‘ফুটবলের মৃত্যু’, ‘ফুটবলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’, সুপার লিগ নিয়ে শোরগোল বিশ্বজুড়ে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নব্বই মিনিট ছুঁইছুঁই। শীতে জুবুথুবু ওল্ড ট্র‍্যাফোর্ডের প্রতিটি কোণে বসে থাকা সমর্থকেরা রেফারির শেষ বাঁশি বাজার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। খেলার ফল তখনও ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ১- ০ পোর্তো। হঠাৎ শেষ মুহূর্তে ফ্রিকিক পেল পোর্তুগিজ ক্লাবটি। তারপর হাওয়ায় ভেসে আসা বল জোরালো শটে জালে জড়িয়ে দিলেন কস্টিনা। ম্যাচশেষের দৃশ্য এখন ফুটবল সমর্থকদের চোখে ভেসে ওঠে। হতভম্ব ম্যান ইউয়ের ‘রেড আর্মি’। গোটা মাঠজুড়ে যেন শ্মশানের নীরবতা। পিন পতনের শব্দ শোনা যাবে! আর সেই নৈঃশব্দ্যকে দুয়ো দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে টাচলাইন বেয়ে ছুটে চলেছেন কোট গায়ে পোর্তোর ম্যানেজার… ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’… জোসে মোরিনহো। দ্য বিউটিফুল গেম-এর বিনোদনকে যিনি কয়েক দশক ধরে ভরিয়ে তুলেছেন।

এটা তো একটা দৃষ্টান্ত মাত্র। কিন্তু শেষের রেলিগেশন-যুদ্ধ হোক, কিংবা খেতাব ঘরে তোলার লড়াই। ইউরোপের ক্লাব ফুটবল মানেই পরতে পরতে উত্তেজনা, সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই। যেখানে মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে অঘটন। অবনমন নিশ্চিত জেনেও ইংল্যান্ডের ক্লাব, ওয়েস্ট ব্রমউইচ আলবইন, ৫ গোলে বিধ্বস্ত করতে পারে খেতাবের দাবিদার চেলসিকে। আবার দিন দুই পরেই চেলসির মারকাটারি কৌশলে বাজিমাত হয় ধুরন্ধর ম্যাঞ্চেস্টার সিটি।

এ সবই পুরোনো কথা৷ জানা বিষয়। কিন্তু এবার চেনা ছবিই হয়তো বদলে যেতে চলেছে। নেপথ্যে ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগ’। যা বনেদি ক্লাব প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগকে টক্কর দিতে উঠে আসছে। ইতিমধ্যে খাতায় নাম লিখিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ, এসি মিলান, ইন্টার মিলান, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, চেলসির মতো খান বারো ‘বিগ বয়েজ’। এই একঝাঁক দলের পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফাউন্ডিং ক্লাব’। কিছুদিনের মধ্যে আরও তিনটি ক্লাব প্রতিযোগিতায় যোগ দেবে বলে খবর। বারো যোগ তিন। মোট পনেরোটি ক্লাব উদ্বোধনী মরশুমে মাঠে নেমে পড়বে।

দলগুলির তরফে খবর, তারা আপাতত চ্যাম্পিয়নস লিগে অংশ নেবে না। নয়া টুর্নামেন্টে সপ্তাহের মাঝামাঝি কোনও দিন বেছে ফুটবলের যুদ্ধ লড়বে। উল্লেখ্য, মঙ্গল ও বুধ— সপ্তাহ এই দু’দিন চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচগুলিও অনুষ্ঠিত হয়। সুতরাং, সম্মুখ-সমরের সলতেটা আগেভাগেই পাকিয়ে রাখছে সুপার লিগ!

কিন্তু এই প্রতিস্পর্ধী লড়াইয়ের নেপথ্যে কারা রয়েছে? খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে এক মার্কিন ব্যাঙ্কের নাম— জেপি মর্গ্যান। ফাউন্ডিং ক্লাবগুলিকে হাতে রাখতে ইতিমধ্যে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার ঢালার ঘোষণা করেছে তারা। যদিও প্রকাশ্যে জানানো হয়েছে, করোনার জেরে ক্লাবগুলির আর্থিক পরিকাঠামো ধসে পড়েছে। তাদের ঢেলে সাজাতে এই আর্থিক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত।

একই বুলি আওড়েছে অংশগ্রহণকারী ক্লাবগুলি। ঘোষিত বিবৃতিতে তারা একযোগে জানিয়েছে, ‘দুনিয়াজুড়ে মহামারীর আঁচ ইউরোপীয় ফুটবলের আর্থিক ভিতকে ভয়ঙ্করভাবে আঘাত করেছে। তা ছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে আমরা চেয়েছিলাম, ক্লাব প্রতিযোগিতা আরও বেশি উত্তেজক হোক, তার ধার ও ভার— দুই-ই যেন সমানভাবে বাড়ে। এক বছর নয়। প্রতি বছর৷ তাই এই নয়া ফর্ম্যাটের চিন্তাভাবনা।’

