পাক গোলায় শহিদ হলেন তেহট্টের যুবক, দীপাবলিতে অন্ধকার ঘোষবাড়ি

পাক সেনার সংঘর্ষবিরতি লঙ্ঘনে রক্ত ঝড়ছে দাওয়ার, উরি, কেরাম সেক্টরে। শহিদ হয়েছেন চারজন ভারতীয় জওয়ান। তাঁদেরই একজন তেহট্টের বাসিন্দা সুবোধ ঘোষ।

দ্য ওয়াল ব্যুরো, নদিয়া: দীপাবলির রাতে বাড়ির দালানে জ্বলবে না প্রদীপ। তার আগেই যে তেহট্টের সুবোধ ঘোষের বাড়িতে নেমে এসেছে গাঢ় অন্ধকার। শুক্রবার দুপুরে পাক গোলায় শহিদ হয়েছেন ভারতীয় জওয়ান সুবোধ (২৫)। সে খবর এসে পৌঁছনোর পর থেকেই কান্নার রোল উঠেছে ঘোষবাড়িতে।

স্ত্রীকে কথা দিয়েছিলেন ডিসেম্বরে বাড়ি আসবেন। তাই অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন তিনি। কথা রাখা হল না সুবোধের। তার আগেই পাকিস্তানের দিক থেকে ছুটে আসা গোলা প্রাণ কাড়ল তাঁর।

পাক সেনার সংঘর্ষবিরতি লঙ্ঘনে রক্ত ঝড়ছে দাওয়ার, উরি, কেরাম সেক্টরে। শহিদ হয়েছেন চারজন ভারতীয় জওয়ান। তাঁদেরই একজন তেহট্টের বাসিন্দা সুবোধ ঘোষ। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফ থেকে শুক্রবার বিকেলেই সেই খবর জানানো হয় তাঁর পরিবারকে। আকস্মিক এ ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না কেউ। তিনমাসের কন্যা সুরভিকে কোলে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন সুবোধের স্ত্রী অনিন্দিতা। মেয়ের সঙ্গে বাবার আর দেখাই হল না যে।

খুব মেধাবী না হলেও ছোট থেকে পড়াশোনায় ভালই ছিলেন সুবোধ। নিজের যোগ্যতায় বেশ কম বয়সেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সুবোধের পরিবার সূত্রে খবর, গত চার বছর ধরেই সেনাবাহিনীতে ছিলেন। বছর তিনেক আগে বিয়ে করেন। জুলাই মাসে শেষবার মাত্র ৪০ দিনের ছুটিতে বাড়িতে ফিরেছিলেন । তবে  করোনা আতঙ্কে কোয়ারেন্টাইনেই থাকতে হয়েছিল বেশিরভাগ দিন। ছুটি বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন সেই সময়। কিন্তু পাননি। তাই বাধ্য হয়ে দায়িত্ব পালন করতে চলে গিয়েছিলেন কাজের জগতে।

পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হয়নি জুলাই মাসে। তাই পরিজনদের কথা দিয়েছিলেন আবারও ডিসেম্বরে রঘুনাথপুর গ্রামের বাড়িতে ফিরবেন। তবে প্রতিশ্রুতিপূরণ করা হল না। কাজের চাপ থাকলেও প্রতিদিনই বাড়িতে ফোন করতেন সুবোধ। দিনকয়েক মেয়ের শরীর ভাল যাচ্ছে না। তাই ইদানীং একটু বেশিই ফোন করছিলেন। তবে শুক্রবার সারাদিনে যোগাযোগ হয়নি একবারও। মা এবং স্ত্রী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ফোনে পাননি।

সুবোধের মা বাসন্তী ঘোষ বলেন, ‘‘সারা দিন ওর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে পারিনি। শুক্রবার বিকেলে একটা ফোন আসে। অপরিচিত গলায় একজন জানান সুবোধ আর নেই। পাকিস্তানের দিক থেকে ধেয়ে আসা গুলিতে আমার ছেলে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছে।’’

স্বামীর মৃত্যু সংবাদ এখনও সত্যি বলে মানতে পারছেন না সুবোধের স্ত্রী অনিন্দিতা। তিনি বলেন, ‘‘বৃহস্পতিবার মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। আমার স্বামী বারবার ফোন করে খোঁজ নিয়েছে। কিন্ত শুক্রবার সকাল থেকে আর ফোন না আসায় আমি এবং আমার শাশুড়ি বারবার ওঁকে ফোন করি। কিন্তু ফোন সুইচড অফ বলছিল। বিকেল নাগাদ কাশ্মীর থেকে আসা ফোনে আমরা ওঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারি।’’

রঘুনাথপুর গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই ভালবাসতেন সুবোধকে। ঘরের ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর খবর জানতেই প্রতিবেশীদের ভিড় ভেঙে পড়েছে ঘোষ বাড়িতে। এখন সুবোধের কফিনবন্দি নিথর দেহ আসার প্রতীক্ষায় রয়েছে গোটা গ্রাম। বাঁধা হয়েছে মঞ্চ। জাতীয় পতাকায় মুড়ে ফেলা হয়েছে প্রায় গোটা গ্রাম। শোক-শ্রদ্ধা-গৌরব সব মিলেমিশে একাকার তেহট্টের রঘুনাথপুর গ্রামে।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More