মধ্য প্রাচ্যের মরুভূমির বাতাস আজও শোনায় এই অমর প্রেমগাথা

বিশ্বের দরবারে কাহিনিকে বিখ্যাত করেছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম কবি নিজামি গঞ্জাভি।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ইসলাম আসার আগে পারস্যে ছিল সম্পদশালী সাসানীয় সাম্রাজ্য। সাম্রাজ্যটির প্রথম শাহেনশা ছিলেন আর্দেশির। ঈর্ষনীয় সম্পদ, শক্তিশালী সেনাবাহিনী, ক্ষুরধার পরিচালনায় সাম্রাজ্যটি ২২৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক বিস্তার ও প্রতিপত্তি লাভ করেছিল।

তবে চিরশত্রু রোমানদের সঙ্গে প্রায়ই লেগে থাকত যুদ্ধ। সাসানীয় সাম্রাজ্যের শাহেনশারা ছিলেন অতিপ্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারী। এই সাম্রাজ্যেরই এক শাহেনশাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক অসামান্য প্রেমকাহিনি। শাহেনশা খুসরু, আর্মেনিয়ার রাজকন্যা শিরিন ও ভাস্কর ফারহাদের ত্রিকোণ প্রেমের এক বিয়োগান্তক কাহিনি।

লোকগাথা হিসেবে কাহিনিটি শত শত বছর ধরে পারস্যে ঘুরে বেড়ালেও, বিশ্বের দরবারে কাহিনিকে বিখ্যাত করেছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম কবি নিজামি গঞ্জাভি। যে কিংবদন্তি লেখকেরই অমর সৃষ্টি, ‘লায়লা মজনু‘। নিজামির আগে ও পরে অসংখ্য কবি লিখেছিলেন খুসরু-শিরিন-ফারহাদের ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনিটি।

নিজামি গঞ্জাভি

তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফিরদৌসি, ফারুকি, কাত্রান, মোখতারি, নাসের খুসরু, আনোয়ারি, সানাই সহ আরও অসংখ্য কবি। ফলে কাহিনির মুখ্যচরিত্র তিনটি এক থাকলেও, অনেকসময় বদলে গিয়েছে ঘটনাক্রম। কিন্তু শত শত বছর ধরে কী শুনিয়ে চলেছিল পারস্যের লোকগাথা!

শাহেনশা হরমিজের পুত্র খুসরু পারভেজ

সাসানীয় সাম্রাজ্যের ২৩ তম শাহেনশা ছিলেন চতুর্থ হরমিজ। তাঁর পুত্র ছিলেন খুসরু পারভেজ বা দ্বিতীয় খুসরু। জন্ম হয়েছিল ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে। ছোটবেলা থেকেই শাহজাদা খুসরু ছিলেন একটু আলাদা। তাঁর সঙ্গে বংশের অন্যান্য শাহজাদাদের স্বভাবের মিল ছিল না। রাজ্যশাসন তাঁর ভাল লাগত না। প্রজাদের সঙ্গে বন্ধুর মত ব্যবহার করতেন। প্রজাদের বাড়িতেই সারাদিন কাটাতেন।

বাধ্য হয়ে ক্ষুব্ধ শাহেনশা তখন হরমিজ খুসরুকে শাসক করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রথমে আলবানিয়ার পার্তাউ ও পরে মেসোপটেমিয়ার আরবেলাতে। তবে শাসক হিসেবে তেমন সফল না হলেও, খুসরু আইবেরিয়া দখল করে সাসানীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলেন।

কৃষকের বাড়িতে গণভোজের আয়োজন করার অপরাধে পুত্র খুসরুকে একবার ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেছিলেন শাহেনশা হরমিজ। সাসানীয় রাজবংশের মর্যাদা ধুলোয় মিটিয়ে দেওয়ার জন্য সবার সামনে খুসরুকে ভর্ৎসনা করেছিলেন। অনুতপ্ত খুসরু ক্ষমা চেয়েছিলেন। সবাই অনেক অনুরোধ করার পর খুসরুকে ক্ষমা করেছিলেন হরমিজ।

 স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা 

সেই রাতে খুসরুর স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন খুসরুর পিতামহ শাহেনশা আনুশিরভান। যাঁকে ইতিহাস চেনে প্রথম খুসরু নামে। তিনি নাতি খুসরুকে দেখিয়েছিলেন তার হবু স্ত্রীয়ের ছবি। অসামান্য সুন্দরী সেই কন্যাকে দেখে খুসরু আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন। ভেঙে গিয়েছিল ঘুম। ছুটে গিয়েছিলেন অলিন্দে।

