হাড়ের বাঁশি (সপ্তবিংশ পর্ব)

1

‘আপনার প্রপিতামহ শঙ্করনাথ ভট্টাচার্য, আদি নিবাস মুর্শিদাবাদ জিলাস্থিত এড়োয়ালি গ্রাম। আমার অনুমান কি অভ্রান্ত?’

প্রশ্ন শুনে ঋষা বিস্ময়ের চোখে একবার পাশে বসা মহেশ্বরবাবুর দিকে চেয়ে সাগ্রহে বৃদ্ধ পণ্ডিত ভৈরব চট্টোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কী করে জানলেন?’

স্মিত হাসলেন দীর্ঘাঙ্গী ভৈরব। পরনে একখানি অতি সাধারণ সুতির পাঞ্জাবি ও ধুতি, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখমণ্ডলে তীক্ষ্ণ খড়গ নাসা অতি সহজেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মস্তক মুণ্ডিত, চক্ষু দুটি দিনান্তের উনানে ভষ্মাবৃত অগ্নির মতো আত্মগোপন করে রয়েছে কিন্তু তাদের উষ্ণতা দূর থেকেও অনুভব করা যায়, ‘তাহার ব্যাখ্যা অপ্রয়োজনীয়! শুধুমাত্র কহিতে পারি, আপনার প্রপিতামহ শঙ্করনাথের সহিত আমার বৃদ্ধ প্রপিতামহ পুণ্যাত্মা সেনাপতি চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের প্রগাঢ় সম্পর্কই সম্ভবত আজ বহু বৎসর পর আপনাকে এইস্থলে টানিয়া আনিয়াছে!’
বিস্ময়াভিভূতা
ঋষা অস্ফুটে উচ্চারণ করল, ‘সেনাপতি চট্টোপাধ্যায়?’
–হ্যাঁ মা, সম্পর্কটি বংশানুক্রমিক।
আপনার অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ শ্যামাচরণ ভট্টাচার্য মহাশয় আমার পূর্বপুরুষকে রাঢ়দেশে এড়োয়ালি গ্রামের উপান্তে নিষ্কর জমি দান করিয়াছিলেন। উক্তস্থলে নির্মিত ভদ্রাসনেই আমাদিগের পরম আরাধ্যা কুলদেবীর মন্দিরও প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল। তিনি শ্বেতবর্ণা সালঙ্কারা মা আনন্দময়ী, জগতে তিনিই শ্বেতকালী রূপে প্রসিদ্ধা।
–শ্বেতকালী?
পাশে রাখা পানে
র ডিবে থেকে একখানি সুগন্ধি পান মুখে দিয়ে ভৈরব বললেন, ‘দেবীর এই রূপ অপ্রচলিত হইলেও বিরল নহে। কৌমুদী সুবাসে আচ্ছন্ন পূর্ণিমা নিশীথে তাঁহার বিশেষ গুহ্যপূজা সম্পন্ন হইয়া থাকে। মা আনন্দময়ী ত্রিগুণাতীতা। ইচ্ছাশক্তি, ক্রিয়াশক্তি এবং সর্বোত্তম জ্ঞানশক্তি তাঁহাকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করিলে তিনি দ্বার খুলিয়া দেন। তিনিই মুক্তিভক্তিপ্রদায়িনী, সাকার-আকার-নিরাকারা।বৃদ্ধ ভৈরবের কথা শেষ হতেই অদূরে কোথাও একটি হুতোম প্যাঁচা কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল, পরপর দুইবার। পুনরায় বৃষ্টির জলতরঙ্গে চঞ্চলা বাতাস বামদিকের বন্ধ জানলায় যেন মৃদু করাঘাত করল। নিরাভরণ ক্ষুদ্র কক্ষে আসবাবপত্র কিছুই নাই। বিবর্ণ দেয়ালে মুণ্ডমালিনী খড়গশোভিতা সমর প্রাঙ্গণে নৃত্যরতা দিগ্বসনা দেবীর অতি পুরাতন পটচিত্র একমাত্র অলঙ্কার। কড়িবরগার ছাদে পাখা ও সামনের দেয়ালে বিজলি বাতি থাকলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আজ এই গৃহ প্রায় নিষ্প্রদীপ। একখানি লণ্ঠন ও মোমবাতির পীতবর্ণা আলোয় ছায়াচ্ছন্ন কোনও সুদূর জগতের স্মৃতি আখ্যানের মতো এই কক্ষের মেঝেয় পাতা কম্বলের উপরে বসেছে ঋষা এবং মহেশ্বর। সম্মুখে একটি কুশাসনে বসে রয়েছেন ভৈরব। মুখে মন্দ মন্দ মধুবাতাস তুল্য হাসি। তাঁর দীর্ঘ ছায়া পেছনের দেয়ালে অলীক বাতাসে দোদুল্যমান। ধীর স্বরে মহেশ্বরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মনে হইতেছে আপনার কিছু জিজ্ঞাস্য রহিয়াছে!’
উত্তরে মহেশ্বরও
মৃদু হাসলেন, ‘শুধু একটি সঙ্গত প্রশ্ন রয়েছে!’
–নিঃসংকোচে জিজ্ঞাসা করিতে পারেন!
–এড়োয়ালি গ্রামে আপনাদের ভদ্রাসন,
প্রতিষ্ঠিতা দেবী, নিষ্কর জমি সমস্ত কিছু ফেলে এই কলকাতা শহরে চলে এলেন কেন?
কৌতুকের সুরে
ভৈরব বললেন, ‘ভদ্রাসন এবং নিষ্কর জমি ছাড়িয়া আসিয়াছি সত্য কিন্তু ইষ্টদেবী ত্যাগ করিয়াছি এই কথা আপনাকে কে বলিল? আমি তো বলি নাই!’
পাশ থেকে ঋষা সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করল, ‘মানে শ্বেতকালী এই বাড়িতেও রয়েছেন?’
ক্ষণিকের জন্য প্রশ্রয়ের হাসি ভৈরবের ওষ্ঠ স্পর্শ করেই মিলিয়ে গেল। বালিকাকে প্রবোধ দেওয়ার স্বরে তিনি বললেন, ‘তিনি সর্বত্র রহিয়াছেন!’
–সেই পুরনো বিগ্রহই রয়েছে?
ভৈরব স্মিত হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি তাঁহার দর্শন প্রত্যাশিনী?’

