দু’পায়ের ভরসাতেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই গলসির আমিনার, এল জয়ও

দুই হাত নেই তো কী হয়েছে, পা দিয়েই লেখা, স্নান করা, খাওয়া, স্কুলের ড্রেস পড়া, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, সব কাজই করতে অভ্যস্ত আমিনা। মাধ্যমিকে আমিনার প্রাপ্ত নম্বর ৫২১। বাংলাতে ৮৭, ইংরাজিতে ৮০, অঙ্গে ৬২, ভৌত বিজ্ঞানে ৭৩, জীবন বিজ্ঞানে ৭৫, ইতিহাসে ৭৩ আর ভুগোলে ৭১।

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: জন্ম থেকেই হাত নেই। দু’পায়ের ভরসাতেই তাই শুরু হয়েছিল লড়াইটা। প্রথম ল্যাপটা সাফল্যের সঙ্গে পার করতে পেরে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল অনেকখানি। ৫২১ নম্বর পেয়ে এবছর মাধ্যমিক পাশ করেছে গলসি থানার পুরসা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী আমিনা খাতুন। দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে হয় অনেককেই। আমিনাকেও হয়েছে। সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে পার হতে হচ্ছে শারীরিক বাধা। আমিনার জেদ, ভবিষ্যতে স্কুল শিক্ষিকা হবে সে।

বাড়ির মেজো মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না আমিনার মা-বাবারও। খুব কাছ থেকে দেখছেন ছোট্ট মেয়েটির লড়াই। তবু দুটো হাত নেই যে! এই ভাবনাটা তাড়িয়ে বেড়ায় তাঁদের। আমিনার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর এখন মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন তার বাবা আল্লারাখা মল্লিক ও মা বিলকিস বেগমও। মেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করে উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে কলেজে যাবে। কয়েকদিন আগেও এমনটা ভাবতে পারতেন না তাঁরা। নিজের সামান্য জমিতে চাষ করে কোনও মতে সংসারের জন্য দু’মুঠো আনেন আল্লারাখা মল্লিক। তিনি বলেন, “আমাদের পরিবার খুব গরিব। তাই আমিনাকে নিয়ে চিন্তাই রয়েছি। তবে ওর চেষ্টা দেখে আমাদের অনেক কষ্ট দূর হয়েছে। এখন ওর স্বপ্ন পূরণ হক এটাই আমাদের কামনা।’’

দুই হাত নেই তো কী হয়েছে, পা দিয়েই লেখা, স্নান করা, খাওয়া, স্কুলের ড্রেস পড়া, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, সব কাজই করতে অভ্যস্ত আমিনা। আমিনার বাবা-মা জানান, ওর যখন ৫-৬ বছর বয়স, তখন থেকেই নিজের ইচ্ছেতে পা দিয়ে শ্লেটে লিখতে চেষ্টা করত আমিনা। পড়াশোনায় তার উৎসাহ দেখে বছর দুয়েক পর আমিনাকে গ্রামেরই প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন আল্লারাখা। চতুর্থ শ্রেণিতে পাশ করার পরে ভর্তি করে দেন পুরসা উচ্চ বিদ্যালয়ে।

পা দিয়ে লেখে বলে, পঞ্চম শ্রেণি থেকে ক্লাস রুমে মেঝেতে তার বসার ব্যবস্থা করেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে আমিনা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে রাইটার নিয়ে। মাধ্যমিকে আমিনার প্রাপ্ত নম্বর ৫২১। বাংলাতে ৮৭, ইংরাজিতে ৮০, অঙ্গে ৬২, ভৌত বিজ্ঞানে ৭৩, জীবন বিজ্ঞানে ৭৫, ইতিহাসে ৭৩ আর ভুগোলে ৭১।  স্কুলের প্রধান শিক্ষক শুভাশিস চন্দ্র বলেন, পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ছাত্রী আমিনা। দরিদ্র পরিবার। তার উপর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। সব জয় করেই এগিয়ে যাচ্ছে ও। ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা রইল।’’

স্বভাবে লাজুক আমিনার এমন সাফল্যে চমকে গিয়েছেন তার প্রতিবেশীরাও। সবারই কামনা, সত্যিই নিজের পায়ে দাঁড়াক ও। আর আমি‌না বলছে, ‘‘পড়াশোনা করতে আমার খুব ভালো লাগে। স্কুলের স্যারেরা, দিদিমনিরা আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। না হলে কিছুই করতে পারতাম না আমি। বড় হয়ে আমিও চাই স্কুলের শিক্ষিকা হতে।”

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More