রাতজাগা চাঁদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলতে পারো কোথায় থাকে এই কন্যা! এরপর শাহজাদা খুসরু তাঁর দুধসাদা ঘোড়ায় চড়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের আনাচে কানাচে খুঁজেছিলেন স্বপ্নে দেখা রাজকন্যাকে। মাসের পর মাস ঘুরেও খোঁজ মেলেনি সেই রুপসীর।

খুসরুর এক বন্ধু ছিলেন শাপুর। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত চিত্রকর। একদিন তাঁর কাছে গিয়েছিলেন শাহজাদা খুসরু। শাপুরের ঘরে প্রবেশ করেই চমকে উঠেছিলেন খুসুরু। তাঁর বুকের রক্ত চলকে উঠেছিল। দেওয়ালে টাঙানো এক ক্যানভাস থেকে তাঁরই দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁর স্বপ্নের রাজকন্যা। যাঁর জন্য গত কয়েকমাস খুসরুর চোখে ঘুম নেই। কোনও কথা না বলে বন্ধু শাপুরকে জড়িয়ে ধরেছিলেন খুসরু। জিজ্ঞেস করেছিলেন ক্যানভাসের রুপসী কন্যার কথা।

শাপুর জানিয়েছিলেন, ছবিটি হল আর্মেনিয়ার (মতান্তরে খুজেস্তান) রাজকন্যা শিরিনের। সম্পর্কে তিনি গ্রিসের রানি মাহিম বানুর ভাগনি। বন্ধু শাপুরকে খুসরু বলেছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথা। সব শুনে শাপুর বলেছিলেন, শিরিন রোমান রাজকন্যা এবং খুসরু সাসানীয় শাহজাদা। রোমানদের সঙ্গে সাসানীয়দের সম্পর্ক মোটেই ভাল নয়। তাছাড়া দু’জনের ধর্মও আলাদা। কিন্তু ভালবাসা বাঁধভাঙা জলস্রোতের মত, কোনও বাধা মানে না।

চোখ থেকে ঘুম চলে গিয়েছিল রাজকন্যা শিরিনের

খুসুরুর অনুরোধে বন্ধু শাপুর গোপনে গিয়েছিলেন আর্মেনিয়ায়। কারণ শাহেনশা হরমিজ জানতে পারলে শাপুরের মৃত্যু অনিবার্য ছিল। শাপুর সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর আঁকা খুসরুর একটি ছবি। রূপবান শাহজাদা খুসুরুকে দেখে চোখ ফেরাতে পারেনি শিরিন। চোখে না দেখেই খুসরুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। শাপুর বুঝতে পেরেছিলেন কী ঘটতে চলেছে। শিরিনকে খুসরুর পরিচয় দিয়ে দ্রুত দেশের পথে রওনা হয়েছিলেন।

চোখ থেকে ঘুম চলে গিয়েছিল রাজকন্যা শিরিনের। কিছুদিনের মধ্যেই আর্মেনিয়া ছেড়ে শিরিন গোপনে পাড়ি দিয়েছিলেন পারস্যের উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে বন্ধু শাপুরের ফিরতে দেরি হওয়ায় পারস্য ছেড়ে খুসরু পাড়ি দিয়েছিলেন আর্মেনিয়ায়। ভালবাসায় অন্ধ হয়ে, একে অপরকে পাওয়ার জন্য খুসরু ও শিরিন এগিয়ে চলেছিলেন বিপরীত দিকে। মাঝরাস্তায় একে অপরের কাছেও এসেছিলেন, কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারেননি। কারণ খুসরুর পরনে ছিল কৃষকের পোশাক। শিরিনও ছিলেন ছদ্মবেশে।

আর্মেনিয়ায় পৌঁছে শাহজাদার পোশাক পরে খুসরু গিয়েছিলেন আর্মেনিয়ার রাজপ্রাসাদে। রূপবান খুসরুকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন রানি। জানিয়েছিলেন তাঁরই খোঁজে পারস্যের মাদেইনের পথে পাড়ি দিয়েছেন রাজকন্যা শিরিন। হতাশ খুসরু আবার ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন দেশের দিকে।

