চারু মজুমদারদের সেই নকশালবাড়ি এখন গেরুয়া গড়, বিপ্লবের ধ্বনি বদলেছে জয় শ্রীরামে

দ্য ওয়াল ব্যুরো, শিলিগুড়ি: চোখ কান সজাগ ছিল তখন। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই ছিল ফসলের খেত। বাঁশঝাড়। ‘লাঙল যার জমি তার’ স্লোগানে যখন তখন মুখরিত হত দিন বা রাত। এখন বদলে গেছে জীবন। অশীতিপর ক্ষয়িষ্ণু দৃষ্টিতে তার কিছুটা নজরে আসে, বাকিটা থেকে যায় আড়ালে। তবে অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পারেন রং বদল। খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে করতে গড়িয়ে যায় আরও একটা করে বছর। আরও বৃদ্ধ হন বেঙ্গাই জোতের পবন সিং।

১৯৬৭ সালের ২৫ মে। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে এই বেঙ্গাই জোত গ্রামেই জড়ো হয়েছিলেন ভূমিহীন কৃষকেরা। তির-ধনুক, বর্শা, দা, কাটারি নিয়ে জোতদারদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধ। আন্দোলনকারীদের তিরের ঘায়ে নিহত হয়েছিলেন নকশালবাড়ি থানার ইন্সপেক্টর তেনজিং ওয়াংদি। তারপরেই নকশালবাড়ি থানা থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে বেঙ্গাই জোত গ্রামে পুলিশের অতর্কিত হামলা। শহিদ হয়েছিলেন দুই শিশু-সহ ১১ জন। ভারত নেপাল সীমান্তঘেঁষা এই গ্রামে বাতারিয়া নদীর পাশে সেই শহিদদের স্মরণে গড়া হয় স্মৃতিসৌধ।

এই স্মৃতিস্তম্ভের সামনেই সেদিনের শহিদ হওয়া ধনেশ্বরী দেবীর বাসভবন। তিনি আর তাঁর স্বামী প্রহ্লাদ সিং,  চারু মজুমদার আর কানু সান্যালের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নকশাল আন্দোলনে। তাঁদের সন্তান পবন তখন যুবক। মা বাবার আদর্শই তাঁর আদর্শ। শহিদ হয়েছিলেন ধনেশ্বরী। পিতা-পুত্রকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। তারপর অকথ্য নির্যাতন। বলছিলেন, “মা-বাবার আদর্শ আঁকড়ে ধরে এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু এখন কোনও সংগঠন নেই। যাঁরা ছিলেন তাঁরা সব নানা দলে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই চারু মজুমদারের শিষ্যের পরিচয় দিয়েই সংগ্রাম ও আন্দোলনের পথ ছেড়ে সুবিধাভোগ করতে ব্যস্ত।”

গত ৫০ বছরে বাতারিয়া নদী দিয়ে বয়ে গেছে কত জল। নকশাল আন্দোলনের পীঠস্থান সেই বেঙ্গাই জোত গ্রামও আজ বদলে গেছে অনেকখানি। যে রাস্তার উপর একদিন আন্দোলনকারীদের নিথর দেহগুলি পড়েছিল, সেই রাস্তার দু’ধারেই এখন তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল পাকা বাড়ি। গত কিছু বছরে বাংলাদেশ, নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে এই এলাকার কৃষি জমিগুলিতে বসতি স্থাপন করেছেন অনেকেই।

নকশাল আন্দোলনের পরবর্তীতে দীর্ঘদিন এলাকার বিধানসভা কেন্দ্র, স্থানীয় ত্রিস্তর পঞ্চায়েত প্রশাসনে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রেখেছিল সিপিএম ও কিছু ক্ষেত্রে কংগ্রেস। কিন্তু ঊনিশের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস, সিপিএম, ঘাস ফুলকে টেক্কা দিয়ে এখানেও ফুটেছে পদ্মফুল। সিপিএমের বহু নেতা ও কর্মী এখন বিজেপিতে। ফলে নকশালবাড়ির মাটি এখন অনেকটাই বিজেপির দখলে। সপ্তাহ দুয়েক আগে দার্জিলিং জেলার সাংসদ রাজু বিস্ত বেঙ্গাই জোতে জনসভা করেন। এই জনসভায় সিপিএমের পঞ্চায়েত সদস্য, উপপ্রধান সহ অনেকেই যোগ দেন গেরুয়া শিবিরে।

রাজ্যের শাসক দল এই এলাকায় তেমন কোনও প্রভাব ফেলতে না পারলেও ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে নকশালবাড়ি, মণিরাম অঞ্চলে বিজেপির ভোট ছিল ৮২০৬, তৃণমূল কংগ্রেসের ১৩,৩৯৮, সিপিএম কংগ্রেস জোট ১৪,২৫০। ২০১৯ সালে নকশালবাড়ি ব্লকের এই দুটি অঞ্চলে বিজেপির ভোট হয় ২৩,৯৫৩। মাত্র তিন বছরের নকশাল আন্দোলনের ধাত্রীভূমিতে পদ্মফুলের রমরমা।

স্থানীয় কৃষক উরেন বর্মন বললেন, “যে জমির জন্য আন্দোলন সেই জমিরই এখন আকাশছোঁয়া দাম। বহিরাগতদের অনুপ্রবেশে এলাকায় জমির দাম বেড়েই চলেছে। আমার বর্তমানে ভিটেটুকু ছাড়া আর কিছু নেই। অন্যের জমিতে বিঘাপ্রতি পাঁচ মণ ধান দিয়ে চাষাবাদ করছি। কৃষকদের নানা সুবিধা দেয় সরকার শুনেছি। কিন্তু আমাদের নিজের জমিই তো নেই। তাই কোনও রকম সুবিধা পাইনি।”

শহিদবেদী লাগোয়া বেঙ্গাইজোত প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানকার প্রধান শিক্ষক নৃপেন বর্মন বললেন, “প্রতিবছর ২৫ মে এখানে অনুষ্ঠান হয়। স্মরণ করা হয় এই বীর শহিদদের। মিছিলও হয়। কিন্তু এখন আর সেই মিছিলে লোক দেখা যায় না। সৌধগুলির চারিদিক আগাছা, প্লাস্টিক দিয়ে ভর্তি। এখনও দেশ বিদেশ থেকে বহু মানুষ আসেন। কাউকে না পেলে আমার সঙ্গে কথা বলেই নানা কথা জানতে চান।”

বিপ্লবেব সেই ধাত্রীভূমিতেই এখন গেরুয়া রাজনীতির আঁতুরঘর।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More