ধ্বংস হয়েছে বার বার, তবুও যিশুর আঁতুড়ঘর আগলে রেখেছে ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’

বিধর্মীদের ধর্মস্থানটিকে নিয়ে কারা প্রবল বিক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু করেছিল!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

প্যালেস্টাইনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের উত্তরে আছে ‘নাব্লাস’। জেরুজালেম থেকে শহরটির দূরত্ব মাত্র ৪৯ কিলোমিটার, যার প্রাচীন নাম ছিল ‘ফ্লাভিয়া নিয়েপোলিস’। এই শহরেই ১০০ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নিয়েছিলেন ফ্লাভিয়াস জাস্টিনিয়াস। বিশ্ববিখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ, লেখক ও দার্শনিক। অত্যন্ত প্রতিভাবান এই মানুষটি, যৌবনে দার্শনিকদের তত্ত্বে ডুবে গিয়ে জীবনের জটিল ধাঁধাগুলির সমাধান খুঁজতেন। এভাবেই তিনি অ্যারিস্টটল, পিথাগোরাস ও প্লেটোর জটিল তত্ত্বগুলি সম্বন্ধে অবিশ্বাস্য জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

একদিন সমুদ্রের ধারে বেড়াচ্ছিলেন জাস্টিনিয়াস। বেড়াবার সময় আলাপ হয়েছিল এক বৃদ্ধ ব্যক্তির সঙ্গে। যাঁকে এলাকায় কখনও দেখেননি তিনি। জাস্টিনিয়াসকে বৃদ্ধ ব্যক্তিটি বলেছিলেন দার্শনিকদের জটিল তত্ত্বগুলির বিভিন্ন ত্রুটির কথা। তিনি জাস্টিনিয়াসকে বলেছিলেন, ঈশ্বর সংক্রান্ত ধাঁধার সমাধান এই পথে পাওয়া যাবে না। সমাধান পেতে গেলে জানতে হবে যিশুখ্রিস্টকে। প্রভু যিশুর দর্শন বুঝতে পারলে, সব সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব।

অচেনা বৃদ্ধের কথাগুলি তিরের মতো বিঁধেছিল ফ্লাভিয়াস জাস্টিনিয়াসের বুকে। বাইবেল জোগাড় করে পড়তে শুরু করে দিয়েছিলেন। পড়তে পড়তে জাস্টিনিয়াসের মনে হয়েছিল, বৃদ্ধের কথা সঠিক। অনেক বিখ্যাত দার্শনিক বাইবেলের কথাগুলোই যেন অন্যভাবে বলেছেন। তাই তিরিশ বছর বয়সে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ফ্লাভিয়াস জাস্টিনিয়াস। হয়ে গিয়েছিলেন খ্রিস্টান ধর্মের প্রথম যুগের অন্যতম সেরা যুক্তিবাদী ধর্মযোদ্ধা।

ফ্লাভিয়াস জাস্টিনিয়াস

বেথলেহেমের চুনাপাথরের গুহা

জেরুজালেম থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে আছে বেথলেহেম নামে এক রুক্ষ পাহাড়ি এলাকা। সেখানকার পাহাড়ে ছিল এক চুনাপাথরের গুহা। খ্রিস্টিয় প্রথম শতক থেকেই চুনাপাথরের গুহাটি পরিচিত ছিল ‘নেটিভিটি গ্রোটো’ নামে। স্থানীয় মানুষরা বিশ্বাস করতেন, সেই গুহাতেই জন্ম নিয়েছিলেন প্রভু যিশু। তবে পবিত্র গুহাটিকে নিয়ে বিতর্ক লেগেই থাকত।

কারণ মিশরীয়রা দাবি করত, গুহাটি মিশরের মেষপালক দেবতা তাম্মুজের জন্মস্থান। এই বিতর্কের মধ্যেই, ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে, রোমান সম্রাট ‘হাদ্রিয়ান’ দখল করে নিয়েছিলেন চুনাপাথরের গুহাটি। সৌন্দর্য ও কামনার রোমান দেবতা অ্যাডোনিসের মন্দির বানিয়ে ফেলেছিলেন গুহাটিকে। এভাবেই একের পর এক ঢেউ এসেছিল, গুহাটি থেকে প্রভু যিশুর নাম চিরতরে মুছে ফেলার জন্য।