বদলে গিয়েছিল খুসরুর জীবন

পথে দেখা হয়েছিল বন্ধু শাপুরের সঙ্গে। তিনি খুসরুকে দিয়েছিলেন একটি দুঃসংবাদ। খুসরুর পিতা শাহেনশা হরমিজ, সেনাপতি বাহরাম চোবিনকে পদচ্যূত করে সাসানীয় সাম্রাজ্যের গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন খুসরুর দুই মামা ভিস্তাম ও ভিন্দুয়াকে। তাঁরা দুজনেই শাহেনশা হরমিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে দখল করে নিয়েছেন সম্পূর্ণ রাষ্ট্রক্ষমতা।

খুসরু ও শাপুরের ঘোড়া ছুটেছিল সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী টেসিফনের দিকে। অন্যদিকে খুসুরুকে পারস্যে না পেয়ে হতাশ শিরিন ফিরে চলেছিলেন আর্মেনিয়ার দিকে। ভাগ্যের নিদারুণ প্রবঞ্চনায় এবারও একে অপরকে অতিক্রম করে এগিয়ে গিয়েছিলেন বিপরীত দিকে।

প্রাসাদে ফেরবার পর খুসরু খবর পেয়েছিলেন তাঁর পিতা হরমিজ কারাগারে বন্দি। সেখানে তাঁর ওপর নিদারুণ অত্যাচার হচ্ছে। চোখে তপ্ত শলাকা ঢুকিয়ে তাঁকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পিতার দুর্ব্যবহারের জন্য এই ঘটনার কথা শুনেও খুব একটা কষ্ট পাননি খুসরু।

কয়েকদিন পরেই খুসরুর দুই মামা ভিস্তাম ও ভিন্দুয়া, কারাগারের মধ্যে হত্যা করেছিলেন খুসরুর পিতা চতুর্থ হরমিজকে। ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মে তাঁরা শাহেনশার মসনদে বসিয়েছিলেন ভাগ্নে খুসরুকে। শাসনে অমনোযোগী খুসরুকে মসনদে বসিয়ে আখের গোছাতে চেয়েছিলেন দুই মামা।

শিল্পীর কল্পনায় সাসানীয় শাহেনশাদের প্রাসাদ

সাসানীয়ার আকাশে যুদ্ধের মেঘ

শাহেনশার মসনদে বসতে না বসতেই সাসানীয় সাম্রাজ্যের আকাশে দেখা দিয়েছিল গৃহযুদ্ধের মেঘ। পিতা হরমিজের করা অপমানের বদলা নেওয়ার জন্য সেনাপতি বাহরাম চোবিন রাজধানীর দিকে এগিয়ে আসছিলেন বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে। সেনাপতি বাহরামকে চিঠি লিখেছিলেন খুসরু। চিঠিতে বাহরামকে জানিয়েছিলেন, পিতার মৃত্যুর পর আইনত সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীশ্বর তিনি। তাই সেনাপতি বাহরাম যেন তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরে যান।

খুসরুর কথা শোনেননি সেনাপতি বাহরাম। নাহরাওয়ান খালের কাছে যুদ্ধ হয়েছিল খুসরুর সেনার সঙ্গে সেনাপতি বাহরামের সেনার। বাহরামের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন খুসরু। রাজধানী টেসিফন দখল করে নিজেকে শাহেনশা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন সেনাপতি বাহরাম চোবিন। খুসরু পালিয়ে গিয়েছিলেন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে। যে সাম্রাজ্য ছিল সাসানীয়দের চিরশত্রু।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টানটিনোপল

এত ঘটনার পরেও খুসরু ভুলতে পারেননি শিরিনকে

কাউকে না জানিয়ে আবার পাড়ি দিয়েছিলেন আর্মেনিয়ার উদ্দেশ্যে। এবার দেখা হয়েছিল শিরিনের সঙ্গে। শিরিনের দিকে অপলকে তাকিয়েছিলেন খুসরু। ঠিক যেন মোমের পুতুল। মানুষ এত সুন্দর হতে পারে! শিরিনও দু’চোখ ভরে দেখছিলেন তাঁর প্রিয়তমকে। ঘোর কাটার পর খুসরু দিয়েছিলেন বিয়ের প্রস্তাব।