ঋষার বসার ভঙ্গিটি ঋজু। গ্রীবামূলে ঢেউ দোলানো কেশরাজি, অঙ্গে আসমানি সুতির শাড়ি এবং মেধা প্রভায় উজ্জ্বল চোখদুটি দেখে মনে হয় নিরলংকারা এই যুবতি ছায়াচ্ছন্ন কক্ষে যেন নিজেই একটি স্বপ্রভ দীপ। সুদূর নক্ষত্রের মতো আনমনা স্বরে বলল, ‘একবার তাঁকে প্রণাম করতাম।’
–আপনার অভীপ্সা
মা আনন্দময়ী নিশ্চয় পূর্ণ করিবেন! কিন্তু তাহার পূর্বে যে বিচিত্র স্বপ্ন-আখ্যান আপনার মুখে শুনিলাম তাহা লইয়া আলোচনার প্রয়োজন রহিয়াছে।
মহেশ্বর বৃদ্ধ পণ্ডিতের
কথায় সুর মিলিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও ভারি অবাক হয়েছি। কিন্তু তার কারণ ব্যাখ্যা আমার পক্ষে অসম্ভব। সেইজন্যই ওকে এখানে নিয়ে এলাম। এত স্পষ্ট স্বপ্ন! যেন ছায়াছবি, এ কীভাবে সম্ভব?’
দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর
 ভৈরব স্বগতোক্তির ভঙ্গিমায় বললেন, ‘সম্ভব। মায়াজগতে তাঁহার ইচ্ছা হইলে সমস্ত কিছুই সম্ভব।’

