দুর্গা আরাধনার শহরে মূলনিবাসীরা মেতেছেন অসুর বন্দনায়

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: উমার বোধনে কলকাতা সহ গোটা বাংলা যখন মহিষমর্দিনীর উপাসনায় ব্যস্ত, তখন রাজ্যের কোথাও কোথাও এমনকি খাস কলকাতা শহরে মহিষাসুরের উপাসনা হচ্ছে। অসুরদলনী দেবী দুর্গা নয়, এই আদিবাসী গোষ্ঠীর আরাধ্য দেবতা অসুর (Hudur Durga)। ঢাকের বোলে আগমনীর সুরে মেতে ওঠে না এই আদিবাসি সমাজ, বরং মহিষাসুরের দলনে বিষাদে ভারাক্রান্ত হয় তাঁদের মন। প্রথাগত চিন্তাধারার বাইরে, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরেই এক অন্য আন্দোলনের সুর ধ্বনিত হয় এই সমাজে।

কলকাতার একেবারে পূর্ব প্রান্তে লেদার কমপ্লেক্স থানা সংলগ্ন এলাকায় টংপাড়া, হাঁড়িপোঁতা, ভাঙরখাল এই সমস্ত এলাকায় বহু বছর ধরে সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁরাও ইত্যাদি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর লোকজন বসবাস করেন। তাঁদের আরাধ্য দেবতার নাম ‘হুদুড় দুর্গা’। ‘হুঁদুড়’ কথার অর্থ ‘বজ্রের মতো তেজ বা শক্তি যার।’ আর দুর্গার অর্থ? ‘দুর্গ রক্ষা করেন যিনি’। এই আদিবাসী সমাজের কাছে ‘হুঁদুর দুর্গা’ আর কেউ নন, মহিষাসুর। তাঁদের কাছে দেবী দুর্গাই হলেন খলনায়িকা। তাঁরা মনে করেন, অমিত পরিক্রমশালী অসুর বাহিনীকে যখন দেবতারা সম্মুখ সমরে পরাস্ত করতে পারলেন না, তখন ছলনার আশ্রয়ে মহিষাসুরকে বধ করা হয়। তিনিই প্রকৃত বীর।

এই আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষজন হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী নন। তাঁদের ধর্মের নাম ‘সারণা’। এরা মূর্তি পূজা বা পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করেন না। দেবতার পুজো হয় না সারণা ধর্মে। বরং প্রকৃতিরই উপাসনা হয়। গতকাল থেকে গ্রামগুলিতে অসুর পুজো শুরু হয়েছে, সেখানে গাছপালা, গরু, ছাগল, পশুপাখি, চাঁদ-তারার পুজো হচ্ছে। প্রকৃতি ও জাগতিক বিশ্বের যা যা শক্তি আছে তারই উপাসনা করা হয় সারণা ধর্মে।

অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতো ‘অসুর’ সম্প্রদায়েরও একাধিক গোত্র রয়েছে। প্রকৃতি, পরিবেশ, জীবজন্তুদের নামে এইসব গোত্রের নাম। যেমন–কাছুয়া (কচ্ছপ), কেরকেটা (পাখি বিশেষ), নাগ (সাপ), শিয়ার (শেয়াল), টিরকি (পাখি বিশেষ), বারোয়া (বন বেড়াল), আইল্ড (পাকাল মাছ), বাসরিয়ার (বেল) এসবই অসুর জনজাতির গোত্র। মহিষাসুরই এদের পূজ্য দেবতা।

মহিষাসুর হলেন এই আদিবাসী গোষ্ঠীর রাজা। তাঁরও কিন্তু কোনও মূর্তি পুজো হয় না। গত দু’বছর ধরে পূর্ব কলকাতাতেও অসুর পুজো হচ্ছে। একটি সংস্থা আছে যার নাম আদিবাসী চেতনা সমিতি। পূর্ব কলকাতার প্রায় দশ-বারোটা গ্রাম্য এলাকায় মহিষাসুরের পুজোর আয়োজন করে এই সমিতি। এমনকি খাস কলকাতা ও‌ আশপাশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষজন থাকেন। তাঁরাও এই উৎসবের আয়োজন করেন প্রতি বছর।

ইতিহাসবিদরা বলেন, ‘অসুর’ সমাজে–অনার্য ভাব যতটা প্রকট, ঠিক ততটাই আর্য–প্রাধান্যও রয়েছে। ধারাবাহিক বিবর্তন ও আত্মীকরনের মধ্যদিয়ে ‘অসুর’ সমাজের একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছে। এই সম্প্রদায় আজও উচ্চবর্ণের কাছে ব্রাত্য। তার উপর মহিষাসুরের পুজো করায় এরা অনেকটাই উপেক্ষিত। বিরল জনজাতির তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছে অসুর সম্প্রদায়। আয়োজকদের একজন ভজহরি সরদার বলেন, আমরা দুর্গা পুজো করি না তা নয়। উৎসবে তো থাকতেই হয়। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের কথাও বলতে চাইছি। প্রকৃত বীরের উপাসনা হোক, সেটাই চাইছি।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকাসুখপাঠ

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.