত সরকারের তরফে। টেলিফোনের ও প্রান্তে তখন পদ্মশ্রী প্রাপ্তির খবর দিয়ে ধন্যবাদ জানানো হচ্ছে তাঁকে। উত্তরে কী বলবেন ভেবে পাননি।

সেখানে ছাড় পেলেও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে ছাড় পাননি। ডাক্তারবাবুর পদ্মশ্রী প্রাপ্তির খবর ছড়াতেই সংবাদমাধ্যমের অনেকেই ওই রাতেই চলে আসেন তাঁর বাড়িতে। তাঁদের প্রশ্নের সামনে তখন কিছুটা ধাতস্ত।  বলেন, “আমি এতটা আশা কোনও দিন করিনি। সরকারের তরফে ফোনে জেনেছি। তারপর প্রণববাবু আমাকে ফোন করেছিলেন। আমি অভিভূত, আর কী বলব? এক টাকায় রোগী দেখি। এইটুকুই তো করেছি।”

“চিকিৎসক কে? একজন বিপন্ন মানুষের হাত যিনি ধরেন, তিনিই তো চিকিৎসক। সেই হাত ছাড়ানো যায় না কখনই।” এটাই আদর্শ ডঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর সেই আদর্শের ভরসাতেই প্রতিদিন ভিড় জমে বোলপুরের হরগৌরীতলায় তাঁর হলুদ রঙের দোতলা বাড়িটার সামনে। যখনই যাওয়া যায় তখনই অগুনতি মানুষের ভিড় সেখানে। সবাই একটাই কথা বলেন, “ভগবানের দরজা কখনও বন্ধ থাকে না। সবাই ফিরিয়ে দিলেও এখান থেকে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরতে হয় না কখনই।”

রোগী দেখে সুশোভনবাবু ফিস নেন এক টাকা। গত পাঁচ দশকেও যা কখনও বাড়েনি। কখনও কি মনে হয়নি সামান্য কিছু হলেও বাড়ানো দরকার?

সুশোভনবাবুর উত্তর, “যখন দেখি গরীব মানুষেরা গামছা পেতে বসে মুড়ি খাচ্ছে, তখন এর থেকে বেশি টাকা নেওয়ার কথা ভাবতে পারি না।”

যখন এনআরএসের ডাক্তারদের উপর হামলার ঘটনায় প্রতিবাদে উত্তাল গোটা রাজ্য, পরিষেবা বন্ধ রাজ্যের সরকারি-বেসরকারি সমস্ত সরকারি হাসপাতালে, তখনও এলাকার মানুষদের স্বচ্ছন্দ্য যাতায়াত ছিল হরগৌরীতলার হলুদ বাড়িতে। চিকিৎসকের উপর আক্রমণে প্রতিবাদ জানাতে সহকর্মীদের সঙ্গে মিছিলে হেঁটেছেন। কিন্তু চিকিৎসাও চালিয়েছেন সমানে। বারবার বলেছেন, “প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসকের হাত ধরেন বিপন্ন মানুষ। তাই পরিষেবা বন্ধ করে প্রতিবাদ নয়। পাশাপাশি এটাও বুঝতে হবে, একজন চিকিৎসক সবসময় চেষ্টা করেন রোগীকে বাঁচাতে। কোনও সময় পারেন, কোনও সময় পারেন না। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলা গর্হিত কাজ।”

তিনপুরুষ ধরে বোলপুরে সুশোভনবাবুদের বাস। বাবা বিনয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন গোয়েন্দা দফতরের কর্মী। মা মণিমালা বন্দ্যোপাধ্যায় গৃহবধূ। সুশোভনবাবুর স্ত্রী ছায়া বন্দ্যোপাধ্যায়ও ব্যস্ত থাকতেন সংসার নিয়ে। তাঁদের মেয়ে জামাই দুজনেই চিকিৎসক। ১৯৬২ সালে সুশোভনবাবু এমবিবিএস পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৬৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হেমাটোলজি নিয়ে ডিএসসি (গোল্ড মেডেলিস্ট) করেন। কেরিয়ারের গোড়ায় শেফিল্ডের সিনিয়র রেজিস্ট্রার এবং সিনিয়র ইনচার্জ ছিলেন তিনি। তখন বার্ষিক বেতন ছিল ১৬ হাজার পাউণ্ড। ১৯৭৮ সালে তাক লাগানো সেই চাকরি ছেড়ে বিশ্বভারতীতে যোগদান করেন ডেপুটি চিফ মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে। সেটাও এক সময় ছেড়ে দিয়ে গ্রামের অসহায় মানুষের জন্য চেম্বার খুলে বসেন। নিজের বাড়িতে।এখন বয়স হয়েছে। শরীরও অসুস্থ। তাও প্রতিদিন নিয়মমাফিক রোগী দেখেন।

প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে রাজনীতিতে এসেছিলেন। তিন থেকে চার বার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ১৯৮৩ সালে জয়ী হন। একসময়ে জাতীয় কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক ও সভাপতি হন। এআইসিসির সদস্যও হন। ১৯৮৩ সালে জ্ঞানী জৈল সিং, তারপর ক্রমান্বয়ে, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, প্রতিভা পাটিল, প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বভারতীতে দায়িত্বের সাথে কার্যভার সামলান। আব্রাহাম লিঙ্কনের এক বিশেষ উক্তি তাঁর জীবনদর্শন। আর তা হল, “এই জগৎ অনেক কষ্ট পায়। তা খারাপ লোকেদের হিংসার জন্য নয়। ভালো মানুষের নীরবতার জন্য।”

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More