বাঁচা-মরার খবরে সেতুবন্ধন করেন তাঁরা, কোভিডযোদ্ধা শুভাঙ্গী-দিশাদের কান্না চাপা পড়ে যায় শত মৃত্যুর হাহাকারে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: “ম্যাডাম, প্লিজ একটা অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করে দিন, সকাল থেকে বডি পড়ে রয়েছে, অপেক্ষা করছি আমরা!” কম্পিউটারে চোখ বুলিয়ে, কয়েকটা ফোনকল সেরে ‘ম্যাডাম’ উত্তর দেন, “দশটা মিনিট দিন, শ্মশান থেকে ফিরছে একটা অ্যাম্বুল্যান্স। তার পরেই আপনারা…”

সারাদিন ধরে হাজার জনকে এমন হাজারটা উত্তর দেওয়ার পরে প্রতিবারই চোখ ভিজে আসছে ডক্টর শুভাঙ্গী দাওরের। নিজেকে লুকোতে হচ্ছে কাজের আড়ালে। সকাল আটটা থেকে দুপুর তিনটের ডিউটি আওয়ার্সে এমন মুহূর্ত যে কতবার আসছে! মুম্বইয়ের কোভিড যোদ্ধা শুভাঙ্গীর কথায়, “আমার কোথাও পালানোর নেই। আমি এখন স্বপ্নেও শুধু মৃত্যুসংবাদ শুনি, মানুষের স্বজন হারানোর কান্না শুনি।”

বছর দুয়েক আগে ডেন্টাল সার্জারি পাশ করে চিকিৎসক হয়েছিলেন শুভাঙ্গী। প্র্যাকটিসও শুরু করেছিলেন, সুন্দর গোছানো একটা কেরিয়ার গড়ে তুলছিলেন শ্রম, সময় দিয়ে। কিন্তু গত আট মাসে সব বদলে গেছে। ২৫ বছরের শুভাঙ্গী সরকারি কাজের দায়িত্ব পেয়েছেন। এমন এক পোস্টে তাঁর কাজ, সে পোস্টে কেউ বসতেই চান না। শুভাঙ্গী বসেছেন। দিনভর কোভিড রোগীদের মৃত্যুর হিসেব করা এবং সেই দেহগুলি সৎকারের জন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়াই তাঁর কাজ।

শুধু তাই নয়, মুম্বইয়ের দহিসার এলাকায় নির্মিত কোভিড জাম্বো সেন্টারে এই ডিউটি করার পাশাপাশি তাঁর আরও কাজ হল, রোগীদের সঙ্গে তাঁদের বাড়ির লোকেদের ভিডিও কলে কথা বলানোও। বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে, কে কেমন পরিস্থিতিতে আছেন দেখে, বাড়ির লোককে কল করেন তিনি। কখনও দেন ভাল খবর, কখনও স্ক্রিনের ওপারের মানুষটিকে ভেঙে পড়তে দেখেন। আবার কখনও হয়তো ফোনের ওপারে দেখা মানুষটিকেই পরে ফোন করতে হয়, প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে!

গলা ভাঙার উপায় নেই। চোখের জলকে জায়গা দেওয়ার সময় নেই। কাজ তো কাজই!

প্রতিদিন হাজারো রোগীর ভিড় এভাবেই সামলাচ্ছেন শুভাঙ্গী দাওরে ও তাঁর মতো আরও কয়েক জন অফিসার। তাঁরাই এখন রোগী ও রোগীর পরিবারের ‘সেতু’। কোভিড সেন্টারের এক অফিসারের কথায়, “ওঁরা বেশিরভাগই কমবয়সি ডাক্তার। ভাল ডিগ্রি আছে সবার। এই কাজটা ইমোশনালি খুবই চ্যালেঞ্জিং। এ জন্য প্রফেশননাল ট্রেনিং নিতে হয় অনেক সময়। কিন্তু ওঁরা এমনিই এ কাজটি করে চলেছেন নিরন্তর।”

শুভাঙ্গী বলছিলেন, দিন তিনেক আগেই সাংঘাতিক ভেঙে পড়েছিলেন মানসিক ভাবে। “কান্না থামাতে পারছিলাম না আমি। কাজটা ছেড়েই দেব ভেবেছিলাম। কোনও ভাবে গত বছরটা বেরিয়েছিলাম, কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকে যা পরিস্থিতি হয়েছে, কোনওভাবেই যেন পেরে উঠছি না। এত মৃত্যু, এত অসহায়তা…!”

শুভাঙ্গীর মতোই একই কথা বলছিলেন ২৮ বছরের দিশা সাহা। পেশায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক দিশাও ওই একই সেন্টারের কর্মী। ৯ মাস ধরে এই কাজই করছেন। “আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন হল, কমবয়সি কোনও রোগীর মৃত্যুর কথা বাড়ির লোককে জানানো। এখন এতটাই শক্ত হয়ে গেছি, বৃদ্ধ কোনও মানুষের মৃত্যু হলে তা হয়তো নাড়া কম দিচ্ছে। কিন্তু ছোটদের জন্য আমার গলা ভেঙে যায় ফোনে খবর দিতে গিয়ে। আর এ সংখ্যা রোজই বাড়ছে। চার বছরের ছোট্ট সন্তানের মৃত্যুসংবাদ মাকে ফোন করে দেওয়া কতটা কঠিন বলুন তো! আমরা তো কখনও করিনি এই কঠিন কাজ!”– বলেন তিনি।

শুভাঙ্গী আরও বলছিলেন, “দুই মেয়ের দেহ প্লাস্টিকে মোড়া, সামনে বসে কাঁদছেন মা। আমিই খবর দিয়েছিলাম। এই নিয়ে সেই রাতে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আমি একের পর এক ফোন করছিলাম, পেপার ওয়ার্ক করছিলাম। সারা রাত এটাই চলছিল। ওই রাতে এক দম্পতি ভর্তি হলেন। কয়েক ঘণ্টা পরেই মারা গেলেন স্বামী। স্ত্রীকে খবর দেওয়া হয়নি। উনি স্বামীর মুখটাও দেখতে পাননি শেষ সময়ে।”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More