রাত্রি প্রায় আটটা, কিন্তু এর মধ্যেই বিগতযৌবনা কলকাতা নগরীর পথঘাট প্রায় জনমানবশূন্য। ভুবনডাঙা অকাল বর্ষায় আকুল। ভৈরব চট্টোপাধ্যায়ের জীর্ণ দ্বিতল গৃহের অদূরে কলকলনাদিনী চঞ্চলা সুরধুনির উপরে আকাশও কৃষ্ণকুসুমের মতো মেঘাবৃত। টলোমলো বাতাস যেন ইন্দ্রিয়পরায়ণ কোনও পুরুষ, আলোছায়াময় নির্জন পথঘাট পার হয়ে তার ব্রুহাম গাড়িটি গোপন অভিসারের পথে চলেছে, বৃষ্টি দুকূলে অস্পষ্ট চরাচরে কোনও দেবশিল্পীর সুরধ্বনি হয়ে বেজে উঠেছে করুণ রাত্রি রাগ। মাঝে মাঝে সৌদামিনীর কটাক্ষে নিশীথ আকাশ ক্ষণিকের জন্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে পরমুহূর্তেই অধিক গাঢ় অন্ধকারকে প্রেমাস্পদের মতো আলিঙ্গনে আপন করে তুলছে। বহুদিন পর এমন অশান্ত দুর্যোগের রাত্রি শতাব্দী-প্রাচীন এই কলোনি শহরে পুনরায় কারোর অদৃশ্য ইশারায় হয়তো নেমে এসেছে।বৃদ্ধ ভৈরবের গৃহটি জরাজীর্ণ, বামপাশে একটি প্রকাণ্ড অশ্বত্থ গাছ বাতাসে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে।অশান্ত বাতাস আজ শাখা প্রশাখার মধ্যে হিল্লোল তোলায় করুণ বিলাপের মতো ধ্বনি শোনা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, যেন গঙ্গা তীরবর্তী কোনও জনহীন শ্মশানঘাটে মৃতের আত্মীয়ার শোকাতুর কণ্ঠ। পথের উপর ক্ষুদ্র অন্ধকারাচ্ছন্ন বুড়ো শিবের মন্দির পার হয়ে এই গৃহের সদর দুয়ার। আঁধার থইথই উঠান কুয়োতলা পেছনে রেখে কয়েক পা সিঁড়ি বেয়ে উঠলে টানা বারান্দা। বামদিকে দোতলার সিঁড়ি আর সামনে বারান্দার শেষপ্রান্তে পাশাপাশি তিনটি ঘর। একেবারে ডানদিকের কক্ষে আজ সন্ধ্যার অতিথিদের নিয়ে বসেছেন ভৈরব। বাকি দুটি কক্ষ বন্ধ। এই পুরাতন গৃহে এমন অনেক কক্ষই তালাবন্ধ পড়ে থাকে, লোকজন বিশেষ কেউ থাকে না। অকৃতদার নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ ভৈরব চট্টোপাধ্যায়ই যেন বাড়িটির একমাত্র সখা!

