সীতারামদের ভরসা নেই আলিমুদ্দিনে, বিধানসভায় বিপর্যয় নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির রিপোর্ট ওয়েবসাইটে

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো : নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে গেল সিপিএমে। যা দেখে অনেকেই বলছেন, সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি আলিমুদ্দিন স্ট্রিটকে যে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না, এটা তারই উদাহরণ।

কী ঘটনা?

বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে সিপিএমের দু’দিনের রাজ্য কমিটির বৈঠক। কলকাতায় যখন সেই বৈঠক চলছে তখন দেখা গেল দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের ওয়েবসাইটে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের পর্যালোচনা আপলোড করে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর মধ্যে বিস্ময়ের কী আছে?

সিপিএমের অনেকের কথায়, ভোটের পর্যালোচনার একটা নির্দিষ্ট সাংগঠনিক নিয়ম রয়েছে। সেই অনুযায়ী এই ঘটনা ঐতিহাসিক। সিপিএমের সাংগঠনিক নিয়ম হল, বিধানসভা বা লোকসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর প্রথমে পলিটব্যুরো বসে। তারপর নির্বাচনী পর্যালোচনার নোট তৈরি করা হয় রাজ্যওয়াড়ি। সেই নোট রাজ্য ও জেলার মাধ্যমে নামে শাখা স্তর পর্যন্ত। শাখা থেকে সাধারণ পার্টি মেম্বাররা যে পর্যালোচনা করে তা যায় রাজ্যে। এরপর রাজ্য একটা সামগ্রিক পর্যালোচনা রিপোর্টের খসড়া করে পাঠিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় কমিটিতে। তারপর কেন্দ্রীয় কমিটি একটি সামগ্রিক ও চূড়ান্ত পর্যালোচনা রিপোর্ট তৈরি করে পার্টি মেম্বারদের কাছে পৌঁছে দেয়। এই হল সিপিএমের সাংগঠনিক নিয়ম। পর্যালোচনা রিপোর্ট ওয়েবসাইটে আপলোড হয় অনেক পরে। কিন্তু এবার যেদিন বাংলা সিপিএমের বৈঠক শুরু হল সেদিনই তা উঠল কেন্দ্রীয় কমিটির ওয়েবসাইটে। সবুর করল না সর্বোচ্চ নেতৃত্ব!

বুধবার দ্য ওয়াল-এর প্রতিবেদনেই লেখা হয়েছিল, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট যে পর্যালোচনা রিপোর্ট দিল্লিকে দিয়েছে তা খারিজ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি। স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পরেও বঙ্গ সিপিএম গোলা গোলা পর্যালোচনা করেছে। দ্য ওয়াল-এ এও লেখা হয়েছিল, সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটি রাজ্য কমিটির জন্য নিমের পাচন গুলে দিয়েছে। এবং সূর্য মিশ্র, বিমান বসুদের তাই গেলাতে হবে।

কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়া মাত্র বাংলা সিপিএমের তুলোধনা করা পর্যালোচনা ওয়েবসাইটে তুলে দিল কেন্দ্রীয় কমিটি। এটাকেই আলিমুদ্দিনের প্রতি একে গোপালন ভবনের অবিশ্বাস বলে মনে করছেন অনেকে।

এবার প্রশ্ন আসতে পারে কেন কেন্দ্রীয় কমিটি এই কাজ করল?

সিপিএমের একাংশের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় কমিটি মনে করছে রাজ্য কমিটির যে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে, তা শেষপর্যন্ত শাখা স্তরে নাও নামানো হতে পারে। কিছুটা ফিল্টার করে নিতে পারেন বঙ্গ সিপিএমের নেতারা। যাতে আত্মসমালোচনায় ততটা ঝাঁঝ না থাকে। অনেকের মতে, সামনেই সিপিএমের সম্মেলন। এত ঝাঁঝাল সমালোচনা করলে অনেক নেতার গদি টলমল হয়ে যেতে পারে। সিপিএম সূত্রে খবর, সে কথা আন্দাজ করেই আগেভাগে কেন্দ্রীয় কমিটির ওয়েবসাইটে টাঙিয়ে দেওয়া হল ওই পর্যালোচনা রিপোর্ট। যাতে রাজ্য নেতৃত্ব আর ফিল্টার না করতে পারে।

