এইমস-প্রধানের কথায় সায়, বিধি মেনে খুলুক স্কুল, চাইছে শিক্ষামহলও

0

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

কোভিড মহামারী ও লকডাউনের প্রভাবে গত দেড় বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এমন ক্ষেত্র বোধহয় গোটা পৃথিবীতে নেই। তবে একথার সঙ্গে কমবেশি সকলেই একমত, যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে। অনলাইন পঠনপাঠন চললেও বহু পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ছাত্রছাত্রী আবার মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছে। অভিভাবকরাও দিশাহারা, শিক্ষকরাও অসহায়।

যদিও এর আগে স্কুল খোলার কয়েক দফা চেষ্টা চলেছে দেশের নানা প্রান্তের বিভিন্ন রাজ্যে। তবে বিধি মেনে স্কুল খুলেও দেখা গেছে, কোভিড সংক্রমণ এড়িয়ে পঠনপাঠন চালানো কার্যত অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের মতামতও যেন আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছে। এমনই পরিস্থিতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন এইমসের প্রধান রণদীপ গুলেরিয়া। তিনি সরাসরি জানিয়েছেন, খুব ক্ষতি হচ্ছে, ফের স্কুল খোলার ব্যাপারে জোরকদমে এগোনো উচিত সরকারের।

রণদীপ গুলেরিয়ার এই মন্তব্য নতুন করে উস্কে দিয়েছে বিতর্ক। তাহলে কি পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা চিন্তাই করছেন না তিনি! তাঁর বক্তব্য, “ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, স্কুলগুলি খোলার ব্যাপারে কৌশল নির্ধারণে আমাদের জোরকদমে এগোনো উচিত। কারণ জ্ঞানের নিরিখে তরুণ প্রজন্মের সত্যিই ক্ষতি হচ্ছে, বিশেষত সেই দুর্বল অংশের, যাঁরা অনলাইন ক্লাসে সামিল হতে পারছে না।”

India in talks with Pfizer-BioNTech regarding COVID-19 vaccine candidate: AIIMS Delhi Director

এ কথারও যুক্তি আছে নিঃসন্দেহে। অন্তত তেমনটাই বলছেন শিক্ষামহলের একটা বড় অংশও।

কলকাতার যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পরিমল ভট্টাচার্য যেমন জানালেন, শুধু এই রাজ্য বা দেশ নয়, সারা বিশ্বের নানা প্রান্ত কোভিডের ঢেউয়ে ছারখার। ফলে অন্য উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখা উচিত, তারা কী করছে। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পারলে ভারতেরও পিছিয়ে থাকার কথা নয়, এই রাজ্যেরও নয়।

তিনি বললেন, “আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় কিছুদিন আগে কয়েক দফা ধরে অনুষ্ঠিত বিধানসভা ভোট এ রাজ্যে কোভিডের সংক্রমণের গ্রাফকে অনেকটাই ঊর্ধ্বমুখী করে দিয়েছে। এই গ্রাফকে যদি ফের নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে আমার মনে হয় আস্তে আস্তে স্কুল খোলা যেতে পারে সমস্ত বিধি মেনে।”

নদীয়ার একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ইংরেজি শিক্ষিকা তনুশ্রী সাহা আবার বলছেন, “এক দুই করে ১৬টা মাস কেটে গেল। পড়ুয়ারা ভুলতে বসেছে ক্লাসের শৃঙ্খলা, স্কুলের শিক্ষা। ফেব্রুয়ারি থেকে যে কদিন নাইন থেকে টুয়েলভের ক্লাস হচ্ছিল, উপস্থিতির হার ছিল ক্লাসপিছু ১-১০%।”

তবে বিকল্প পদ্ধতিতে পড়াশোনা ও মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তনুশ্রী। তাঁর কথায়, “অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার অসাম্য বাড়িয়ে তোলা বাদ দিয়ে আর কোনও উপায় কি কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল না? রেডিও বা দূরদর্শনকে ব্যবহার করা যেত না? নিয়মিত ভাবে মিড ডে মিলের চাল, ডাল, আলু, ছোলা থেকে শুরু করে সাবান, ওষুধ, খাতা, বই, ব্যাগ, জুতো– সমস্ত কিছু যেরকম নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গে বিতরণ করলেন শিক্ষকরা, সেভাবেই কি শিক্ষাসংক্রান্ত কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতিও অবলম্বন করা অসম্ভব ছিল?”

