রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৭

বন্ধ্যা বলে একঘরে করেছিল সমাজ! আট হাজার সন্তানের মা হয়ে পদ্মশ্রী পেলেন সেই থিম্মাক্কা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা!

এ দেশের নারীদের কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে, এই বাক্য এখনও হরহামেশা শুনতে পাওয়া যায়। একটু রক্ষণশীল পরিবারের অন্দরে কান পাতলেই ফিসফিস করে সন্তানধারণের চূড়ান্ত নিদান। আর এই ধরনের রক্ষণশীলতা যদি একটি-দু’টি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের হয়, তা হলে যে তা সভ্যতার শরীরেই মারাত্মক অসুখ ডেকে আনবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! এই অসুখেরই শিকার হয়েছিলেন কর্নাটকের থিম্মাক্কা। পুত্র বা কন্যা দূরের কথা, বিয়ের ২৫ বছর পরেও কোনও সন্তানই হয়নি তাঁর। আর সেই ‘অপরাধে’ তাঁকে একঘরে করে দেয় সমাজ। কিন্তু দমে যাননি থিম্মাক্কা। এই সামাজিক সংকীর্ণতা ভেঙে খানখান করে, মা হয়ে উঠেছেন আট হাজার সন্তানের! আর সেই অপার সন্তানস্নেহই তাঁকে এনে দিল পদ্মশ্রী পুরস্কার!

গর্ভধারণ করতে না পারলে নাকি নারী পূর্ণতা পান না– এই প্রচলিত ধারণার কোপে পড়ে জীবনটা শেষ হতে বসেছিল কর্নাটকের গুব্বি তালুকের বাসিন্দা বেকাল চিক্কাইয়া এবং তাঁর স্ত্রী থিম্মাক্কার। থিম্মাক্কার উপরেই সমাজের রোষ ছিল বেশি। কারণ বন্ধ্যা নারীর স্থান নেই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সেই গ্রাম্য এলাকায়!

থিম্মাক্কার তেমন পড়াশোনা ছিল না। নিজস্ব জমিজায়গাও ছিল না তাঁর স্বামী চিক্কাইয়ার। তাই গ্রামের আর পাঁচটা গরিব পরিবারের মতোই দিনমজুর শ্রমিক হিসেবে কাজ করে রুটিরুজি চালাতেন তাঁরা। কিন্তু সমাজের দুর্ব্যবহারের মাত্রা যেন ক্রমেই বাড়ছিল। শুধু একঘরে করে রাখাই নয়, কাজের জায়গাতেও কারণে-অকারণে আক্রমণ ও ব্যঙ্গের মুখে পড়তেন থিম্মাক্কা ও চিক্কাইয়া।

হঠাৎই এক দিন ঠিক করেন, এর জবাব দিতে হবে। এই অহেতুক অপমান সারা জীবন সওয়া যায় না। বন্ধ করতে হবে সকলের মুখ। এমন কিছু করতে হবে, যাতে ফিকে হয়ে যায় মা না-হতে পারার অক্ষমতা। সমাজের বিরুদ্ধে যেন এক রকম প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে থিম্মাক্কার। তবে সে প্রতিশোধ ক্ষতিকারক নয়, বরং বেশ ইতিবাচক।

থিম্মাক্কা ঠিক করেন, সন্তান নেই তো কী হয়েছে, তিনি গাছ লাগাবেন। আর তাদেরই বড় করবেন সন্তানসম স্নেহে। দেখিয়ে দেবেন, মাতৃত্ব মানে কেবল নিজের শরীরের ভিতরে একটি ভ্রূণ ধারণ করা নয়, মাতৃত্ব মানে কেবল নিজের শরীরের ভিতর থেকে জন্ম দেওয়া একটা মানবসন্তান নয়। মাতৃত্ব মানে অপত্য। মাতৃত্ব মানে নতুন এক প্রাণের যত্ন।

যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। সে আজ থেকে প্রায় ছ’দশক আগের কথা। প্রথম বছরে ১০টি বট গাছ লাগালেন থিম্মাক্কা। বাড়ি থেকে চার কিলোমিটার দূরে, একটি খালি জায়গায় গিয়ে গাছগুলি লাগালেন তিনি। ওই ১০টি গাছই তাঁর প্রথম সন্তান। পরের বছরে সেই সংখ্যাটা হল ১৫, তার পরের বছরে ২০। তিন বছরের মাথায় ৪৫টি সন্তান নিয়ে ভরা সংসার হল থিম্মাক্কার।

এক সময় এই সন্তানদের দেখাশোনার জন্য দিনমজুরির কাজও ছেড়ে দেন চিক্কাইয়া। তিনি সারা দিন গাছেদের সঙ্গেই থাকতেন। আর থিম্মাক্কা দিনমজুরের কাজ করে রোজগার করতেন, বাড়ি ফিরে স্বামীর সঙ্গে সন্তানদের দেখভাল করতেন।রোজ চার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গাছগুলিতে জল দিয়ে আসতেন তাঁরা। গরু-ছাগলের হাত থেকে চারাগাছগুলিকে বাঁচাতে কাঁটাতারের বেড়াও বানিয়ে দেন দু’জনে মিলে।

থিম্মাক্কার নিজের গ্রাম হুলিকাল থেকে কুদুর অবধি মোট ২৮৪টি বটগাছের চারা লাগিয়ে বড় করেন তিনি। প্রায় চার কিলোমিটার পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াময় সুবিশাল গাছগুলি থিম্মাক্কার ভালোবাসারই নিদর্শন, বলেন পথচারীরাও।

১৯৯১ সালে মারা যান চিক্কাইয়া। তার পরেও একলা লড়াই চালিয়ে যান থিম্মাক্কা। একাই রইলেন গাছ-সন্তানদের পরিচর্যায়। একঘরে, একলা হয়ে যাওয়া থিম্মাক্কার মনের জোর কিন্তু এতটুকু টাল খায়নি। এক সময়ে থিম্মাক্কার কাজে মুগ্ধ হয়ে, তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়ে, গ্রামবাসীরাই তাঁকে ‘সালুমারাদা’, বলে ডাকতে শুরু করেন। কন্নড় ভাষায় সালুমারাদা শব্দের অর্থ, ‘গাছেদের সারি’। তাঁকে একঘরে করে রাখা গ্রামবাসীরাই ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, সন্তানের জন্ম দিতে না পারলেও, নিঃশব্দে অনেক বড় এক ধারণার জন্ম দিয়েছেন থিম্মাক্কা। জন্ম দিয়েছেন আস্ত এক অরণ্যের!

স্থানীয়দের মাধ্যমেই তাঁর কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৯৬ সালে ‘জাতীয় নাগরিক সম্মান’ পান তিনি। তার পরে তাঁর কথা জানতে পারে গোটা দেশ। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থাও এগিয়ে আসে তাঁকে সাহায্য করতে। বর্তমানে থিম্মাক্কার গাছগুলির দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে কর্নাটক সরকার নিজেই।

থিম্মাক্কা বলেছিলেন, নিজের সন্তানদের নিজে প্রতিপালন করতে পারলেই তিনি খুশি হতেন। কারণ কখনওই কারও সাহায্য চাননি তিনি।

১০৬ বছর বয়সি এই বৃক্ষমাতার কোলে এখন প্রায় আট হাজার সন্তান বড় হচ্ছে। তাদের জন্যই এ বার পদ্মশ্রী সম্মানের পালক জুড়ল থিম্মাক্কার মুকুটে। পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের কারণেই পদ্মশ্রী পেলেন তিনি।
Shares

Comments are closed.