২০১৬ সালের বাংলার বিধানসভা ভোটে সিপিএম-কংগ্রেস আসন সমঝোতা হয়েছিল। পরে কেন্দ্রীয় কমিটি বলেছিল, ওই আসন সমঝোতা পার্টি কংগ্রেসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এ নিয়ে দলের মধ্যে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর অধিকাংশ সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব। তাহলে কেন্দ্রীয় নেতারাই পার্টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত মানলেন না? এ আবার কী পার্টি? এরাই আবার কমিউনিস্ট শৃঙ্খলা নিয়ে মার্ক্সীয় শিক্ষা শিবিরে লম্বা-চওড়া কথা বলবেন?

অনেকের মতে, সেবারও যে পর্যালোচনা কেন্দ্রীয় কমিটি করেছিল তাও নিচুতলায় সেভাবে নামানো হয়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আগেভাগেই পাঁচ রাজ্যের পর্যালোচনা রিপোর্ট ওয়েবসাইটে দিয়ে দিল কেন্দ্রীয় কমিটি। অনেকের মতে, একটি রাজ্যের পর্যালোচনা তো আর দেওয়া যায় না। আসলে বাংলার জন্যই এটা করা হয়েছে। সিপিএমের একাংশের নেতৃত্ব এও বলছেন, এই ঘটনা রাজ্য নেতৃত্বের যেন লজ্জাজনক। অর্থাৎ একটা এত বড় রাজ্য কমিটির নেতৃত্বকে বিশ্বাসই করে না কেন্দ্রীয় কমিটি।

হতে পারে আলিমুদ্দিন আগেই আন্দাজ করেছিল, রাজ্যের পর্যালোচনা খসড়া কেন্দ্রীয় কমিটি রিসাইকেলবিনে ফেলে দেবে। তাই তার আগেই ওই খসড়া পর্যালোচনা নিয়ে কাকাবাবুর জন্মদিনে পাঠচক্র অনুষ্ঠিত করেছিল বাংলা সিপিএম। কিন্তু তা কার্যত অবৈধ ছিল বলেই মত অনেকের। কারণ কেন্দ্রীয় কমিটির সিলমোহর ছাড়া পর্যালোচনা হয় না।

খসড়া পর্যালোচনায় সংযুক্ত মোর্চা সম্পর্কে মানুষের ভুল বোঝার কথা উল্লেখ করা হলেও তাকে কিছুটা মহিমান্বিত করে দেখানো হয়েছিল আলিমুদ্দিনের তরফে। ভাবখানা এমন যেন, কংগ্রেস-আইএসএফের সঙ্গে জোট করে সিপিএম বাংলায় বলশেভিক বিপ্লব করে ফেলেছে। কিন্তু সীতারাম, কারাটরা পষ্টাপষ্টি বলেছেন, যে ভাবে ভোটের সংযুক্ত মোর্চাকে যুক্তফ্রন্টের মতো করে তুলে ধরা হয়েছিল তা কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বাংলা ইউনিটের প্রতি এই অবিশ্বাস কি কেন্দ্রীয় কমিটির নতুন? অনেকের মতে, একেবারেই নতুন নয়। এই বাতাবরণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল বাংলায় বাম জমানাতেই। কেন? জমি নীতিতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে যখন দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে তখনই একটি ঘটনা ঘটেছিল। বাংলার বামফ্রন্ট সরকার জমির প্রশ্নে কী মানসিকতা নিয়ে এগোচ্ছে তা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে তখন তৎকালীন সিপিএম সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের ভূমি রাজস্বমন্ত্রী আবদুর রেজ্জাক মোল্লাকে। রেজ্জাক সাহেব শুধুমাত্র রাজ্য কমিটির সদস্য। কেন্দ্রীয় কমিটি বা রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন না। প্রকাশের কাছে রেজ্জাক সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে জমি নীতি নিয়ে কোনও আলোচনা করা হচ্ছে না। বুদ্ধবাবু, নিরুপম সেনরাই যা করার করছেন। তিনি এও বলেছিলেন, রাজ্য কমিটিতেও সব আলোচনা হচ্ছে তা নয়। সরকার আর পার্টির মধ্যে কোনও সমন্বয় নেই। বুদ্ধবাবু চলছেন আমলাদের কথায়। এই আমলাতান্ত্রিক কমিউনিস্ট পার্টি সর্বনাশের কারণ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন রেজ্জাক।

