পুরুষতন্ত্রের ক্রিজে পা রেখে ছক্কা হাঁকিয়েছে মেয়েরা, এদেশের মহিলা ক্রিকেটের সেই অজানা ইতিহাস

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ এক অদ্ভুত দেশ, যেখানে ‘ক্রিকেট’ শব্দটা আর নিছক একটা মাঠ আর ব্যাট পিচ উইকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্রিকেট তারকাদের প্রায় দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয় এই দেশে। কিন্তু আজও, এই বিংশ শতাব্দীতেও ‘ক্রিকেট’ শব্দটাকে ঢেকে রেখেছে একটা আশ্চর্য পুরুষতান্ত্রিক খোলস। অস্বীকার করবেন! আচ্ছা, ক্রিকেট বললেই আপনার চোখে যে ছবি ভেসে ওঠে, সত্যি করে বলুন তো, তার মধ্যে একটিও নারী মুখ আছে কি?

অথচ আমাদের অগোচরেই এদেশের অসংখ্য নারী ক্রিকেটের জার্সি গায়ে দিয়ে মাঠে নেমেছে। শুধুমাত্র ক্রিকেটকে ভালোবেসেই তাঁরা পা রেখেছেন খেলার ময়দানে। বছরের পর বছর ধরে দেশে বিদেশে অজস্র টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন, দাঁতে দাঁত চেপে লড়েছেন, জিতেছেন, দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। অথচ তাঁদের মুখই ঢেকে আছে অন্ধকারে। আজও দেশের মহিলা ক্রিকেটারদের কজন’কে চিনি আমরা! এ দেশে পুরুষ ক্রিকেটারদের যে জনপ্রিয়তা তার ধারেকাছে যাওয়া তো দূর, খুব কম মানুষই নাম জানেন এই মহিলা ক্রিকেটারদের। অথচ ক্রিকেটের প্রতি তাঁদের ভালোবাসায় যেমন কোনও খামতি নেই, তেমনই এই খেলাকে ভালোবেসে জীবনে বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাঁরা।তারপরও অবজ্ঞা আর হতাশার অন্ধকারে ডুবে আছে গত পঞ্চাশ বছরের এ দেশের নারী ক্রিকেটের নীরব ইতিহাস!

১৯৭০এর গোড়ার দিকে প্রথম কয়েকজন উৎসাহী মহিলা ক্রিকেটকে ভালোবেসে হাতে ব্যাট তুলে নিলেন ভারতে। অবশ্য একেই এ দেশের নারী ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক সূচনা ভেবে বসলে ভারি ভুল হবে। কিন্তু শুরুরও তো শুরু থাকে। সেই সলতে পাকানোর কাজটাই শুরু হল ১৯৭০এ। মেয়েরাও যে ছেলেদের মতো ক্রিকেট খেলতে পারে, সে ধারণা জনমানসে তৈরি হতেই লেগে গেল বেশ কয়েক বছর। এরপর ১৯৭৩ সালে লক্ষ্ণৌয়ে মহেন্দ্র কুমার শর্মার উদ্যোগে স্থাপিত হয় এদেশের প্রথম ‘উয়োম্যানস ক্রিকেট এসোসিয়েশন'(ডব্লিউসিএআই), যার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন বেগম হামিদা হাবিবুল্লাহ। সেকালের অনেক উদীয়মান মহিলা ক্রিকেটারের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল এই প্রতিষ্ঠান।

১৯৭৩ এই আন্তর্জাতিক মহিলা ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্যপদ পায় ডব্লিউসিএআই। সেসময় বছরে ১২ মাসই প্র‍্যাকটিসের সুযোগ ছিল না মহিলা ক্রিকেটারদের। বছরে ন’মাস খেলাধুলো চলত। অস্বীকার করার উপায় নেই ১৯৭০-৭৩ এই তিনবছরে দেশের মেয়েদের মধ্যে ক্রিকেট খেলার ইচ্ছে বেড়েছিল বহুগুণ। এর অনেকখানি কৃতিত্বই ‘ডব্লিউসিএআই’য়ের প্রাপ্য। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ১৯৭৩ এর এপ্রিল মাসে প্রথম মহিলা ইন্টারস্টেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল পুনেতে। সেই খেলায় মহারাষ্ট্র, বম্বে আর উত্তরপ্রদেশ এই তিনটে দল অংশ নেয়। অথচ সে বছরই শেষের দিকে বারাণসীতে আয়োজিত দ্বিতীয় ইন্টারস্টেট প্রতিযোগিতায় দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটে৷

হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে মেয়েরা উজ্জীবিত হচ্ছিল। সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরাও ব্যাট বল হাতে এসে দাঁড়াচ্ছিলেন ক্রিজে। এরপর তৃতীয় ইন্টার স্টেট খেলাটি হয় কলকাতায়। ততদিনে ডব্লিউসিএআইয়ের কার্যনির্বাহী কমিটিতেও ঘটে গেছে বড়সড় রদবদল। সভাপতির পদে এসেছেন শ্রীমতী চন্দ্র ত্রিপাঠী এবং শ্রীমতী প্রমীলাভাই চন্দন। ভারতের মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে এই দুই নারীর অবদান অনস্বীকার্য।

রানি ঝাঁসি ট্রফি হোক, বা ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী ট্রফি, একটার পর একটা টুর্নামেন্টে সাহসের পরিচয় দিচ্ছিল মেয়েরা৷ কোন দল জিতল সেটা বড় কথা নয়, সামগ্রিকভাবে জয় হচ্ছিল নাছোড়বান্দা জেদ আর অধ্যাবসায়ের। জয় হচ্ছিল মহিলা ক্রিকেটের। ঘরোয়া স্তরে বছর পাঁচেকের এইসব কৃতিত্বের পর ১৯৭৫ এ প্রথম দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজের আয়োজন করা হয়। দিল্লি, পুনে আর কলকাতার মাঠে সেই প্রথমবার এদেশের মেয়েরা খেলতে নামল অস্ট্রেলিয়ার অনুর্ধ্ব ২৫ টিমের বিরুদ্ধে। মজার ব্যাপার সেই সিরিজে তিনটে আলাদা আলাদা টেস্টের জন্য তিনজন আলাদা অধিনায়ক নির্বাচন করা হয়। উজ্জ্বলা নিকম, সুধা শাহ আর শ্রীরূপা বোস। অস্ট্রেলিয়া সিরিজ খেলে মেয়েদের মনের জোর তখন তুঙ্গে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের পর একে একে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গেও ঘরোয়া মাঠে খেলার অভিজ্ঞতাও হল।

বিদেশের মতো স্কার্ট নয়, ক্রিকেট ইউনিফর্ম হিসাবে বরাবর ট্রাউজারেই স্বচ্ছন্দ ছিল এ দেশের মেয়েরা। ঘরোয়া সিরিজের দুবছর পর ১৯৭৮ এর বিশ্বকাপ ওয়ান ডে’তে আত্মপ্রকাশ করল আত্মবিশ্বাসী নারী ক্রিকেট টিম ‘উইমেন ইন ব্লু’। নীল সেই ইউনিফর্ম আজও এদেশের মেয়ে ক্রিকেটারদের গর্ব। ১৯৭৮এ ভারতে আয়োজিত সেই মেগা ইভেন্টে সেবছর অংশ নিয়েছিল চারটি দল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড আর ভারত। প্রথম ওয়ান ডে ম্যাচটাই হয়েছিল ১৯৭৮ এর পয়লা জানুয়ারি আমাদের কলকাতার ইডেন গার্ডেনে। বিপক্ষে ছিল ইংল্যান্ডের মহিলা ক্রিকেট টিম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচেই হার হয় ভারতের। এই টুর্নামেন্টের পর মেয়েদের মনোবল তলানিতে ঠেকেছিল ঠিকই, কিন্তু এত সহজে হার মানার প্রশ্নই ওঠেনা। শুরু হল নতুন উদ্যমে প্র‍্যাকটিস। অনেক সংগ্রাম আর কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৯৫ এ নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ান ডে সিরিজে জয় ছিনিয়ে নিলো আমাদের দেশের মেয়েরা।

১৭ বছর, খুব দীর্ঘ সময় কী! যেদেশের মেয়েদের সাক্ষরতার জন্য বহু পথ পাড়ি দিতে হয়, আধপেটা খেয়ে বাড়ির কাজ সামলে ইস্কুলে যেতে হয়, লাঞ্ছনা আর হতাশার বুক চিরে উঠে দাঁড়াতে হয়, সেদেশের মেয়েদের জন্য ১৭ বছর খুব বেশি সময় নয়। ঘরে বাইরে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পৃথিবীর ক্রিকেট মানচিত্রে নিজেদের জায়গা করে নিতে পেরেছে এদেশের মেয়েরা আর এই লড়াইয়ের পথে মাইলস্টোনের মতো জেগে আছে শান্তা রঙ্গস্বামী, ডায়ানা এডুলজি, সুধা শাহ, সন্ধ্যা আগরওয়ালদের নাম। মহিলা ক্রিকেটে তাঁদের অবদানের চিহ্নস্বরূপ ভারত সরকার এই চারজনকের অর্জুন পুরস্কারে সম্মানিত করেছেন। এমন অনেক মেয়ের অনেক সংগ্রাম জড়িয়ে আছে এদেশের মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসের সঙ্গে, যা আমরা আজও জানিনা।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More