ঢের হল, স্কুল খোলো

2

অমল সরকার

একে একে দেশের অনেক রাজ্যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (Education Institute)  খুলে গিয়েছে। খোলেনি এ রাজ্যে। কবে খুলবে, স্পষ্ট কোনও ঘোষণা নেই। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, পুজোর পর পরিস্থিতি বুঝে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, করোনা পরিস্থিতি কেমন থাকে, তৃতীয় ঢেউ আসে কি না, এলে পরিস্থিতি কতটা ওলটপালট হয়, এ সব বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত হবে।

তবে ইতিমধ্যে যে সব রাজ্যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে, সেখানে পড়ুয়া এবং শিক্ষকমণ্ডলীর হাজিরা বড় মুখ করে বলার মতো নয়। অনেক জায়গাতেই হাজিরা সামান্য। বোঝাই যাচ্ছে করোনা ভীতি এখনও বেশ প্রকোট।

এ রাজ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। লোকাল ট্রেন চালাতেও রাজ্য সরকার সম্মতি দেয়নি এখনও। তবে রেল স্টাফ স্পেশাল নাম দিয়ে নয় নয় করে ভালো সংখ্যায় লোকাল ট্রেন চালাচ্ছে। তাতে সাধারণ যাত্রীদের ওঠার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। তার জেরে ট্রেনগুলিতে গাদাগাদি ভিড়। ফলে লোকাল চালাতে রাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়া, নিছকই নিয়মরক্ষা। হাট-বাজারও স্বাভাবিক সময় পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাহলে লোকাল ট্রেন চালানোর আনুষ্ঠানিক অনুমতি মিলছে না কেন?

রাজ্য সরকারের নানা যুক্তির একটি হল, বয়স্করা বাইরে বেরলে বাড়িতে থাকা শিশু-কিশোররা সংক্রামিত হতে পারে। যুক্তিটি অকাট্য। কিন্তু সংশয় জাগে, এমন একটি বিপদ সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও দুয়ারে সরকার কর্মসূচিটি এখন কীভাবে চলতে পারে। যখন ভিড়ের কারণে সেখানে দূরত্ববিধির কোনও বালাই থাকছে না। লক্ষ্ণীর ভাণ্ডার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসনীয় একটি প্রকল্প। সেই প্রকল্পে নাম লেখাতে বাড়ির মহিলাদেরই শিবিরে ছুটতে হচ্ছে। শিশু কোলে বহু মহিলাই লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু কে না জানে সন্তানের দেখভালও মা’কেই বেশি করতে হয়। ফলে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শিবিরের উপচে পড়া ভিড়ের ছবিতে সরকারের রাজনীতির সওদা হয়। কিন্তু জনকল্যাণ হত, আশা কর্মীদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে লক্ষ্ণীর ভাণ্ডারের দরখাস্ত পূরণ এবং সেই সঙ্গে করোনা, ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং আরও নানাবিধ অসুখবিশুখের খবর নেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে।

তবে সংক্রমণ ছড়াবে বা ছড়াচ্ছে এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করা বা দুয়ারে সরকার, লক্ষ্ণীর ভাণ্ডার ইত্যাদির শিবির বন্ধ রাখতে বলা, এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং ঘরবন্দি দশা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা নিয়ে দু-চার কথা বলাই উদ্দেশ্য। কারণ, এমন তো নয় যে ২০২১-এর ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টায় করোনা বিদায় নেবে বলে কোনও চিকিৎসা বিজ্ঞানী অন্তত পূর্বাভাসটুকু দিয়েছেন। উল্টে দিন দিন করোনা নতুন রূপ ধারণ করে নিজের অস্তিত্ব জাহির করে চলেছে। এমন হওয়াও অসম্ভব নয় যে করোনা চলে গেল, এল আরও কোনও নতুন সংক্রামক ব্যাধি। আমরা কি একটা করে ভাইরাস আসবে আর সদলবলে জীবাণুর কাছে আত্মসমর্পণ করব? নাকি জীবাণুকে পাশ কাটিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপনের রাস্তার সন্ধান করব।

রাষ্ট্র এবং নাগরিকের এখন দ্বিতীয়টিই প্রধান কর্তব্য। কিন্তু সমস্যা হল, আমাদের মতো দেশে এই ব্যাপারে শেষ কথা বলার অধিকার কেবলমাত্র সরকারের। আর সরকারি সিদ্ধান্তের পিছনে জনকল্যাণের থেকে বেশি থাকে ভোটের অঙ্ক মেনে ভালোমানুষি। করোনা পরিস্থিতিতে সব সরকারই লোক দেখানো ভালোমানুষির রাস্তায় হাঁটছে। প্রয়োজন ছিল বরং সঙ্কট মোকাবিলায় নাগরিককে নতুন পথ-নির্দেশ দেওয়া।

কিন্তু সেই কাঙ্খিত রাস্তায় কোনও সরকারই হাঁটার সাহস দেখাতে নারাজ। কারণ, করোনা মোকাবিলার সাফল্য দাবি করে তারা দিবারাত্র যা বলে চলেছে তাতে দুধের চেয়ে জল বেশি থাকা অসম্ভব নয়। আর এই নির্মম সত্যটা জানা আছে বলেই তারা ভালো করার চেয়ে ভালোমানুষি করে জনমন জয়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

