উত্তরাখণ্ড সরকার ঘোষণা করলেও ছেলেদের ‘মৃত’ বলে মানতে নারাজ পরিবার

আড়শার বাগানডিতে একেবারে পাশাপাশি এই দুই পরিবারের বাস। সামান্য চাষবাস আর দিনমজুরির অর্থে কোনও ভাবে সংসার চলে। পেটের টানে উত্তরাখণ্ডে ঠিকাদার সংস্থার অধীনে ঋষিগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন এই দুই যুবক। উত্তরাখণ্ডের হিমবাহ ধসের জলস্রোত এই পাহাড়ের হড়পা বানের চেয়েও যে ভয়ঙ্কর তা জানা ছিল না ওই দুই পরিবারের।

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পুরুলিয়া: মেলেনি ডেথ সার্টিফিকেট। তাই উত্তরাখণ্ডে হিমবাহ ধসে নিখোঁজ দুই পরিযায়ী শ্রমিককে মৃত বলে মানতে নারাজ তাঁদের পরিবার।

বাড়ি থেকেই দেখা যায় অযোধ্যা পাহাড়ের লম্বা রেঞ্জ। সেই পাহাড় বেয়েও নেমে আসে হড়পা বান। এই বানের ভয়াবহতাও বিলক্ষণ জানেন আড়শার বাগানডির বাসিন্দা শুভঙ্কর ও অশ্বিনীর পরিবার। সপ্তাহ তিনেক আগে উত্তরাখণ্ডের চামোলির তপোবনে হিমবাহ ধসের পর থেকে নিখোঁজ শুভঙ্কর তন্তুবায় ও অশ্বিনী তন্তুবায়। তপোবনের ঋষিগঙ্গা  জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতে গিয়েছিলেন বাংলার পাঁচ শ্রমিক। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন এই দুজন।

নিখোঁজ পাঁচ শ্রমিককেই উত্তরাখণ্ড সরকার ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু বাগানডির ওই দুই পরিবার তা মানতে নারাজ। কারণ এই নিখোঁজ শ্রমিকদের ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করলেও ডেথ সার্টিফিকেট তো দূর অস্ত, কিছুই জানানো হয়নি বলে দাবি এই শ্রমিক পরিবার দুটির। কোনও খবর আসেনি রাজ্য সরকার তথা পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের তরফেও। ফলে অথৈজলে দুই পরিবার। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, কীভাবে পারলৌকিক ক্রিয়া করবেন সেটাও বুঝতে পারছেন না। ঘরের ছেলেদের ছবি নিয়ে বসে আছে ওই দুই পরিবার। তাদের বিশ্বাস, ছেলে ঘরে ফিরবেই। সেই আশায় চোখের জল মুছে যাচ্ছেন শুভঙ্কর ও অশ্বিনীর বৃদ্ধ বাবা-মা।

সরকারের বিধিতেই রয়েছে, নিখোঁজ হওয়ার সাত বছর পর কোনও হদিস না মিললে তবেই মৃত বলে ঘোষণা করা যায়। কিন্তু উত্তরাখণ্ড সরকার চামোলির ঘটনাকে ‘ব্যতিক্রমী’ বলে ১৯৬৯ সালের জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্তকরণের আইনের উল্লেখ করে তাদের ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করে। তবে এসব আইন-বিধির কথা জানে না ওই দুই পরিবার। শুভঙ্কর তন্তুবায়ের দাদা রবীন্দ্রনাথ তন্তুবায় বলেন, “এভাবে মৃত ঘোষণা করে দিলেই হবে? আমাদের তো কোনও কিছুই জানানো হয়নি। হাতে পাইনি মৃত ঘোষণা করা বিজ্ঞপ্তিও। মারা গেছে এটা কোনওভাবেই মেনে নিতে পারব না। মৃত ঘোষণা করেছে কিন্তু ডেথ সার্টিফিকেট কোথায়?”

মুখ দিয়ে কথা সরছে না শুভঙ্করের বৃদ্ধ বাবা ভজহরি তন্তুবায়ের। বাকরুদ্ধ মা ভারতীদেবীর চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে যাচ্ছে। একই ছবি অশ্বিনী তন্তুবায় বাড়িতেও।

আড়শার বাগানডিতে একেবারে পাশাপাশি এই দুই পরিবারের বাস। সামান্য চাষবাস আর দিনমজুরির অর্থে কোনও ভাবে সংসার চলে। পেটের টানে উত্তরাখণ্ডে ঠিকাদার সংস্থার অধীনে ঋষিগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন এই দুই যুবক। উত্তরাখণ্ডের হিমবাহ ধসের জলস্রোত এই পাহাড়ের হড়পা বানের চেয়েও যে ভয়ঙ্কর তা জানা ছিল না ওই দুই পরিবারের। শোক আর উদ্বেগ মিলেমিশে গেছে দুই পরিবারে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, “কোথা থেকে কি হয়ে গেল। ছেলেগুলোকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। এখন ‘মৃত’ বলে দিল। কিছুতেই আমরা মেনে নেব না।”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More