‘পরিক্রমাবাসী দুইজন সন্ন্যাসীর কী যেন নাম কহিয়াছিলেন?’ভৈরবের প্রশ্ন শুনে তাঁর মুখের দিকে একপলক তাকাল ঋষা। থমথমে মৃদুমন্দ আলোয় বৃদ্ধের মুখখানি প্রায় ভাবলেশহীন। শুধু দুটি নয়ন কোনও নিশাচর পক্ষীর মতো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রথম মুহূর্তের জন্য ঋষার মনে হল, এখানে না এলেই ভালো হত। নিজের অজান্তেই সে যেন কোনও বৃহৎ এবং জটিল ষড়যন্ত্রের মধ্যে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে! কে এই তীক্ষ্ণধী ব্রাহ্মণ যিনি অবলীলায় তার বংশ-ইতিহাস বলে চলেছেন? সাধারণত সিদ্ধ সাধকের মুখমণ্ডলে কোমল ভাব ফুটে ওঠে, কিন্তু এই মাতৃসাধক এত কঠোর কেন? দেখে মনে হয় কোনও শুভাশুভবোধ কখনও তাঁকে স্পর্শ অবধি করেনি। তাছাড়াও কয়েক মুহূর্ত পূর্বে খুব মৃদু, প্রায় বাস্তুসাপের হিসহিসে শব্দের মতো কোনও অদৃশ্য শব্দ এই গৃহে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সঙ্গে দূরাগত নূপুরধ্বনি, ক্ষীণ কিন্তু অস্পষ্ট নয়। যেন কেউ ঝুমঝুম শব্দ তুলে দোতলায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। লঘু চপল বালিকার মতো পদধ্বনি আর তার সঙ্গী ওই অলীক সর্পের শিস! ঋষা নিজে জানে স্বপ্নের ঘটনার পর তার ইন্দ্রিয় অতিমাত্রায় সজাগ হয়ে উঠেছে এখন, দৃশ্যমান বস্তু-বিশ্বের সীমার ওপারের অনেক শব্দ সে আজকাল স্পষ্ট অনুভব করতে পারে। এখানে থেকে যত শীঘ্র সম্ভব চলে গেলেই মঙ্গল। এই সাধক স্বাভাবিক কোনও মানুষ নন। সহসা ভৈরবের শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বরে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল, ‘কী হইল? তাঁহাদের পরিচয় মনে পড়িতেছে না? নাকি নূপুরধ্বনির ন্যায় মনস্থিত মুণ্ড মহারণ্যে আপনি পথভ্রষ্টা হইয়াছেন?’
নূপুরের কথা শুনে
আশিরনখ চমকে উঠল ঋষা। কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সামলে গৃহদেবতা বাণেশ্বর শিবের কাছে মনে মনে অভয় প্রার্থনা করে ধীর স্বরে বলল, ‘একজনের নাম শ্যামানন্দ আর অপর সন্ন্যাসীর নাম স্বপ্নে জানতে পারিনি।’
–হুঁ, শ্যামানন্দ, পুরী সম্প্রদায় সম্ভবত! অপরজন কি জটাধারী দীর্ঘাঙ্গী? কাষ্ঠকৌপীন পরিহিত?
বিস্মিত ঋষা
একপাশে মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তবে তিনি সামান্য অস্পষ্ট। অন্তত শ্যামানন্দের মতো স্বপ্নে উজ্জ্বল রূপে ছিলেন না।’
কয়েক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা
করলেন ভৈরব। তারপর তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘শ্যামানন্দ কি গহিন অরণ্যে কোনও বিরাটাকার নগ্ন পুরুষের দর্শন পাইয়াছিলেন? মধ্য ললাটে ক্ষতচিহ্নযুক্ত সেই পুরুষ কি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ত্বং কুতঃ আগতঃ অসি?’
ঋষা সহসা খুব ক্লান্ত বোধ করল।
স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে উঠেছে। মাথার পেছনে ঘাড় ও কাঁধের সংযোগস্থল অতি উষ্ণ। যেন কেউ অগ্নিশলাকার তুল্য উত্তপ্ত আঙুল স্পর্শ করেছে। কণ্ঠ হতে ঠিক ষোলো যব নীচে হৃদয়ের কাছটি অশান্ত সমুদ্রের মতো উত্তাল। ক্ষীণ স্বরে শুধু বলল, ‘স্বপ্নে এই দৃশ্য দেখেছি।’

একদৃষ্টে ঋষার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ভৈরব। পাশ থেকে মহেশ্বর কী একটা কথা বলার জন্য মুখ খুলতেই বাম হাতের ইশারায় তাঁকে চুপ করিয়ে পুরাতন গর্ভগৃহে জেগে ওঠা মন্ত্রধ্বনির মতো ঋষার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনার জন্মপত্রিকায় শুক্র আয়স্থানে ক্ষেত্রস্থিত, ফলত আপনি সুলক্ষণা, সুহাসিনী, কুসুমামোদী, গুণবতী এবং কুলহিতসাধিকা। তথাপি দ্বাদশে স্থিত রবির কারণে কামাতুরা। যে যুবকের প্রতি আপনি আকৃষ্ট তিনি কদাপি আপনার পক্ষে মঙ্গলদায়ী নহেন! কুপিত চন্দ্রের কারণে অচিরেই আপনার জীবনে দুর্ভোগ নামিয়া আসিবে এবং ইহা আপনাদিগের বংশদোষ। জানিলে আশ্চর্য হইবেন স্বপ্নে দৃষ্ট সন্ন্যাসী শ্যামানন্দই আপনার কুলত্যাগী প্রপিতামহ শঙ্করনাথ ভট্টাচার্য! চন্দ্রদোষ তাঁহাকেও সত্য সন্ধানে বাধা দিয়াছিল।’