বেথলেহেমের পাহাড়ে একটি গুহা। এরকমই এক গুহায় জন্ম নিয়েছিলেন প্রভু যিশু।

রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ফ্লাভিয়াস জাস্টিনিয়াস। ১৬০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অকাট্য যুক্তি দিয়ে জাস্টিনিয়াস প্রমাণ করে দিয়েছিলেন বেথলেহেমের চুনাপাথরের গুহাটিই ছিল প্রভু যিশুর আঁতুড়ঘর। তবে তাঁকে প্রমাণের বিনিময়ে দিতে হয়েছিল প্রাণ। খ্রিস্টান ধর্ম ছেড়ে জাস্টিনিয়াসকে রোমান দেবতার পুজো করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোমানদের কাছে মাথা নত করেননি ফ্লাভিয়াস জাস্টিনিয়াস। রোমের সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের আদেশে ১৬৫ খ্রিস্টাব্দে জাস্টিনিয়াসের মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়েছিল। ফ্লাভিয়াস জাস্টিনিয়াস খ্রিস্টানদের কাছে হয়ে গিয়েছিলেন ‘সেন্ট জাস্টিন দ্য ম্যাট্রিয়ার’।

শুধু ‘সেন্ট জাস্টিন দ্য ম্যাট্রিয়ার’ নন, ‘নেটিভিটি গ্রোটো’ নিয়ে লিখে গিয়েছিলেন প্রথম যুগের খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক ‘অরিগেন অফ আলেকজান্দ্রিয়া’ (১৮৫–২৫৪ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি লিখে গিয়েছিলেন, “বেথলেহেমে একটি গুহা খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। যেখানে তিনি (যিশু) জন্ম নিয়েছিলেন এবং তাঁকে ঘোড়ার জিন তৈরির কাপড়ে মুড়ে, গুহায় থাকা পশুদের পানপাত্রে রাখা হয়েছিল।”

গুহার মধ্যে ভূমিষ্ঠ হলেন যিশু

পবিত্র গুহাটির ওপর গড়ে উঠেছিল একটি গির্জা

রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন দ্য গ্রেট বা প্রথম কনস্টানটাইনের মা ফ্লাভিয়া জুলিয়া হেলেনা (সেন্ট হেলেনা), ৩২৬ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন জেরুজালেমে। তিনি জেরুজালেমের বিশপ মাকারিওসকে নিয়ে বেথলেহেমের গুহাটিকে দেখতে গিয়েছিলেন। গুহার অন্ধকারে হেলেনা অনুভব করেছিলেন প্রভু যিশুর উপস্থিতি। ভাবাবিষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন হেলেনা। সেই খবর পৌঁছে গিয়েছিল রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন দ্য গ্রেটের কাছে।

গুহাটিকে মাটির নিচে সুরক্ষিত রেখে গুহাটির ওপর একটি গির্জা বানানোর আদেশ দিয়েছিলেন সম্রাট। বিশ্বের নানা জায়গা থেকে দামি পাথর, কাচ, মোজাইক টালি ও কাঠ সংগ্রহ করা হয়েছিল। গির্জা তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে, শেষ হয়েছিল ৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে। যিশুর আঁতুড়ঘরের ওপর মাথা তুলেছিল খ্রিস্টানদের পবিত্রতম গির্জা ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’। সুবিশাল ও সুরম্য গির্জাটিকে, ৩৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে, জনগণের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হলেও, যাযাবর খ্রিস্টানরা ৩৩৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই আসতে শুরু করেছিলেন গির্জাটিতে।

ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে অসংখ্যবার

বিধর্মীদের ধর্মস্থানটিকে নিয়ে প্রবল বিক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু করেছিল সামারিয়ার (বর্তমানে মধ্য ইজরায়েলের) অধিবাসীরা। দু’বার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল গির্জাটিকে। প্রথমবার আগুন লাগানো হয়েছিল ৫২৯ খ্রিস্টাব্দে। পুড়ে যাওয়া গির্জাটি ৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় তৈরি দিয়েছিলেন বাইজেন্টাইন সম্রাট ‘প্রথম জাস্টিনিয়ান’।

ধ্বংস হয়ে যাওয়া আটকোণা গির্জাটির অবশিষ্ট অংশকে সযত্নে সংরক্ষিত করে, তার ওপরে গড়ে তোলা হয়েছিল ক্রুস আকৃতির নতুন গির্জাটি। নতুন গির্জাটিতেও আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল ৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। এই আক্রমণে সামারিয়ার অধিবাসীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ইহুদিরাও। প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’। স্থানীয় খ্রিস্টানদের চেষ্টায় একশ বছর পর আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল গির্জাটি।

ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষে পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় খসরু আক্রমণ করেছিলেন প্যালেস্টাইন। দখল করে নিয়েছিলেন জেরুজালেমও। খ্রিস্টানদের একের পর এক ইমারত ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলেছিল পারস্যের সৈন্যদল। একসময় পারস্যের সেনারা দখল করে নিয়েছিল বেথলেহেম শহর। কিন্তু ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’ অকল্পনীয়ভাবে বেঁচে গিয়েছিল ধ্বংসের হাত থেকে। জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, গির্জার প্রবেশপথের ওপরে থাকা একটি ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর সেনাপতি শাহরবারজ। ছবিটি ছিল তিনজন খ্রিস্টান যাজকের, যাঁদের গায়ে ছিল পারস্যের পোশাক।

