মধুর, তোমার শেষ যে না পাই

অনুব্রতা গুপ্ত

বয়সের মাধুর্য্য তাঁকে আরও সুন্দর করেছে। গাল ভরে সাদা দাড়ির কার্পেটের আদরমাখা এই মানুষটার সাথে চোখাচোখি হলেই যেন আমার ভিতরে আড়াল করে রাখা, জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি, প্রেমিকের প্রতি একান্ত সব বারুদ দপ করে একবার জ্বলে উঠেই নিভে যায় অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে।

মাঝে মাঝে আমরা যেভাবে পালিয়ে বেড়াই মায়ের কাছ থেকে, পাছে মা ডাক দিলেই ঝরঝর করে বলে ফেলি সমস্ত গোপন ব্যাথা, রবীন্দ্রনাথও ঠিক তেমন একজন মানুষ আমার কাছে। মনের যে শরীর আছে, সে শরীরের জ্বর হলে, বা সে শরীর চলতে গিয়ে পড়ে গেলেই, ঠিক যাঁর পাশে এসে চুপটি করে বসতে ইচ্ছে হয়। সে যেন তার ম্যাজিক জোব্বার ভেতর থেকে এনে দেবে মনখারাপের ওষুধ , ঠান্ডা হাতের স্পর্শ। তবু আমি তাঁর অভাগী সন্তান।

 

অনেক আলোকবর্ষ দূরে ঝকঝকে আধুনিক শহর ব্যাঙ্গালোরের বিকেল উপভোগ করতে করতে , সিগারেটকেই মশাল ভেবে ঝলসে নিচ্ছি কোনো চোরা অভিমান। এই কর্পোরেট শহরে, বাকি সমস্ত দিনের মতোই খুব সাধারণ একটা দিন ২৫শে বৈশাখ। আমার দিনযাপনও সেই তালেই এগোয়। ছন্দপতন নেই। তবু কেন আজ হঠাৎ রান্না ঘর থেকে পেলাম পায়েস পোড়ার গন্ধ!

উন্মাদ কিশোরীবেলার পরে, মাঝের গোটা কয়েক বসন্ত পার করে, ট্রেনের কামরায় হঠাৎ দেখা আবার। অন্ধ উন্মাদনায় তখন আলোর তেষ্টা জমেছে অনেকটা। শিউরে উঠেছি অকস্মাৎ প্রশ্নবানে – ‘ আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে? ‘ ভীতু আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে সামনে গিয়ে অপরাধীর মতো জানান দিয়েছি – ‘ তুমি সেই যুবক যাকে দেব বলে বহু জন্ম আগে কুন্দ ফুলের মালা গেঁথে পদ্ম পাতায় ঢেকে এনেছি’।

সেই যুবকই আমার শৈশবের সহজপাঠ, কৈশোরের বলাকা, যৌবনের রক্তকরবী, মধ্য বয়সের শেষের কবিতা। বহুদিন পর আমরা আজ মুখোমুখী এই বিজন রাতে। জন্মদিনে কী উপহার দেব তোমায় ?

আলোকস্তম্ভের দীপ্তশিখার কাছ ঘেঁষে এলে বুঝি, এখনও কত অন্ধকারে আমাদের বসবাস। দিতে পারার মতো কিছুই নেই ধরা দেওয়া ছাড়া। না-হয় তাই দিলাম !

রবীন্দ্রনাথ সেই মানুষ, যাঁর জীবনবোধের অতলে শুধু ডুবেই যেতে হয় , উঠে আসা অসম্ভব। যাঁর অন্তর্যামী লেখনীর স্পর্শে, অদ্ভুত মুগ্ধতাবোধে মরে যেতে ইচ্ছে করে। রবি নামক অমৃতরস পান করে জন্ম জন্ম বেঁচে থাকার লোভ আমার। এই রবীন্দ্রনাথ আমার আজীবনের পরিত্রাতা। বিধাতা। বারবার ফিরে আসার নেশা।

ছবি: রৌদ্র মিত্র

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More