প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন শিরিন। তিনি খবর পেয়েছিলেন সাসানীয় সাম্রাজ্যের ক্ষমতা খুসরুদের পরিবারের হাত থেকে চলে গিয়েছে। তবে খুসরুর সামনে একটি শর্ত রেখেছিলেন শিরিন। সেইদিন শিরিন খুসরুকে বিবাহ করবেন, যেদিন সেনাপতি বাহরামকে সরিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের ক্ষমতা হাতে নেবেন শাহজাদা খুসরু। প্রায় আকাশ থেকে পড়েছিলেন খুসরু। শিরিনের কাছ থেকে এটা আশা করেননি তিনি। কিন্তু তাঁর গায়ে বইছিল শাহেনশার রক্ত। যুদ্ধে জিতে শিরিনকে বিবাহ করার শপথ নিয়ে আর্মেনিয়া ছেড়েছিলেন খুসরু।

শত্রুপক্ষের দরবারে

আর্মেনিয়া থেকে সোজা চলে গিয়েছিলেন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টানটিনোপলে। দেখা করেছিলেন রোমান সম্রাট মরিসের সঙ্গে। ক্ষমতা পুনর্দখলের জন্য চেয়েছিলেন সম্রাট মরিসের সাহায্য। শত্রুপক্ষ হলেও খুসরুর ব্যবহার ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন সম্রাট মরিস। তিনিও একটি শর্ত রেখেছিলেন খুসরুর সামনে। সাহায্য তিনি করবেন, তবে তার বিনিময়ে মেয়ে মরিয়মকে বিবাহ করতে হবে এবং মরিয়মের মৃত্যুর আগে খুসরু আর বিবাহ করতে পারবেন না।

অত্যাচারী সেনাপতি বাহরামকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সম্রাট মরিসের শর্ত মেনেছিলেন খুসুরু। বিবাহ করেছিলেন সম্রাটের মেয়ে মরিয়মকে। বিশাল বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনী বাগরামকে যুদ্ধে হারিয়ে আবার মসনদে বসিয়েছিল খুসরুকে। বাগরাম পালিয়েছিলেন তুরস্কে। কিন্তু শান্তি পাচ্ছিলেন না খুসরু। তাই গোপনে তুরস্কের রাজ পরিবারের সঙ্গে চক্রান্ত করে হত্যা করেছিলেন বাগরামকে। তারপর বাইজেন্টাইন সম্রাটের মেয়ে মরিয়মকে নিয়ে সুখে দিন কাটাতে শুরু করেছিলেন। জন্ম নিয়েছিল সন্তান শেরোয়। এরপরেও খুসরুর মন জুড়ে ছিলেন শিরিন।

শিরিনের মনে তখন ফারহাদ

শিরিন ততদিনে বদলে গিয়েছিলেন। তিনি খবর পেয়েছিলেন মরিয়মকে বিবাহ করেছেন খুসরু। শোকে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন শিরিন। কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। সারাক্ষণ চোখ দিয়ে জল পড়ত। ঠিক সেইসময় শিরিনের জীবনে এসেছিলেন ফারহাদ।

সাসানীয় সাম্রাজ্যেরই একজন অসামান্য ভাস্কর। প্রায় শিরিনেরই সমবয়সি। আর্মেনিয়ায় শিরিনের শ্বেতপাথরের মূর্তি গড়তে গিয়ে আলাপ হয়েছিল দু’জনের। আলাপ থেকে শুরু হয়েছিল ভালবাসা। ফারহাদের প্রাণঢালা ভালোবাসায় খুসরুকে ভুলে গিয়েছিলেন শিরিন।

শিরিন ও ফারহাদের মধ্যে গড়ে ওঠা ভালোবাসার খবর এসেছিল শাহেনশা খুসরুর কাছে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে সেনা পাঠিয়ে ধরে এনেছিলেন ফারহাদকে। তারপর দিয়েছিলেন এক অদ্ভুত শাস্তি। বেহিস্তান পাহাড়ের শৃঙ্গে ওঠার সিঁড়ি বানানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন ফারহাদকে। খুসরু বলেছিলেন এই কাজটি করতে পারলে তিনি নিজে ফারহাদের সঙ্গে শিরিনের বিবাহ দেবেন।

ফারহাদ বিশ্বাস করেছিলেন খুসরুর কথা

সহজ সরল ফারহাদ তাঁর ছেনি হাতুড়ি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন অনেক দূরে থাকা বেহিস্তান পাহাড়ে। নাওয়াখাওয়া ভুলে দিনরাত এক করে পাহাড় কাটতে শুরু করেছিলেন ফারহাদ। চোখ থেকে অবিরাম ঝরে পড়ত জল। নিষ্প্রাণ পাহাড়কে পাহাড়কে জিজ্ঞেস করতেন, ভালোবাসা কি অপরাধ?

