‘‘মুখ্যমন্ত্রীকে অসম্মান করা ইস্টবেঙ্গলের উচিত হয়নি, বাংলার ফুটবলের পক্ষে বড় আঘাত’’

0

শুভ্র মুখোপাধ্যায়

বিনিয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের এই জটিলতাকে ভাল মতো গ্রহণ করছেন না মোহনবাগান সচিব সৃঞ্জয় বসু। তিনি বারবার একটা কথাই বলছেন, ‘‘মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল একে অপরের পরিপূরক, এই সংঘাত না হলেই ভাল হতো। এটি কখনই বাংলার ফুটবলের পক্ষে ভাল বিজ্ঞাপন হয়ে থাকবে না।’’
এমনকি চিরপ্রতিপক্ষ ক্লাবের এই শীর্ষ কর্তার আরও ধারণা, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সম্মানার্থে এই কোন্দল মিটিয়ে নিয়ে ইস্টবেঙ্গলে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত।
এরকমই নানা বিবৃতির ডালি সাজিয়ে হাজির হলেন সৃঞ্জয়। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর অন্তর্কলহ নিয়ে সোজাসাপটা জানালেন ‘দ্য ওয়াল’কে একান্ত সাক্ষাৎকারে।
প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল ও তাদের ইনভেস্টর শ্রী সিমেন্টের মধ্যে এই জটিলতার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার?
সৃঞ্জয় : দেখুন, অন্য ক্লাবের কোথায় কি সমস্যা, সেটি আমাদের ভাবনা নয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বলব বিষয়টি ভাল হচ্ছে না, এতে বাংলার ফুটবলের পক্ষে খারাপ দিক উঠে আসছে।
এই সমস্যা ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রে প্রথম নয়, কোয়েস গ্রুপ থাকতেও এই সমস্যা হয়েছে। আমি একবার নিতুদা-কে (দেবব্রত সরকার) কথা প্রসঙ্গেই বলেছিলাম, আপনারা এই ধরনের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিন। এই যে ইনভেস্টরের সঙ্গে সংঘাতে চলে গেল, এটা ঠিক নয়। এতে সমর্থকদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। সেটাই আমি ওঁদের সতর্ক করেছিলাম, তারই প্রভাব শ্রী সিমেন্টের ক্ষেত্রেও পড়ল।
আর তাছাড়া, এইসব বড় গোষ্ঠীর কর্ণধারদের উচ্চমহলে বড় প্রভাব রয়েছে, কার দ্বারা কী ঘটবে, কেউ জানে না। তাই এই সমস্যা দ্রুত মিটিয়ে নেওয়া উচিত ছিল।
প্রশ্ন : আপনাদের মধ্যে যখন চুক্তি হয়েছিল, মানে এটিকে ও মোহনবাগানের মধ্যে, সেইসময় তো এত সমস্যা হয়নি?
সৃঞ্জয় : আমাদের কিছু আবশ্যিক শর্ত ছিল, সেগুলি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথার মাধ্যমে মিটেছে। সমর্থকদের মধ্যে এগুলি নিয়ে প্রথমদিকে ক্ষোভ ছিল, আমরা সেই বিষয়গুলি মিস্টার সঞ্জীব গোয়েঙ্কার সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনিও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেই কাজটি সহজ হয়েছে। এমনকি এটিকে-র সিইও রঘু আইয়ারও বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা সদর্থক মনোভাব না দেখালে হয়তো সমস্যা হতো।
সমর্থকদের মনে ক্ষোভ দুই পক্ষের ম্যানেজমেন্টের মধ্যে সংক্রমিত হয়নি, কারণ সংঘাত করে লাভ হয় না, একটা ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে গেলে মতান্তর হতেই পারে, কিন্তু সেটি নিয়ে কথা বলতে হয়। বৈবাহিক সম্পর্কের কথাই ধরুণ না, নতুন স্বামী-স্ত্রী-র মধ্যে বিতন্ডা হতে পারে, কিন্তু সব সম্পর্ক কি তাই বলে শেষ করা উচিত। সব ক্ষেত্রেই এমনটা হয়, তার জন্য দরকার ধৈর্য্যশীল মনোভাব ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
ইনভেস্টর হোক বা স্পনসর, যারাই বছরে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা দেবে, তাদের কিছু শর্ত থাকবেই, সেই দাবি মানতে হয় ক্লাবের স্বার্থে, তাতে সার্বিক উন্নতি হয়।
প্রশ্ন : টার্মশিটে সই করলেই ক্লাব কি বিক্রি হয়ে যায়, বিশ্ব ফুটবলে এরকম নজির কিছু রয়েছে? নাকি শর্তের ধরণই আপত্তির কারণ?