ক্লান্ত ঋষা ক্রমশ বুঝতে পারছে একটি কৃষ্ণ সমুদ্র তাকে গ্রাস করার জন্য প্রতি মুহূর্তে এগিয়ে আসছে। তবুও শঙ্করনাথের আখ্যান শোনার পর নিজেকে কোনওক্রমে স্থির করে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘শঙ্করনাথই শ্যামানন্দ?’
মহেশ্বরও এই বিচিত্র
ঘটনাটি অনুধাবন করার প্রাণপণ চেষ্টায় সাগ্রহে ভৈরবের মুখের দিকে তাকালেন। দু-এক মুহূর্ত পর জীর্ণ পাতার মতো হাস্য ওষ্ঠপ্রান্তে রেখে কঠিন সুরে বললেন, ‘হ্যাঁ, পুণ্যাত্মা সেনাপতি চট্টোপাধ্যায়ের শত নিষেধ অগ্রাহ্য করিয়া তিনি গৃহত্যাগ করিয়াছিলেন। ইহার ফল শুভপ্রদ হয় নাই। সেনাপতির নিকট বংশের একটি অতি গুহ্যবিদ্যা আয়ত্ত করিয়া তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবহারও তিনি মুণ্ড মহারণ্যে করিয়াছিলেন।’

ক্রমশ ভৈরবের কণ্ঠস্বর রুক্ষ হয়ে উঠছে আর তার সঙ্গী হয়েই যেন জগত উঠানে নেমে এসেছে প্রবল বৃষ্টিপাত। অবিরল বারিধারার মধ্যে উন্মত্ত বাতাস সকল বন্ধন ছিন্ন করে আপন খেয়ালে বয়ে চলেছে, যেন মহাসমুদ্রে পথভ্রষ্ট পানসি। প্রতি মুহূর্তে তীব্র বজ্রপাতের ধ্বনি মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রলয় সমাসন্ন। কক্ষে মোমবাতিটি সবার অলক্ষ্যে কখন যেন নির্বাপিত হয়েছে। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের মতো ক্ষীণ লণ্ঠনের আলোয় ভৈরবের ছায়া দেওয়ালে অতি ক্রুদ্ধা কালনাগিনী তুল্য ভয়ঙ্কর। ক্রুর স্বরে কায়ার অন্তর থেকে তিনি বলে চলেছেন, ‘দীর্ঘদিন অপেক্ষা করিয়া রহিয়াছি। আমি অকৃতদার। বংশের অন্তিম দীপ। অভিশাপ না কাটাইতে পারিলে নরকেও স্থান হইবে না। আমার গণনা অভ্রান্ত। নিশ্চিত জানিতাম শঙ্করনাথের উত্তরাধিকারী একদিন সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইবে। আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হইয়াছে।’ সহসা উঠে দাঁড়িয়ে বাম হাতের শীর্ণ তর্জনী ঋষার দিকে নির্দেশ করে অট্টহাস্যে বললেন, ‘আপনাকেই পূর্বপুরুষকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে!’

ঋষার চেতনা অমানিশার ঘোরকৃষ্ণবর্ণ রূপে প্রায় আচ্ছন্ন। মহেশ্বরও বিমূঢ় হয়ে বসে রয়েছেন। তবুও কে যেন ঋষার মনের অন্তঃস্থল হতে উঠে এসে জিহ্বায় অধিষ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী পাপ? আর কীই বা তার প্রায়শ্চিত্ত?’
‘কী পাপ? শুনবেন?’
এক মুহূর্ত নিশ্চুপ থাকার পর হঠাৎ ভোজবাজির মতো পূর্বের স্বর ত্যাগ করে অতি ধীর কণ্ঠস্বরে ভৈরব বললেন, ‘শত নিষেধ অমান্য করিয়া শ্যামানন্দ আমার বংশের গুহ্য প্রাচীন বিদ্যা দ্বারা মুণ্ড মহারণ্যে হাড়ের বাঁশি জাগ্রত করিয়াছিলেন। ইহার ফল আপনাকে ভোগ করিতে হইবে।’

ঋষা অপরিসীম ক্লান্তি স্রোতে ভেসে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে কোনওক্রমে আচ্ছন্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘হাড়ের বাঁশি কী?’

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (ষড়বিংশ পর্ব)

You might also like
1 Comment
  1. […] হাড়ের বাঁশি (সপ্তবিংশ পর্ব) […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.