তারপর প্রকাশ কারাট তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক বিমান বসুকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বিমানবাবু নাকি রাজ্য কমিটিতে দলের সাধারণ সম্পাদকের লেখা চিঠি পেশই করেননি। যা নিয়ে বাংলার পার্টিকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিল কেন্দ্রীয় কমিটি। অনেকের মতে, ওই ছিল অবিশ্বাসের সূচনা।

কেন্দ্রীয় কমিটি বাংলার ভোট বিপর্যয়ের জন্য পুরোপুরি দায়ী করেছে রাজ্য নেতৃত্বকে। বলা হয়েছে দলের রাজনীতি আত্মস্থ করতে ব্যর্থ বাংলা ইউনিট। জমি নীতির প্রশ্নে যে ত্রুটি হয়েছিল তার সংশোধন না করে উল্টে আরও ভুল করেছেন বাংলার নেতারা। কমিউনিস্ট পার্টির স্বাভাবিক বন্ধু যাঁরা অর্থাৎ শ্রমিক, কৃষক, গরিব মানুষ– এই শ্রেণির থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়ে বিলাসিতার স্বর্গরাজ্যে বিরাজ করেছে বঙ্গ সিপিএম।

জমির প্রশ্নে বাংলা সিপিএমের বিচ্যুতিকে কার্যত তুলোধনা করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটি আগেই বলেছিল, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ কয়েক বছরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রশাসন শিল্পায়নের নেশায় বুঁদ হয়ে জমির প্রশ্নে যে আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছিল তা কখনওই কমিউনিস্ট চরিত্রের সঙ্গে যায় না। কিন্তু দলের দলিলে সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও তা নিয়ে কোনও অনুশোচনা দেখা যায়নি বঙ্গ সিপিএমের। এই বেপরোয়া মনোভাবকে বিপর্যয়ের বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছে একে গোপালন ভবন।

সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণকে অবৈধ বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। তারপর আলিমুদ্দিন স্ট্রিট বলেছিল, প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলে থাকতে পারে তবে উদ্দেশ ছিল সৎ। অনেকের মতে, এই মনোভাব আসলে ভাঙব তবু মচকাব না গোছের। এরপরেও একুশের বিধানসভা ভোটের আগে সিপিএমের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই সিঙ্গুরের টাটা কারখানার ওই জমিতে প্রতীকী শিলান্যাস কর্মসূচি করেছিল। তাতে যোগ দিয়ে সুজন চক্রবর্তী বলেছিলেন, একুশের ভোটে বাম কংগ্রেসের সরকার হবে এবং প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে সিঙ্গুরের মাঠে। সেখান থেকেই এই জমিতে ফের শিল্প গড়ার কথা ঘোষণা করা হবে। এই সমস্ত কিছুকেই সীতারাম ইয়েচুরি, প্রকাশ কারাটরা একযোগে আলিমুদ্দিনের দম্ভ, অহং বলে উল্লেখ করেছেন। অতীতের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ত্রুটিও সংশোধিত হয়নি বলেও উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় কটি।
সিপিএমের এক তাত্ত্বিক নেতা বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি তখনই রসাতলে যায় যখন তার কাঠামো ভেঙে যায় এবং সংগঠনের ভিতর অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়। তাঁর বক্তব্য, বাংলা ইউনিটের চূড়ান্ত অধঃপতন হয়েছে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.