সৃঞ্জয় : এটা বিক্রি কিংবা অবিক্রিতের কোনও বিষয় নয়, টার্মশিট হয় দুই পক্ষের বোঝাপড়ার ওপর। যেমনভাবে দুই পক্ষের মৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেরকই। দুই পক্ষের বোঝাপড়ার পরেও এমন সমস্যা ইস্টবেঙ্গলে হচ্ছে, এতে আমি কিছুটা অবাকই হয়েছি।
সেইসময় পরিস্থিতিটাও কেমন হয়ে গিয়েছিল। ইস্টবেঙ্গল বলছে টাকা নেই, ইনভেস্টর আইএসএলে খেলার জন্য অর্থ দিল, তার আগে এফএসডিএল ঘোষণা করে দিল, ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলবে। কিন্তু একটা টার্মশিট সই হল না, তার আগেই ইনভেস্টর টাকা দিয়ে দেবে, সেটা ভাবাও যায় না।
প্রশ্ন: রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সামনে বিনিয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেও এই জটিলতা কেন হচ্ছে? তাতে কি মুখ্যমন্ত্রীকে ছোট করা হচ্ছে না?
সৃঞ্জয় : অবশ্যই মুখ্যমন্ত্রীর সম্মানের কথা ভাবা উচিত ছিল ইস্টবেঙ্গলের। তাঁর সামনে নবান্ন সভা ঘরে কর্পোরেটের সঙ্গে একটা ক্লাবের চুক্তি হল, তারপর সেই বিষয়টি নিয়ে এমন পর্যায়ের কাদা ছোড়াছুড়িতে মু্খ্যমন্ত্রীকে অসম্মান করানো হয়েছে, এটি কাঙ্খিত ছিল না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেন তিনি বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন, আমাদের ক্লাবের সমস্যার ব্যাপারেও এগিয়ে এসেছিলেন, এটাই ওনার গুণ। তারপরে ওঁর উপস্থিতিতে যে চুক্তি হল, সেটিকে অগ্রাহ্য করে প্রতিদিন নানা নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে, তা বাংলার ফুটবলের পক্ষে ভাল বার্তা নয়। এতে বাংলার ফুটবলেরই ক্ষতি হচ্ছে।


প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যে কোম্পানিই অর্থ ঢালুক না কেন, তাদের ফুটবল নিয়ে একটা প্যাশন থাকবে কিংবা ক্লাবের প্রতি আবেগ থাকবে?
সৃঞ্জয় : অবশ্যই, না হলে সেই সম্পর্ক টিকতে পারে না। এটিকে-র কর্ণধার সঞ্জীব গোয়েঙ্কার কথাই ধরুণ। তিনি আদ্যন্ত মোহনবাগান প্রেমী, তাঁর বাবাও তাই ছিলেন, তিনি ক্লাবের সদস্য ছিলেন। একটা বনেদি পরিবার, ক্লাবের প্রতি ভালবাসা ছিলই, তারপরে জেতার একটা মরিয়া অভ্যাস থাকা জরুরী। যে কোনও স্তরে সাফল্য পেতে গেলে খিদে থাকতে হবে, এটি ওনাদের রয়েছে। হার-জিৎ থাকবেই, কিন্তু চেষ্টাটা থাকতে হবে।
আর দাবির কথা যখন উঠছেই, আমাদের তো আগে ছিল ম্যাকডাওয়েল-মোহনবাগান, সেই নিয়ে কম সমস্যা হয়নি। বলা হয়েছিল, মদ কোম্পানির নাম আগে ব্যবহার করা যাবে না, কিন্তু সেই সমস্যা আমরা কাটিয়ে উঠেছিলাম। আগে একটা দল গড়তে বড় জোর ৬ কোটি টাকাতে হয়ে যেত, এখন দল গড়তে দরকার ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা, মানে দশগুন অর্থ। এই টাকা আসবে কোথা থেকে, এগুলিও তো ভাবতে হবে।
প্রশ্ন : এটিকে-র চুক্তিতে সই করার আগে আপনাদের ভাবনা কি ছিল? কোনটিকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন?
