হিমন্ত যে শর্তে মুখ্যমন্ত্রী, শুভেন্দু সেই শর্তেই বিরোধী দলনেতা হতে পারেন

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবিবার অসমে বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠকে সর্বসম্মতিতে নেতা নির্বাচিত হয়েছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। যার অর্থ অসমের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন হিমন্ত। এবং তাৎপর্যপূর্ণ হল হিমন্ত যে শর্তে মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন, সেই শর্তেই সম্ভবত বাংলায় বিরোধী দলনেতা হতে পারেন শুভেন্দু অধিকারী।
কী সেই শর্ত?
বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতার কথায়, তা হল রাজ্য স্তরে মজবুত নেতার হাতে সরকার বা সংগঠনের ভার দেওয়া। বাজপেয়ী জমানায় তেমনই ব্যবস্থা ছিল বিজেপিতে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দেশ। বহু বৈচিত্রে ভরা। সেখানে দিল্লি থেকে সবটা নিয়ন্ত্রণ করা বা চাপিয়ে দেওয়া যায় না বলেই অনেকের মত। বরং ঐতিহাসিক ভাবে দেখা গিয়েছে, কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীরা ছিলেন একেক রাজ্যে মজবুত সব আঞ্চলিক নেতার মতোই। পরবর্তী কালে কংগ্রেসের হাইকমান্ড সংস্কৃতি সেই আঞ্চলিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে বা খর্ব করে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনে। বিজেপিতেও নরেন্দ্র মোদী, শিবরাজ সিংহ চৌহান, বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া, বিসি খান্ডুরি, ইয়েদুরাপ্পা, রমন সিংরা মজবুত আঞ্চলিক নেতার মতোই ছিলেন। তাদের সমষ্টিগত শক্তিতে সর্বভারতীয় স্তরে শক্তিশালী হয়েছিল বিজেপি।
কিন্তু গত সাত বছরে দেখা যায়, মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফড়নবীশ বা হরিয়ানায় মনোহর খট্টর বা ঝাড়খণ্ডে রঘুবর দাসের মতো তুলনায় দুর্বলদের মুখ্যমন্ত্রী করেছেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ। যাঁদের রাজ্য রাজনীতিতে বিপুল কর্তৃত্ব ছিল না। বরং তাঁরা দিল্লির আলোয় আলোকিত ছিলেন। ফলে ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে বিজেপির বিপর্যয় হয়েছে। বিজেপির ওই কেন্দ্রীয় নেতার কথায়, দলও এখন বুঝতে পারছে যে রাজ্যস্তরে মজবুত মুখের প্রয়োজন। শুধু নরেন্দ্র মোদীর মুখ দেখিয়ে রাজ্যের ভোটে জেতা যাবে না বা সেখানে সংগঠন মজবুত করা যাবে না।
বস্তুত সেই কারণেই সর্বানন্দ সোনওয়ালের পরিবর্তে অসমে হিমন্তকে মুখ্যমন্ত্রী করেছেন মোদী-শাহরা। হিমন্ত শুধু অসমের মজবুত নেতা তাই নয় গোটা উত্তর-পূর্বে তাঁর প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি রয়েছে।
বিজেপির ওই কেন্দ্রীয় নেতা জানান, বাংলায় ভোটের সময়ে যে কেন্দ্রীয় নেতা বা পর্যবেক্ষকরা এসেছিলেন, ভোটের ফল প্রকাশের পর তাঁদের প্রায় সকলের মত নিয়েছেন জগৎপ্রকাশ নাড্ডা-অমিত শাহরা। তাঁরা প্রায় সকলেই শুভেন্দু অধিকারীকে বিরোধী দলনেতা করার সুপারিশ করেছেন। এঁদের অধিকাংশের ব্যাখ্যা হল, সংশয়াতীত ভাবেই শুভেন্দুর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক আধিপত্য রয়েছে। বাংলায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে তৃণমূল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর উচ্চতা ও মর্যাদা সবার থেকে বেশি। কিন্তু এও ঠিক যে সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামে পরাস্ত করেছেন শুভেন্দু। সেই সঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুরে তাঁর নিজের জেলায় এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সাতটি আসনে জিতেছেন। তা ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ সর্বত্রই তাঁর কমবেশি জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও। বাংলায় বিজেপির জনভিত্তি ধরে রাখতে এমন নেতৃত্বই প্রয়োজন।
বিজেপির আর এক কেন্দ্রীয় নেতার কথায়, এ বার বাংলায় নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বিজেপিকে তা হল, তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী পদ প্রার্থী কে? সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, রাজ্যস্তরে কোনও গ্রহণযোগ্য নেতা তৈরি করতে পারেনি দল। রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ অত্যন্ত পরিশ্রমী নেতা, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ ও দলের প্রতি একনিষ্ঠ। কিন্তু দিলীপবাবুও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য মুখ বলে নিজেকে তুলে ধরতে পারেননি। এমনকি এই ভোটেও দলের একাংশ নেতার সঙ্গে তাঁর তালমিলের অভাব স্পষ্ট ধরা পড়ে।
তবে বলে রাখা ভাল, বিজেপির অন্দরে যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে তার ভিত্তিতেই এই প্রতিবেদন। সোমবার বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠক হবে। তাতে পর্যবেক্ষক হিসাবে থাকবেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ভূপেন্দ্র যাদব। ওই বৈঠকে শুভেন্দুই বিরোধী দলনেতা হিসাবে নির্বাচিত হন কিনা এখন সেটাই দেখার।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More