অর্থাৎ, আড়ালে আবডালে যাবতীয় পরিকল্পনা এতদিন নিশ্চিন্তে বেড়ে চলেছিল। কিন্তু তার এভাবে গোকুলে শ্রীবৃদ্ধির আঁচ কেউই টের পাননি। যদিও আর্সেনালের প্রাক্তন ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার ২০০৯ সালেই একটা সংকেত দিয়ে রেখেছিলেন। বিখ্যাত দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আর্সেন জানান, ‘আমার মনে হয় আসছে ১০ বছরের মধ্যে অনেক এলিট ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন লিগে নাম লেখাবে। এর কারণ, উয়েফা যত অর্থ বিনিয়োগ করে, সেটা ক্লাবগুলোর চাহিদা মেটানোয় যথেষ্ট নয়।’

তাহলে বিষয়টা দাঁড়াল, খেলার নন্দন, টানটান উত্তেজনা, যুযুধান কোচের ট্যাকটিক্সের লড়াই— এসবই এখন অলীক! পুরোটাই ছড়ানো টাকা লুটেপুটে নেওয়ার খেলা। নিজেদের আইন, নিজেদের ফরমান, নিজেদের বিনোদন। পুরোটাই ‘আমিত্বে’ ঢাকা! তাতে সমর্থক এমনকী খেলোয়াড়দেরও কী এল-গেল, তার ধার ধারছেন না কেউই!

এতেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন গ্যারি নেভিল, রিও ফার্দিনান্দের মতো পোড়খাওয়া ফুটবলারেরা। কেউ বলছেন ‘ফুটবলের মৃত্যু…’, কেউ তকমা দিয়েছেন ‘ফুটবলের বিরুদ্ধে জেহাদ’। শিরোনাম যাই হোক না কেন, আঘাতের তীব্রতা যে আগামী দিনে ভয়ঙ্কর হতে চলেছে, একমত সকলে।

ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ডিফেন্ডার ফার্দিনান্দ বলেন, ‘নতুন কাপ সবদিক দিয়ে ফুটবলের বিরোধী। প্রধান প্রধান ক্লাবগুলি নিজেদের আলাদা করে নিতে চাইছে। ফুটবল-পিরামিডের ভিত্তি, তার ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করতে চাইছে। এটা জঘন্য! অতিমারীর সময় এটা করার অধিকার তাদের কে দিল? আসলে তারা ফুটবল থেকে প্রতিযোগিতাকে ছেঁটে ফেলতে চাইছে। রেলিগেশন, প্রমোশন, বিজয়ীর খেতাব, পরাজিতের কান্না— এতদিন খেলায় এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের ভালোবাসার ফুটবল আর আগের মতো থাকবে না।’

গোটা পরিস্থিতির জন্য পর্দার আড়ালে ছড়ি ঘোরানো ব্যক্তিদেরও একহাত নিয়েছেন ফার্দিনান্দ। তাঁর সাফ দাবি, ‘সুপার লিগের কর্তাব্যক্তিদের ফুটবল নিয়ে কোনও ধারণা নেই। এটা পুরোটাই ব্যবসার ছক।’

অন্যদিকে অংশীদার ক্লাবগুলিকেও সমানভাবে বিঁধেছেন গ্যারি নেভিল। নিজের দল ম্যান ইউকেও ছেড়ে কথা বলেননি তিনি। জানিয়েছেন, ‘ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল— দু’টো দলই চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে ছিটকে গেছে। আর্সেনাল বছরের পর বছর কম্পিটিশনে অংশ নিতেই পারে না। এর মধ্যে নিজেদের মহান দেখিয়ে আলাদা লিগ তৈরির স্পর্ধা আসে কোথা থেকে?’

এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে স্পর্ধা দেখালে অবশ্য ডানা ছাঁটা হবে। সে বন্দোবস্তও উলটো দিকে তৈরি করেছে উয়েফা। লিগ গঠনের খবর চাউর হতেই সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যে সমস্ত ক্লাব নয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে তাদের আর কোনও কম্পিটিশনে যোগ দিতে দেওয়া হবে না। শাস্তির খাঁড়া নেমে আসবে খেলোয়াড়দের উপরেও।

মাঠের লড়াই এখনও শুরু হয়নি। তার আগেই অবশ্য মাঠের বাইরের যুদ্ধের প্রস্তুতি তুঙ্গে। শেষ হাসি হাসবে কোন পক্ষ— তার অপেক্ষায় গোটা বিশ্বের ফুটবল সমর্থক!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More