সৃঞ্জয় : দেখুন, ক্লাবে কার কতটা শেয়ার থাকবে, কার কতটা অগ্রাধিকার থাকবে, সেই নিয়ে আলোচনা চলেছে। আমরা বলেই দিয়েছিলাম, শুধু ফুটবল বিভাগটা আমরা আপনাদের দেব, বাকি ক্লাব প্রশাসন সবটাই থাকবে মোহনবাগানের হাতে।
এমনভাবেই বিদেশেও পরিকাঠামো সাজানো থাকে। সেখানে বোর্ড অব ডিরেক্টরস থাকে, একজন সিইও থাকেন, আর টিমটা আলাদা থাকে। ফুটবলে পেশাদারিত্ব আনতে গেলে অর্ধেক করে কিছু হয় না। বোর্ড অব ডিরেক্টরসরা যদি ভাবেন প্রতিদিন টিমের ব্যাপারে মাথা গলাবে, তা হয় না। আমি যদি মনে করি প্রতিদিন দলের ড্রেসিংরুম গিয়ে ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলব, তা কেউ মানতে পারবে? আমরা থাকব দলের সার্বিক সহায়তায়, তার মানে নিজেদের এক্রিয়ারটা বুঝতে হবে।
আমাদের সঙ্গে এটিকে-সমঝোতা নিয়ে কোনও সমস্যা হয় নি। আর এটা তো মানতে হবে, মোহনবাগান ক্লাব অতীতে কোনও ফুটবলারের সঙ্গে চুক্তি জাল করেছে, তাদের টাকা মেরেছে, কারোর সঙ্গে প্রতারণা করেছে, সেই ফুটবলার আবার এফআইআর করেছে, এগুলি হয়নি। আমি কোনও ক্লাবের সঙ্গে তুলনায় যেতে চাইছি না, কিন্তু এটা মানতে হবে। সেই সম্মান মোহনবাগান যেসব কর্তারা চালাচ্ছেন, এই প্রশংসা প্রাপ্য তাঁদের।
প্রশ্ন : এটিকে-সঙ্গে চুক্তি পরেও সবুজ মেরুন সমর্থকদের মধ্যে একটা ধোঁয়াশা ছিল, তার নিরসন কী হয়েছে?
সৃঞ্জয় : এই সমস্যা একেবারে মিটেছে বলব না, কিন্তু মোহনবাগানের নামে আগে এটিকে বসছে কেন, এই নিয়ে কথা উঠেছিল। বলা হয়েছিল, এটিকে নাকি ফুটবল দল নয়, কিন্তু আমরা বরাবর বলে এসেছি, মোহনবাগান একটা প্রতিষ্ঠান, এটা এত বড় একটা নাম, তার আগে-পরে কি বসল, কিছু যায় আসে না। ম্যাকডাওয়েল নাম বসার সময়ও বলা হয়েছিল।
তাই সময়ই জীবনযাত্রার সেরা স্তম্ভ, সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। জার্সি সবুজ মেরুন হয়েছে, একটা তৃতীয় কিটের জার্সি নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল, কিন্তু আমাদের এর আগে এরকম কিটস ব্যবহার করিনি, সেই সমস্যাও মিটেছে। তাই হইচই করে লাভ হয় না।
আগে এটিকে নিয়ে সমস্যা ছিল, কোনওক্ষেত্রে তাদের নামটাই ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এটিকে-মোহনবাগান নামের সঙ্গে সমর্থকরাও একাত্মতা অনুভব করছেন, কেউ আলাদা করে ভাবছে না।
প্রশ্ন : ইনভেস্টর ও মার্জারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ঠিক কোন জায়গায়?
সৃঞ্জয় : ইনভেস্টর ও মার্জারের মধ্যে কোনও মৌলিক পার্থক্য নেই। রসায়ণ খুব সহজ, একটা আবশ্যিক শর্ত মানতেই হবে, যে কোম্পানি অর্থ ঢালবে, তাদের মত শুনতেই হবে। ইউ বি গ্রুপ যখন ছিল দু’প্রধানের, তখনও তাই ছিল। বোর্ড অব ডিরেক্টরসে কাস্টিং ভোট ছিল। এখন সেটি বদলেছে ধরণটা, আগামী দিনে আরও বদল আসবে।
তার মানে এই নয় যে, আমাদের সাফল্যের রেকর্ড সব ভাগ হয়ে যাবে, এটি মোহনবাগানের সাফল্যের মুকুট হিসেবেই ধরা হবে। এমনকি আইএসএলে যে ম্যাচ গুলি জিতছি, যে সাফল্য পাচ্ছি, তাও মোহনবাগানের ইতিহাসেই স্থান পাবে। এই নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.