ক্যানিং মহকুমা জুড়ে পানীয় জলের সংকট, প্রভাব পড়তে পারে ব্যালটে

দ্য ওয়াল ব্যুরো, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: সামনে ভোট, তাই শাসক-বিরোধী সকলের মুখে এখন শুধুই উন্নয়নের বুলি। তবে উন্নয়নের ডালি সাজালেও এবার আর সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলির মানুষের মন গলবেনা। এখন তাঁদের একটাই দাবি, অঞ্চল থেকে পানীয় জলের অভাব দূর করুক সরকার। দাবি পূরণ না হলে ভোট বয়কটেরও ডাক দিয়েছে গোটা গ্রাম।

করোনা মধ্যেই আমফানের দাপট সামলেছেন ক্যানিং এলাকার মানুষ। এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে অঞ্চল। কিন্তু গরম পরতেই শুরু হয়েছে পানীয় জলের সংকট। ক্যানিং মহকুমায় এখনও একাধিক প্রান্তে সবচেয়ে বড় ইস্যু পানীয় জলের সমস্যা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার সংকট মেটাতে পাইপ লাইনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয়জল দেওয়ার পরিষেবা চালু করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেগুলি শুধুমাত্রই দেখনদারি। এলাকার সমস্ত গ্রামে এখনও পর্যন্ত সেই পাইপ লাইন পৌঁছয়নি।

এদিকে গ্রামের পুকুরগুলি প্রায় শুকিয়ে যেতে বসেছে। খাবার জল, চাষ-আবাদ, শৌচকর্ম, সমস্ত কিছুর জন্য জলের জোগান মেটায় ওই পুকুরগুলি। এখন সেগুলির ওপর নির্ভর করা যাচ্ছেনা। এছাড়াও সরকারী যে সমস্ত নলকূল রয়েছে, তাতে এক লিটার জল তুলতে হিমশিম খেতে হয়। ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমে গিয়েছে, সেখান থেকে জল উঠতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যায়। আর তাই বেশি ব্যবহারে অধিকাংশ নলকূল অকেজো হয়ে পড়েছে।

ক্যানিংয়ের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পালের বক্তব্য, বাড়িতে জল তোলার জন্য মোটর বসানো ছিল। দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস হল মোটর চালিয়েও জল উঠছে না। প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকে খাবার জল নিয়ে আসতে হয়।

অন্যদিকে, দিঘীরপাড় পঞ্চায়েতের উত্তর কোড়াকাঠি গ্রামে একটি মাত্র সরকারী পানীয় জলের নলকূপ রয়েছে। এলাকার প্রায় ৫০০ পরিবার ওটির উপর নির্ভরশীল। সেখানেও পানীয় জলের আকাল চলছে। ওই গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম কুমার সা গ্রামের সিংহ ও নাইয়া পাড়ায় এখন পাইপ লাইনের জল ঢোকেনি। নেই কোন নলকূপও। ফলে এলাকার বাসিন্দাদের কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানীয় জল আনতে হয়। স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান,বিডিওকে জানানো সত্বেও এখনও কোনও সুরাহা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে গ্রামের প্রতিটি পরিবারের গণস্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে। একই অবস্থা ক্যানিংয়ের গোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হেড়োভাঙ্গা,মহেন্দ্রমোড়,বদুকুলা,নলিয়াখালি,সহ এলাকার বিভিন্ন গ্রামগুলোর। স্থানীয়দের দাবি, খাবার জলের তো অকাল রয়েছেই, তা ছাড়া শৌচকর্মের জন্য রয়েছে জলের অভাব। ইটখোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের উত্তর রেদোখালি গ্রামে প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করেন। তাঁরা এবার জলের দাবিতে ভোট বয়কট করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

অন্যদিকে গোসাবা,বাসন্তী ব্লকের বিভিন্ন গ্রামেও চলছে জলের হাহাকার। সেখানেও পানীয় জলের জন্য প্রায় তিনচার কিলোমিটার পথ হেঁটে জল আনতে যেতে হচ্ছে স্থানীয়দের। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, খাবার জলের জন্য ৫০ লিটার জল কিনছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়।

তাই জল সংকট এবার ভোট বাক্সে প্রভাব ফলবে সেকথা কার্যত স্বীকার করেছেন অঞ্চলের শাসক দলের বহু নেতানেত্রী। এই জল সংকট না মিটলে ক্যানিং মহকুমা নির্বাচনে ভরাডুবি মুখোমুখি হতে পারে শাসকদল, এমনই মতামত স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেরও। তাতে লাভবান হতে পারে বিরোধীরা।

তবে বিষয়টি নিয়ে শাসকদলের দাবি, ‘গরমে জলস্তর কমে যাওয়ায় এমন জল সংকট তৈরি হয়েছে। তবে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে পাইপ লাইনের বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং যে সমস্ত এলাকায় পাইপ লাইনের জল পৌঁছায়নি, সেখানে খুব দ্রুত গতিতে কাজ চলছে।’

কিন্তু কেন এমন জল সংকট? এবিষয়ে এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, অত্যধিক হারে জলের অপচয় এর প্রধান কারণ। তারপর খরা চাষের জন্য এলাকায় প্রচুর পরিমাণ শ্যালো বসানো হয়, তাতে এলাকার জলস্তর কমে গিয়ে নলকূপ গুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। শুকিয়ে যাচ্ছে খাল বিল পুকুরও। একই সঙ্গে অরণ্য ধ্বংস কেও জলসংকটের জন্য দায়ী করেছেন তাঁরা। এছাড়া প্লাস্টিক ব্যবহার সুন্দরবন অঞ্চল ও লাগোয়া এলাকাকে দূষিত করছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এলাকায় প্লাস্টিকের পাহাড় জমছে। ফলে, এই প্লাস্টিকের জন্যও আগামী দিনে জল সংকট আরও ভয়ংকর হয়ে দেখা দেবে। এই সমস্ত কারণগুলি নিমূর্ল না করলে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে হয়তো ১০০ টাকা লিটার প্রতি দাম পানীয় জল কিনতে হতে পারে সুন্দরবন এলাকার মানুষকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More