জনজীবন স্বাভাবিক করার প্রশ্নে সবচেয়ে আগে ভাবা দরকার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বাচ্চাদের স্কুলগুলি কীভাবে দ্রুত খোলা যায়। স্কুল মানে শুধু ক্লাসে হাজিরা, পড়ালেখা, পরীক্ষা নয়। বিশেষ করে শিশুদের কাছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য। বেড়ে ওঠার পথে পড়াশুনোর পাশাপাশি খেলাধুলো, নাচ-গান, হই-হট্টগোল, টিফিন কেড়ে খাওয়া, ঝগড়াঝাটি, ছোটখাটো আঘাত, এমনকী সহপাঠীদের মধ্যে মন কষাকষি, এসবই শৈশব জীবনের অঙ্গ। যা থেকে ভালো-মন্দ শিক্ষাটি দেওয়া সহজ, শিশু উপলব্ধিও করে অনেক সহজে।

কিন্তু দেড় বছর হতে চলল, তারা ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, ট্যাব, মোবাইলে চোখ মেলে বসে আছে স্কুল খোলার অপেক্ষায়। এর ফল শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বিঘ্ন ঘটছে তাই-ই শুধু নয়, নানা ধরনের মানসিক বিকারের শিকার হচ্ছে তারা। যার পরিনাম করোনা মহামারী জনিত পরিস্থিতির থেকেও যা ভয়ঙ্কর হতে পারে তাদের জীবনে। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে বিরাট সংখ্যক শিশু হয়ে উঠবে বোঝা।

আরও পড়ুনঃ মাঝ সমুদ্রে আটকে থাকা বিকল ট্রলার থেকে মৎসজীবীদের উদ্ধার

আবার প্রধানমন্ত্রী যখন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন ফেরি করছেন তখন অনলাইন শিক্ষার সুবাদে আমরা দারিদ্রকে যেন নতুন চেহারায় আবিস্কার করলাম। তিন দশক আগের যে উদার অর্থনীতির হাত ধরে ভারতবর্ষ আজ অনেকাংশে ঝলমলে, সেই নীতিই আমজনতার একাংশকে মূল স্রোত থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, প্রত্যন্ত বহু এলাকায় ইন্টারনেট নেই, স্মার্ট ফোন নেই। ফলে ৩৭ শতাংশ পড়ুয়া পড়াশুনো বন্ধই করে দিয়েছে।

এই একই বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা বিগত ১৭ মাসে শত শত সমীক্ষা হয়েছে। ফলাফল উনিশ-বিশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলি একদিকে আর্থিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়ল, সেই সঙ্গে শিক্ষার আঙিনা থেকে সরে যেতে হল তাদের সন্তানদের, যাদের সিংহভাগই পরিবারের প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। আবার সম্পন্ন পরিবারে ঘরে বসে অনলাইন ক্লাসে হাজিরা দিতে দিতে ক্লান্ত, সন্ত্রস্ত কয়েক কোটি শিশু দেখলই না স্কুল কাকে বলে, চিনলই না মাস্টার মশাই, দিদিমনি, সহপাঠীদের।

আর তাদের পড়াশুনোর মান? যে সমীক্ষার কথা একটু আগে বলেছি, দেশের ১৫টি বড রাজ্যে ১৪০০ পড়ুয়ার মধ্যে হওয়া সেই সার্ভেতে দেখা গিয়েছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ক্লাস থ্রি, ফোরের বহু ছেলেমেয়ে ‘দ্য স্কুল হ্যাজ বিন ক্লোজড এভার সিন্স দ্য প্যানডেমিক বিগান’—এই বাক্যটি মাতৃভাষায় তর্জমা করে বলতে পারছে না।

এই কঠিন পরিস্থিতির আসল কারণ দীর্ঘদিন স্কুলের সঙ্গে শিশুদের সম্পর্কের বিচ্ছেদ। কোভিড শুরু সময় আইসিএসই-সিবিএসই বোর্ডের যে শিশুটি ক্লাস ওয়ানে পড়ত সে এখন ক্লাস থ্রি-তে উঠে গিয়েছে। ঘরে বসে বসেই অচিরে ক্লাস ফোরে উঠে যাবে। এক শিক্ষা বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, এই ভাবে শৈশবেই শিক্ষার মানে প্রায় চার বছরের ফারাক তৈরি হয়ে গিয়েছে বিগত ১৭ মাসে। রাজ্য বোর্ডগুলির ক্ষেত্রেও চিত্রটা একই হওয়া স্বাভাবিক। এই শিশুদের সঙ্গে আর্থিক কারণে ড্রপ আউটের শিকার হওয়া ছেলেমেয়েদের শিক্ষার মানের কি ফারাক থাকছে? এমন পরিস্থিতিতে স্কুল বন্ধ রাখা হবে সব জেনে বুঝে শিশুদের শিক্ষা থেকেই আউট করে দেওয়া।

তাই করোনাবিধি মেনেই কীভাবে কালক্ষেপ না করে শিশুদের স্কুলে ফেরানো যায় তা নিয়ে গভীর ভাবনাচিন্তা জরুরি। যেমন, প্রাইমারি স্কুলের চার শ্রেণির পড়ুয়াদের দু-ভাগে এক দিন অন্তর আনা যেতে পারে। সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস ওয়ান এবং টু-র পড়ুয়ারা স্কুলের ঘরগুলিতে ভাগাভাগি করে বসল। বাকি তিনদিন এল ক্লাস থ্রি ও ফোর। এইভাবে সেকেন্ডারি স্কুলগুলিতেও অচিরেই ক্লাস শুরু করে দেওয়া যেতে পারে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
2 Comments
  1. […] আরও পড়ুনঃ ঢের হল, স্কুল খোলো […]

  2. […] আরও পড়ুনঃ ঢের হল, স্কুল খোলো […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.