নবম শতাব্দীতে বহু অর্থ খরচ করে গির্জাটির পুনর্নিমাণ করেছিলেন, অ্যাংলো স্যাক্সন রাজা ‘আলফ্রেড দ্য গ্রেট’। কিন্তু কয়েক শতাব্দী পরেই ইসলামের অনুসারীদের সঙ্গে ইউরোপের খ্রিস্টানদের ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড শুরু হয়েছিল। ক্রুসেডের সময় অসংখ্যবার আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়েছিল গির্জাটিকে।

তবুও গির্জাটি নিজেদের দখলে রেখেছিলেন ক্রুসেডারেরা। গির্জা ও সংলগ্ন এলাকাটির ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়েছিলেন তাঁরা। নিজেদের রাজ্যাভিষেকের জন্য, ১১০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’ ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন জেরুজালেমের ক্রুসেডার রাজারা। ফলে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছিল গির্জাটি। সারা বিশ্ব থেকে দলে দলে আসতে শুরু করেছিলেন খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীরা।

আক্রমণের ঢেউ গির্জার ওপর আবার আছড়ে পড়েছিল ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে। খারেজমিয়া সাম্রাজ্যের সুন্নিরা আক্রমণ করেছিল গির্জাটি। গির্জার সুদৃশ্য ছাদটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, যা সারানো হয়েছিল প্রায় দুশো বছর পর। বারগান্ডি সাম্রাজ্যের রানি ১৪৪৮ খ্রিস্টাব্দে সারিয়ে দিয়েছিলেন গির্জাটির ভাঙা ছাদ। বারগান্ডি সামাজ্য দিয়েছিল কাঠ এবং ভেনিস দিয়েছিল শ্রমিক।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে গির্জাটি দর্শন করতে এসেছিলেন ইতালির জিয়োভানি মারিতি। তিনি দেখেছিলেন গির্জার দেওয়াল থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে দামি মার্বেল। খবর নিয়ে জেনেছিলেন, মার্বেলগুলি লাগানো হয়েছে মিশরের সুলতানের কায়রোর প্রাসাদে। আক্রমণ এসেছিল প্রকৃতির দিক থেকেও। ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হওয়া কয়েকটি প্রবল ভূমিকম্পে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল গির্জাটি।

গির্জার দেওয়ালে মধ্যযুগে তৈরি সোনালি রঙের দামি মোজাইক টালি লাগানো ছিল। সেইসব টালি, গির্জার ভেতরে থাকা জিনিসপত্র ও দামি পাথর খুলে নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল জেরুজালেমের হার হাবাইয়াত বা হারাম আশ-শরিফ (মন্দির পাহাড়)- এর ইমারত নির্মাণে।শুনশান হয়ে গিয়েছিল বারো হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে থাকা ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’।

অশান্তির আগুন লেগেছিল যিশুর আঁতুড়ঘরেও

পবিত্র গির্জাটিকে বারবার ভাঙবার চেষ্টা করা হলেও, এ পর্যন্ত হাত পড়েনি গির্জাটির নীচে থাকা পবিত্র গুহাটির ওপর। কিন্তু সেই পবিত্রতম স্থানেও হানা দিয়েছিল অশান্তির কালো মেঘ। গুহাটির অধিকার নিয়েও অশান্তি শুরু হয়েছিল গ্রিক অর্থডক্স, রোমান ক্যাথলিক ও আর্মেনিয়ান অ্যাপোলিস্টিকদের মধ্যে।

পবিত্র গুহাটির মেঝের মার্বেল পাথরের ওপর বসানো ছিল একটি রুপোর তারা। প্রভু যিশু ঠিক যেখানে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, সেই স্থানটিতে রাখা ছিল তারাটি। চোদ্দকোণা তারাটি গায়ে লাতিন ভাষায় লেখা ছিল, “এই স্থানে যিশুখ্রিস্ট জন্ম নিয়েছিলেন ভার্জিন মেরির গর্ভে -১৭১৭”। রুপোর তারাটিকে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে যিশুর আঁতুড়ঘরে বসিয়েছিলেন রোমান ক্যাথলিকেরা।
যিশুর আঁতুড়ঘরের ওপর থেকে রোমান ক্যাথলিকদের আধিপত্য কমানোর জন্য, গ্রিক অর্থডক্স শাখার সন্ন্যাসীরা ১৮৪৭ সালে তারাটিকে গুহা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।

এই সেই  গুহা। ভেতরে সেই চোদ্দকোণা তারা। এই স্থানেই ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন প্রভু যিশু।

