কোনও দিনই মৃত্যুকে পূর্ণচ্ছেদ হিসেবে দেখেননি

দীপেন্দু হালদার

অনেকেই হয়তো ক্ষুণ্ণ হবেন যে জন্মদিনে কেন মৃত্যু নিয়ে লেখা।

আসলে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও বেশ কিছু লেখা ভাল ভাবে পড়লে বোঝা যাবে আমরা মৃত্যুকে যেভাবে দেখি, যেভাবে বুঝি, রবীন্দ্রনাথ সেইভাবে দেখতেন না। তাঁর কাছে মৃতুটা কোনও কঠিন মর্মান্তিক পরিণতি ছিল না। তাই তিনি ভীষণ মৃত্যুসচেতন ছিলেন। ইংরাজিতে একটা প্রবাদ আছে, “Genius is a double edged sword.” এই তরবারির একদিক প্রতিভাধরকে উত্তরণের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, অন্য দিকে তার বিপরীত সুতীক্ষ্ণ দিকটা তাঁকে ক্রমাগত আঘাত করে চলে। রবীন্দ্রনাথও তরবারির দুই দিক সম্পর্কে সম্যক সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন সাহিত্য সরণীতে তিনি যতই এগিয়ে যান না কেন, দুঃখ বিচ্ছেদ, বেদনা, মৃত্যু তাঁকে ক্রমাগত তাড়া করে বেড়াবে। তাই তিনি জীবন দেবতার উদ্দেশ্যে প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পেরেছিলেন

“আরো আঘাত সইবে আমার সইবে আমারো

আরো কঠিন সুরে জীবন তারে ঝঙ্কারো”

বারবার তাঁর নানা লেখায় এসেছে মৃত্যু। যে মানুষ তাঁর আশি বছরের জীবনে এত এত কাছের মানুষদের মৃত্যু দেখেছেন, তাঁকে মৃত্যু আর কী ভয় দেখাবে? তিনি তো নিজেই বলেছেন তিনি “মৃত্যুঞ্জয়”। আর সেই কারণেই তিনি মহামানব।

যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় “তোমার অসীমে” গানটার কথা। গানটার কথাগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে রবীন্দ্রনাথ কোনওদিনই মৃত্যুকে এক পূর্ণচ্ছেদ হিসেবে দেখেননি। তিনি বরাবরই মৃত্যুকে এক লোক থেকে অন্য লোকে যাওয়ার দরজা হিসেবেই দেখে এসেছেন। তাঁর কাছে বরং জীবনটাই ছিল সীমারেখা, গণ্ডীতে আবদ্ধ, সসীম জগৎ। জীবন থেকে বেরিয়ে মৃত্যুজগতে পৌঁছলেই ঘটে অসীমে প্রবেশ। যেখানে দূরদূরান্ত পর্যন্ত গেলেও মেলেনা কোনও দুঃখ, বিষাদ, বিচ্ছেদ, মৃত্যু। এইটাই পরম প্রাপ্তি কবির কাছে।

তাঁর চিন্তায় মৃত্যুর ক্ষমতা সীমিত। মৃত্যুর একমাত্র ক্ষমতা মানুষকে মৃত্যুমুখে পতিত করা। দুঃখেরও ক্ষমতা একই। তাই কবি এই মৃত্যু বা দুঃখকে জীবন থেকে দূরে রাখতেই চেয়েছেন। কারণ স্বার্থপর জগতের কাজই হল নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকা। কবি তা চাননি।

মানুষের সারা জীবনের যত মহাজাগতিক সঞ্চয় অর্থাৎ সাফল্য, আনন্দ, সুখ সমস্তই অকৃত্রিম, অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু এগুলোই হারিয়ে ফেলার ভয় আমরা সবসময় পেয়ে থাকি। সেই ভয়টাই আমাদের জাগতিক সঞ্চয়। আমাদের অধিকার নেই সেই ‘ভয়’ ‘দুঃখ’কে নিয়ে মৃত্যুলোকে প্রবেশের।