কলকাতার রামমোহন মিশন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সুজয় বিশ্বাসের মতে, স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মতামতই মানা উচিত স্কুল খোলার ব্যাপারে। তাঁর কথায়, “আমার মনে হয় বিধিনিষেধ মেনে স্কুল খোলা জরুরি। তবে এমন যেন না হয়, এমন কিছু শর্ত দিয়ে স্কুল খুলতে বলা হল, সে সব শর্ত সব স্কুল মানতে পারল না। আমাদের দেশের সব স্কুলের পরিকাঠামো ও পরিষেবা এক নয়। তাই এমন কিছু আরোপ করা উচিত নয়, যা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে শিক্ষকদের কাছে।”

বর্ধমানের এক সরকারি স্কুলের বাংলা শিক্ষক আবার বলছেন, খুব‌ই দ্বিধার সময় চলছে। স্কুল খোলা উচিত পড়ুয়াদের মানসিক, সামাজিক বিকাশের দিকে তাকিয়ে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যা, তাতে সিংহভাগ প্রথম প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে লেখাপড়া শেখার একমাত্র জায়গা স্কুলবাড়িটাই। “আমার মনে হয়, এখন স্কুলে যেতে না-পারা সব ছেলেমেয়ে‌রই জীবনের একটা শূন্যতার জায়গা তৈরি করল এই পরিস্থিতি। তবে কোভিডের আতঙ্কও ফেলে দেওয়া যায় না, এটা তো বাচ্চাদের জীবনের প্রশ্ন। সব মিলিয়ে দ্বন্দ্বে আছি।”– বললেন তিনি।

বগুলার শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক দেবত্র দে এই বিষয়ে বলছেন, “গত পনেরো মাসে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। টীকাকরণ প্রক্রিয়ায় গতি এনে ধাপে ধাপে খোলা হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনীয় সতর্কতার বিধি মেনেই চালু হোক স্বাভাবিক পড়াশোনা। অজানা আতঙ্ক অজান্তেই বাড়িয়ে তুলছে শিক্ষায় চলমান অসাম্যকে।”

পারমিতা মজুমদার হুগলির মান্দড়া বাদলচন্দ্র ঘোষাল বিদ্যামন্দিরের শিক্ষিকা এবং একইসঙ্গে এক খুদে ছাত্রেরও মা। পড়াশোনা ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের মানসিক এবং আচরণগত বিকাশেও যে স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, সে বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বললেন, “যদি এভাবেই করোনাভাইরাস জীবনের অঙ্গ হয়ে যায়, তবে অনন্তকাল স্কুল বন্ধ রাখা তো সমাধান নয়। আবার ছাত্রছাত্রীদের জীবন নিয়েও ঝুঁকি নেওয়া যায় না। তাই অবিলম্বে ছাত্রছাত্রীদের টীকাকরণের ব্যবস্থা করে এবং উপযুক্ত সতর্কতা মেনে স্কুল খোলা হোক।”

তবে পাশাপাশিই তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “সেক্ষেত্রে রেল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত পরিমাণে সচল রাখতে হবে যাতে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিরাপদে ও আরামে স্কুলে পৌঁছতে পারেন। বহু সরকারি স্কুলের শিক্ষকই বাড়ি থেকে যথেষ্ট দূরের স্কুলে পড়াতে যান। এই সব দিকই মাথায় রাখতে হবে।”

উত্তর কলকাতার এক বেসরকারি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রূপঙ্করের গলায় হতাশার ছাপ স্পষ্ট। সে বলল, “খুব মিস করি স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলো। সকালের প্রেয়ার থেকে ছুটির ঘণ্টা– ভীষণ মনে পড়ছে। অনলাইনে পড়তে প্রথম প্রথম খুব ভাল লাগছিল, মনে হচ্ছিল কী মজা। এখন আর ভাল লাগছে না। আমি স্কুলে যেতে চাই আগের মতো। মাস্ক পরব, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোবো, খুব সাবধানে থাকব। কিন্তু স্কুল খুলে যাক।”

দক্ষিণ কলকাতার ক্লাস এইটের ছাত্রীর মা লোপামুদ্রা মিত্র পাল বলছেন, গত প্রায় দেড় বছর ধরে বড় অংশের ছাত্রছাত্রী শিক্ষার আলো দেখতেই পাচ্ছে না ঠিকই। তবে আগে স্বাস্থ্য এবং বেঁচে থাকা, তার পরে পড়াশোনা। তাঁর কথায়, “ব্যক্তিগত ভাবে আমি আমার সন্তানকে অনলাইনে ক্লাস করাতে পারছি বলে হয়তো আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত। যদিও তার মানসিক স্বাস্থ্য যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মা হিসেবে আমি বুঝছি। তবে গোটা দেশের চিত্রটা তো এমন নয়। তাই সবদিক ভেবেই সচেতন অভিভাবিকা হিসেবে আমি বলব, এখনই গণহারে স্কুল না খুলে, সুচিন্তিত পরিকল্পনা করে ভ্যাকসিনেশনে জোর দিয়ে, নির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রকাশ করে তবেই ধাপে ধাপে স্কুল খোলা হোক।”

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.