বিপদের সময় বন্ধু বন্ধুকে দেখবে না, তো কে দেখবে

মুকুলিকা চট্টোপাধ্যায়

ছোটবেলায় মা খুব গুনগুন করতেন। খুশি থাকলেই নিজের মনে গান গাইতেন। এখনও তাই গান। তবে সেটা অবশ্যই রবীন্দ্রসংগীত হয়। অন্য গান খুব কম গাইতে শুনেছি মা কে।

আমি ছোটবেলায় মা গান গাইলে খুব মন দিয়ে শুনতাম। আলাদা করে কখনো জিজ্ঞেস করিনি, এটা কার গান। আপনাআপনিই যেন জেনে গিয়েছিলাম, এটাকে রবীন্দ্রসংগীত বলে। যেমন আলাদা করে কখনও রবীন্দ্রনাথকেও চিনতে হয়নি। বিভিন্ন বইতে ছবি আর বাড়ির আলমারির তাকে দিদির আনা একটা আবক্ষ মূর্তিই আমার কাছে ছিল ‘রবীন্দ্রনাথ’। সে যে আসলে দুগ্গাঠাকুরের মত ঠাকুর ছিল না, সে বুঝতে অবশ্য সময় লেগেছিল বেশ। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার কাছে কবি, লেখক, বা গল্পকার কম। বন্ধু বেশি ছিলেন। ছিলেন আমার দাড়িবুড়ো, আমার বন্ধুবুড়ো।

আমার মামাবাড়ি বোলপুরের আগে একটা গ্রামে। বোলপুরেও প্রচুর আত্মীয়-স্বজন আছেন। তা সত্ত্বেও আলাদা করে কখনও আর পাঁচ জন গড়পড়তা বাঙালির মত আমি দোলে বসন্ত-উৎসবে বা পঁচিশে বৈশাখ শান্তিনিকেতন যাইনি। প্রয়োজনই পড়েনি কোনো দিন। শান্তিনিকেতন নিয়ে কোনো আদেখলামিও নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়েও না। থাকবে কী করে? তিনি তো আমার কাছে ছিলেন আমার দাড়িওয়ালা বন্ধুবুড়ো।

নাচ, গান বা আবৃত্তি কিছুই শিখিনি ছোট থেকে।অদ্ভুতভাবে তবুও সব অল্প অল্প করে সবই পারতাম এবং যখনই কোথাও নাচ, গান বা আবৃত্তি করার সময় আসত, আমি কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথকেই আঁকড়ে ধরে তরী পার করতাম। কারণ ওই যে, তিনি আমার বন্ধুবুড়ো। বিপদের সময় বন্ধু বন্ধুকে দেখবে না, তো কে দেখবে?

আস্তে আস্তে বড় হলাম। প্রেম এলো। সে প্রেমে ভেঙেও গেল। আমি কিন্তু মায়ের মত খুশী থাকলেই কেবল নয়, মন খারাপেও গান গাই। সে গান যে কেবল রবীন্দ্রসংগীত হয়, এমনটা নয় কিন্তু। অনেক পছন্দের গান থাকে। কিন্তু তার মধ্যেই একটা সময় গাইব না গাইব না করেও গেয়ে উঠি, “আমি তোমারও বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস…………….”

বন্ধুবান্ধবদের অনেককেই রবীন্দ্রনাথ নিয়ে পাগলামি করতে দেখি। সবাই যেন ভীষণ অবসেসড রবীন্দ্র ঠাকুরটিকে নিয়ে। আমি পারি না। কেবল মনে হয়, আলাদা করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভাবার সময় আমার নেই। সত্যিই নেই। কারণ ভাবতে হয় না। তিনি আমার বন্ধুবুড়ো। আমার সারা দিনের ভাবনায়, চেতনায়, কাজে, কর্মে কোথাও একটা তিনি চলেই আসেন। আমার কোনো আলাদা দিন হয় না রবীন্দ্রনাথের নামে। তবু সেই ছোটবেলায় মায়ের মুখে গান শোনা মেয়েটির মনে কোথাও একটা থেকে যান দাড়িওয়ালা বন্ধুবুড়ো।

আজকাল কত মানুষ তাঁকে নিয়ে কত কিছু করেন, লেখেন। তাঁর গল্প নিয়ে কত সিনেমা, তাঁর গান নিয়ে কত ভাঙা-গড়া, তাঁর কবিতা কোট করে কত প্রেম এগিয়ে চলে, এমনকী তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কত কাটাছেঁড়া চলে। তবুও রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের জায়গায় অটল। তাঁর ইমেজের কিচ্ছুটি হয়না। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো ইমেজই হয় না। রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটা আস্ত ইমেজের নাম।

তার পর কত শীত-বসন্ত যায় আসে। বসন্ত উৎসব আসে, আসে পঁচিশে বৈশাখ, আসে বাইশে শ্রাবণ। বাঙালি আবার চাঁদা তুলে স্টেজ বেঁধে পাড়ার লোককে নিয়ে অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে। চায়ের কাপে আবার তুফানের সাথে রবি ঠাকুর উঠে আসেন। প্রেম, ভালোবাসা, আহ্লাদ, আনন্দ, নিন্দেমন্দ, আদর এমনকী তর্কে বিতর্কেও রবীন্দ্রনাথ ঘুরে ঘুরে আসেন।

আমি এ সব পারিনা। এই অনুষ্ঠানগুলোয় ঘটনাচক্রে জড়িয়ে না পড়লে কোনো দিনও আলাদা করে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আদেখলাপনা করতে পারিনা। আমার কোথাও আর আলাদা করে সেই বন্ধুবুড়োর কথা মনেও আসে না। শুধু আজও মনখারাপ হলে সেই বাচ্চা মেয়েটা বেরিয়ে এসে জানলার পাশে বসে মনে মনে তার বন্ধুবুড়োর কোলে, তার দাড়িবুড়োর কোলে মাথা রেখে গান গেয়ে ওঠে বেসুরো গলায়…….”যদি আরও কারে ভালোবাসো, যদি আর ফিরে নাহি আসো। তবে তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও। আমি যত দুখ পাই গো।
আমারও পরাণ যাহা চায়………”।

তাই আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ মানে…..বন্ধুবুড়ো!

ছবি: অঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More