শুরু হয়েছিল চরম অশান্তি। গির্জাটি তখন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। ক্যাথলিকদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য, ১৮৫২ সালে অটোমান সম্রাটের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ান। বাধ্য হয়ে অটোমান সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন, গুহা ও সংলগ্ন এলাকাটির মালিক হল ফ্রান্স। পবিত্র গুহাটির ভেতরে রুপোর তারাটিকে আবার বসিয়ে দিয়েছিলেন অটোমান সম্রাট।

এই সিদ্ধান্তে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল রাশিয়া। সেনা পাঠাবার হুমকি দিয়েছিল। তাই অটোমান সম্রাট আবার সিদ্ধান্ত পালটে গ্রিক অর্থডক্স শাখার সন্ন্যাসীদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন গুহা সহ গির্জাটির অধিকার। কিন্তু তাতেও মেটেনি অশান্তি। কারণ এই অশান্তি পক্ষান্তরে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদ বলে থাকেন, ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলা ক্রিমিয়া যুদ্ধে ইন্ধন যুগিয়েছিল এই ঘটনাটি।

খ্রিস্টানদের পবিত্রতম গির্জা ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’।

ক্রিসমাস ইভে মেতে ওঠে যিশুর আঁতুড়ঘর

আজ ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’ পরিচালনা করে গ্রীক অর্থডক্স চার্চ। পরিচালনার কাজে সাহায্য করে রোমান ক্যাথলিক ও আর্মেনিয়ান অ্যাপোলিস্টিক চার্চ। ক্রিসমাস ইভে (২৪ ডিসেম্বর) ক্যাথলিকেরা ‘মিডনাইট মাস’ পালন করেন। টেলিভিশনের মাধ্যমে বেথলেহেমের সেই অনুষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বেথলেহেমে ‘মিডনাইট মাস’।

২৪ ডিসেম্বর রাত বারোটা বাজার আগে বেথলেহেমের দামাস্কাস তোরণে এসে পৌঁছন জেরুজালেমের গ্রিক অর্থডক্স চার্চের প্রধান বিশপ। গ্রিক অর্থডক্স, রোমান ক্যাথলিক ও আর্মেনিয়ান অ্যাপোলিস্টিক শাখার যাজকরা ‘ক্যারল’ গাইতে গাইতে বিশপকে নিয়ে আসেন বেথলেহেমের ম্যাঞ্জার স্কোয়ারে। সেখানে বিশপের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন সারা বিশ্ব থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ।

চার্চ অফ নেটিভিটির সঙ্গে জুড়ে থাকা ক্যাথলিকদের সেন্ট ক্যাথরিন চার্চে প্রথমে প্রবেশ করেন বিশপ। সেখানে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেওয়ার পর বিশপ প্রবেশ করেন চার্চ অফ নেটিভিটিতে। এই সময় বিশপের কোলে থাকে ফুটফুটে একটি শিশুর মূর্তি। গির্জাটির দরজা উচ্চতায় বেশ ছোট হওয়ায় গির্জায় প্রবেশ করতে হয় মাথা নিচু করে। তাই বুঝি দরজাটির নাম ‘ডোর অফ হিউমিলিটি’। গির্জার প্রধান বেদীর পাশের সিঁড়ি দিয়ে বিশপ ধীরে ধীরে নেমে যান গির্জার নিচে থাকা হালকা আলোয় ভরা পবিত্রতম গুহায়।

বিশপের কোলে শিশু যিশুর মূর্তি।

দৈর্ঘ্যে ১২ মিটার ও প্রস্থে ৩ মিটার আয়তনের গুহাটিতে থাকা পাথরের কুলুঙ্গিটির দিকে এগিয়ে যান বিশপ। কুলুঙ্গিটির মেঝেতে বসানো আছে সেই চোদ্দকোণা রুপোর তারাটি। কুলুঙ্গিটির ছাদ থেকে ঝুলছে ১৫টি রুপোর বাতি। খ্রিস্টান ধর্মের প্রধান তিনটি শাখার আলো ছড়িয়ে চলেছে এই ১৫টি বাতি। এর মধ্যে ৬টি বাতি গ্রিক অর্থডক্সদের, ৪টি ক্যাথলিকদের, ৫টি আর্মেনিয়ান অ্যাপোলিস্টিকদের।

প্রার্থনা মন্ত্র পড়তে পড়তে কোলে থাকা শিশু যিশুর মূর্তিটিকে বিশপ ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখেন চোদ্দকোণা তারাটি ওপর। টেলিভিশনের পর্দায় সেই দৃশ্য দেখে আনন্দে চিৎকার করে ওঠেন সারা বিশ্বের ২২০ কোটি খ্রিস্টান। বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে যায় পবিত্র ক্রিসমাস উৎসব।

আরও পড়ুন: এমন নাকি দেখতেই ছিলেন না যিশুখ্রিষ্ট! বিজ্ঞান এঁকে ফেলল আসল ছবি, চমকে গেল বিশ্ব

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More