অন্যের মিছিলে ইট ছোড়া আবার কেমন রাজনীতি

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। কিন্তু কোনও দল যদি ১০ বছর সরকারে থাকে, সম্ভবত এই প্রবাদ তাদের মনে থাকে না।

আমাদের রাজ্যে পরপর দু’বার বিরোধীদের মিছিলে ইট ছোড়ার ঘটনা ঘটল। প্রথমবার ইটবৃষ্টির শিকার হয়েছিলেন বিজেপির সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা। গত ডিসেম্বরে ডায়মন্ডহারবারের ওপর দিয়ে যখন তার কনভয় যাচ্ছিল, তখন গাড়ি লক্ষ্য উড়ে আসে ইট। দ্বিতীয়বার ইট ছোড়া হল দক্ষিণ কলকাতায় বিজেপির মিছিলে। মিছিলে ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী, সদ্য তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতা শুভেন্দু অধিকারী প্রমুখ।

তৃণমূলই যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, শুভেন্দুবাবু ক্যারিশম্যাটিক নেতা। তাঁর দল ছাড়ার ধাক্কা সামলাতে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামে গিয়ে সভা করতে হয়েছে। শুভেন্দুবাবুর ওপরে কারও অভিমান, রাগ, ক্ষোভ থাকতেই পারে। তা অমূলক নয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভিমান, ক্ষোভ প্রকাশেরও পদ্ধতি রয়েছে।

‘আর নয় অন্যায়’ স্লোগান দিয়ে টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশন থেকে রাসবিহারী মোড় পর্যন্ত মিছিল করেছিল বিজেপি। মিছিল টালিগঞ্জ ফাঁড়ি পেরোনর সময়েই বোঝা যাচ্ছিল, অশান্তি হতে পারে। প্রথমে চারু মার্কেটের কাছে গলি থেকে চার-পাঁচজন মিছিল লক্ষ্য করে ইট ছোড়ে। তাদের হাতে ছিল তৃণমূলের পতাকা। তাদের দিকে মিছিলের কয়েকজন দৌড়ে যায়। মিছিল থেকেও ইট ছোড়া হয়। মুদিয়ালির এক পেট্রল পাম্পের কাছেও দু’পক্ষের ইট ছোড়াছুড়ি হয়।

বিজেপির মিছিলে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা হয়তো জানতেন, তাঁদের দিকে ইট ছোড়া হতে পারে। তাই প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলেন।

সোমবারের ঘটনা একটা বিপজ্জনক ইঙ্গিত দিচ্ছে। যারা বিরোধীদের মিছিলে হামলা করতে গিয়েছিল, তারা একেবারে বেপরোয়া। টিভি ক্যামেরার সামনে বুক চিতিয়ে অন্যায় করছে।

প্রশ্ন হল, পুলিশ তাদের কিছু বলল না কেন? মিছিলের জন্য পুলিশের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। সেই মিছিলে যদি কেউ আক্রমণ করে, তা কি পুলিশেরও ব্যর্থতা নয়?

তৃণমূল নেতারা বলছেন, তাঁদের কেউ ইট ছোড়েনি। বরং বিজেপির লোকই মিছিল থেকে বেরিয়ে এসে মারপিট, ভাঙচুর করেছে। মানুষ কি বোকা? শাক দিয়ে মাছ ঢাকলে কেউ দেখতে পাবে না। সবই তো লাইভ দেখা গিয়েছে বৈদ্যুতিন ও ডিজিটাল মাধ্যমে।

সোমবার নন্দীগ্রামে সভায় তো কেউ ইট ছোড়েনি। আমরাই শুধু মিছিল, মিটিং করব, আর কাউকে করতে দেব না, এ আবার কেমন মানসিকতা? আর কয়েকমাস পরেই রাজ্যে ভোট। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে নিশ্চিত। তার আগে এই বেপরোয়া মনোভাব, ঢিল ছোড়া ইত্যাদিতে কোথাও কি দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে না?

দলের নেতারা তাদের বারণ করছেন না কেন? তাঁরা কি নিচুতলার কর্মীদের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন? তাহলে তো আরও বিপদ। ভোটের আগে নৈরাজ্য দেখা দেবে। রাজ্যের নানা জায়গায় গন্ডগোল হবে। রাজনৈতিক কর্মীরা তো বটেই, নিরীহ মানুষও অশান্তির শিকার হবেন।

বাংলায় রাজনৈতিক সন্ত্রাস নতুন নয়। আগের জমানাতেও মানুষ দেখেছে। তার পর এক সময়ে তিতিবিরক্ত হয়ে তার জবাব দিয়েছে। বরং মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই স্লোগান–‘বদলা নয় বদল চাই’। তা হলে দশ বছর রাজ্য শাসনের সুযোগ পাওয়ার পর, ভোটের আগে কেন এই পিছনের দিকে হাঁটা?

একটা কথা মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যত বিঘ্নিত হবে, তত পিছিয়ে যাব আমরা। মেরে ধরে কেউ ক্ষমতা দখল করতে সফল হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো যাবে না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More