অনেকেই বলে, তোমার ঘরের লোক নাকি!

সুজয়নীল বন্দ্যোপাধ্যায়

এক বুড়ো ছিল। হ্যাঁ, যখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি; একটা গানের মধ্যে দিয়ে প্রথম নোটিস করি বুড়োকে, ‘আমার পরাণ যাহা চায়’।

বাংলার কোচিং-এ পড়তে গিয়ে মাধ্যমিকের সময় যে মেয়েটির ওপর প্রেমে আছড়ে পড়েছিলাম (এখন হলে হয়তো জেন-ওয়াইয়ের ভাষায় বলতাম, ক্রাশ খেয়েছি); তার পাত্তা না দেওয়া মনোভাবের মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে একদিন গানটা শুনি। পাগলের মতো ক্রাশ খেয়েছিলাম গানটার। একটা ভারী গলায় গানটা গলার কাছে কেমন যেন দলা পাকিয়ে ছিল বহুদিন। ছোটবেলায় শ্বাসকষ্ট ছিল; গান শিখতে এক্কেবারে বারণ ছিল আমার। মাধ্যমিকের পর বাড়িতে না জানিয়ে এক বন্ধুর বাড়িতে গান শিখতে যেতাম, তুলেছিলাম গানটা। ওটাই আমার বুড়োকে জানার শুরু। তার আগে বাকিদের মতোই ওই দূরের (‘ছোঁয়াচ পার হওয়া’ ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানতাম শুধুমাত্র কবিগুরু হিসেবে। ও হ্যাঁ, ‘এক বুড়ো ছিল’ বলার কারণ আর কিছু না; যখন ওঁকে প্রথম দেখি, তার বহুদিন আগে উনি মৌনব্রত নিয়েছেন, তাই ‘ছিল’।

ফেসবুকে আমার পছন্দের কোটে লেখা আছে, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। প্রায় তিন বছর ধরে এটা আমার কভার ফোটোতেও ছিল। কথাটা বললাম দেখনদারির জন্যে নয়। জীবনে এই একটা কথা বিশ্বাস করে চলতে গিয়ে কম অপমান কিংবা অবহেলা সহ্য করতে হয়নি! তবু বুড়োর এই কথাটার সঙ্গে বাবার মুখে বারংবার বলে চলা কথাটার ভীষণ মিল পাই, ‘সৎপথে থেকো, অন্ধকারেও পথ বেরোবে’। বাবাকে ঠিক যতটা মেনে চলি, ততটাই এই বুড়োকেও। আচ্ছা, ‘বুড়ো’ বলছি বলে অসুবিধা হচ্ছে না তো? বিশ্বাস করুন, সেই ছোটবেলা থেকেই বুড়োকে বুড়ো অবস্থার ছবিতেই দেখেছি। আর, ভেবে দেখুন তো, শিশুদেরও তো তাহলে বাচ্চা বলা যাবে না! যুবকদের যুবক!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলার চেয়ে রবিঠাকুরে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। অনেকেই বলে, তোমার ঘরের লোক নাকি? তাদের উত্তর দিই না, যেমনটা বাকি ক্ষেত্রে করি। মনে মনে জানি, বড় নামকে কাছের মানুষেরা ছোট করে নেয়, আমি কি তোমার কাছের নই? তুমি কি আমার কাছের নও নাকি বুড়ো? সেই তো কান্না এলে তোমার কাছে যাই, যে মুহূর্তে ভাষা পাইনা, তুমি সবটা অভিধানের মতো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। এফ. এম. গোল্ডে ভোরে যখন অনুষ্ঠান করতে যাই, তুমি বা তোমার গান ছাড়া উপায় থাকে নাকি! তাই আমার তুমিকে আমি যেভাবে খুশি সম্বোধন করবো, যেমন খুশি ভালবাসবো। সেদিনও যখন, ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতাটা পাঠ করে সবাইকে শুনতে বললাম, এত্তো এত্তো ভালবাসা ফেরত দিল এক মুহূর্তে। তুমিও নিশ্চয় শুনেছ। ভাল-খারাপ তো কোনওদিন কারও কিছুতেই বলতে শুনিনি, ভুলেও চুপ, ঠিকেও। সেই অসম্ভব মৌনব্রত।

যাইহোক, অনেক প্রশংসা করে ফেললাম; সুগার না হয়ে যায় তোমার। ‘লাগে রহো মুন্না ভাই’ ছবিতে যেমন সঞ্জয় দত্তের মাথার মধ্যে গান্ধীজী ঢুকে পড়েছিলেন। তেমনটা তুমিও মিশে গেছ; তাই সুগার হলে সেটা আমাকেও ঘিরে ধরবে। মুক্তি পাওয়া বড্ড শক্ত (চায়ই বা কে!)। শুধু এটুকুই বলব, ‘এক বুড়ো ছিল’ কথাটা বড্ড সেকেলে। তার চেয়ে বলি, এক বুড়ো আছে; সব সময় আছে।

ও হ্যাঁ, হ্যাপ্পি বাড্ডে…

ছবি: পল্লবী নন্দন

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More