জগৎ সংসারের চিন্তা দূর করতে পারলে তবেই সর্বশক্তিমানকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আরও একটা গানের কথা বলা যায়। ‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি’ এই গানটা। এই গানের কথাগুলোও পড়লেই বোঝা যায় যে মৃত্যুসচেতন কবি কখনওই মৃত্যুকে সমাপ্তি হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে মৃত্যু কেবল অরূপরতনের আধার এক মহাসমুদ্রে ডুব দেওয়া। সসীম জগৎ থেকে অসীমে প্রবেশ। কিন্তু মৃত্যু আসার আগে সবাই মৃত্যু থেকেই পালিয়ে বেড়ায়।

“হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়

ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায়”

এই ভয়টা থেকে মুক্ত হতে পারলে, তবেই মিলবে মরণোত্তর অমরত্ব।

আরও একটা দারুণ কথা এই গানটায় আছে। জীবদ্দশায় যে অমৃতসুর আমাদের অনুভূতির ঊর্ধ্বে থাকে, অমরলোকে সেই বীণারবই অবিরাম সুর তুলে চলে। সেই সুরের সঙ্গে নিজের সারাজীবনে অর্জিত সমস্ত সুর মিলিয়ে দিয়ে নীরব ঈশ্বরের চরণে অর্পণ করতে পারলে, তবেই সেই মৃত্যু হয় সফল, হয় অমর।

সবার শেষে যে গানটার কথা বলবো, আমার নিজের ভীষণই পছন্দের গান এটা। “আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে” গানটার কথাগুলো কত সুন্দর।

এই গানেও ওই একই বক্তব্য। রবীন্দ্রনাথ জীবনকে এক দুঃখের আধার হিসেবেই দেখেছেন। মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর দুঃখ তাঁর মতে সমানুপাত, কারণ মানুষ জীবনকালে নানান দুঃখজরায় আক্রান্ত হয় এবং চোখের জলে নিমজ্জিত হয় শ্রাবণবারিধারার মতো। এই জাগতিক দুঃখ সেদিনেই থামবে, যেদিন মানুষের জীবনবীণা থেমে যাবে। কারণ জীবনকালে উচ্ছ্বল বর্ষাবাতাসের মতোই মানুষের জীবনে দুঃখের প্রবাহ হতে থাকে।

তাঁর মতে আলোর অপর দিকেই যেমন থাকে অন্ধকার, তেমনই মানুষের জীবনও দ্বিমুখী স্রোতেই বয়ে চলেছে। জীবনবীণাতেও দুই তার, এক তারে বাজে জীবনসঙ্গীত তেমনই অন্য তারে মৃত্যুধ্বণি হাহাকার করে চলে। সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না পরস্পর বিপরীত এই দ্বৈত ধ্বণিগুলোই জীবনকে বেয়ে নিয়ে যায়। তাই তো তিনি অনায়াসে বলতে পারেন

“নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে”

এই জীবনবীণার মৃত্যুতার ছিন্ন হয় মানুষের জীবন বিয়োগে। আর তার পরেই আসে অসীম আনন্দধ্বনি। মেলে অফুরান আনন্দের চাবিকাঠি। যা মানুষকে মৃত্যুর পরেও অমর করে তোলে।

জীবনে চলার পথ অনায়াস, স্বচ্ছন্দ, অবাধ গতিতে সে এগিয়ে চলে। তার সরণিতে কোনও পূর্ণচ্ছেদ নেই। সরণের ‘আবরণ টুটে’ মরণও এই গতিপথকে রুদ্ধ করতে পারেনা। জীবনে চলার পথেই যেমন সুখ আছে, উল্লাস আছে, তেমনই সহযাত্রী হিসেবে দুঃখ বেদনাও আছে। মৃত্যুহীন জীবন অসম্পূর্ণ ভাবলে মরণের পর জীবনটাই যে তুচ্ছ হয়ে যায়। মৃত্যুতেই জীবনের পরিসমাপ্তি এটা কবি মানেননি। অথচ আমরা জন্মদিনকে যেভাবে পালন করি, মৃত্যুকে কি সেভাবে মেনে নিতে পারি? আমাদের কাছে জন্ম হয়েছে আপন, মৃত্যু হয়েছে পর। কিন্তু কবির কাছে জন্ম মৃত্যু দুইই সমান। জীবন যেমন পরম সত্য, মৃত্যুও তেমনই চরম বাস্তব। তাই জীবন মৃত্যুকে একসাথে বেঁধে তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে জীবনের সুর, নির্ভয়ের সুর, চরৈবেতির সুর।

ছবি: কুশল ভট্টাচার্য

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More