ফারহাদ পাথর কুঁদে শিরিনের মুর্তি বানিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা তাঁর কুঁড়েঘরে রেখেছিলেন। রাতে কুঁড়েতে ফিরে কত কথা বলতেন প্রাণহীন মূর্তিটির সঙ্গে। পাথরের শিরিনের গালে বর্ষিত হত ফারহাদের শত সহস্র চুম্বন। শিরিনের প্রেমে পাগল ফারহাদ সত্যি সত্যিই একদিন তৈরি করে ফেলেছিলেন বেহিস্তান পাহাড়ের শৃঙ্গে ওঠার সিঁড়ি।

বেহিস্তান পাহাড়

খবরটি পেয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন খুসরু। এখন তাঁকে শিরিনের সঙ্গে ফারহাদের বিয়ে দিতে হবে। না হলে শাহেনশার কথার খেলাপ হবে। কিন্তু খুসরু নিজের হাতে কীভাবে ফারহাদের হাতে শিরিনকে তুলে দেবেন! তা তিনি কোনও মতেই পারবেন না। তিনি যে শিরিনকে আজও ভালবাসেন।

তাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন খুসরু। ফারহাদের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। দূত গিয়ে ফারহাদকে বলেছিলেন, অজানা অসুখে ভুগে শিরিনের মৃত্যু হয়েছে। শোকস্তব্ধ ফারহাদের চোখের সামনে পৃথিবীটা হঠাৎ দুলে উঠেছিল। উন্মাদের মত ফারহাদ ছুটে গিয়ে ছিলেন পাহাড়ের দিকে। নিজেরই তৈরি করা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়েছিলেন পাহাড়ের শৃঙ্গে। ঝাঁপ মেরেছিলেন শৃঙ্গ থেকে।

সুখে ছিলেন না খুসরুও

কারণ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে ঘটেছিল বিদ্রোহ। মরিয়মের পিতা সম্রাট মরিসকে হত্যা করেছিলেন সেনাপতি ফোকাস। বসেছিলেন বাইজেন্টাইন সম্রাটের আসনে। ক্রুদ্ধ খুসরু আক্রমণ করেছিলেন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। দখল করে নিয়েছিলেন বেশ কিছুটা অংশ।

সেনাপতি থেকে সম্রাট হয়ে যাওয়া ফোকাসকে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে হত্যা করেছিলেন হেরাকলিয়াস। তিনি হয়েছিলেন নতুন বাইজেন্টাইন সম্রাট। সিংহাসনে বসার পর খুসরুর সঙ্গে সন্ধি করতে চেয়েছিলেন হেরাকলিয়াস। কিন্তু খুসরু বলেছিলেন তিনি মরিয়মের ভাই বা মরিসের পুত্রকে বাইজেন্টাইনের সিংহাসনে বসাবেন।

ইতিমধ্যে মারা গিয়েছিলেন খুসরুর স্ত্রী মরিয়ম। শিরিনের কাছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন খুসরু। এবার রাজি হয়েছিলেন শিরিন। কয়েকশ অনুচর নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন পারস্যের পথে। কিন্তু খুসরুকে সিংহাসন থেকে সরানোর জন্য পারস্য আক্রমণ করেছিলেন বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাকলিয়াস। সেই যুদ্ধে হেরেছিল সাসানীয় সেনা। নিজেরই প্রাসাদে বন্দি হয়েছিলেন শাহেনশা খুসরু।

 মরুভূমির গরম বালি ঠাঁই দিয়েছিল ভালোবাসাকে

বাইজেন্টাইন সম্রাট সাসানীয় সাম্রাজ্যের মসনদে বসিয়েছিলেন খুসরুর পুত্র শেরোয়কে। কারণ মরিয়মের পুত্র শেরোয়ের শরীরে বইছিল রোমান রক্ত। খুসরুর পুত্র শেরোয় ছিলেন ভয়ঙ্কর অত্যাচারী। মসনদে বসেই তিনি তাঁর সব জেঠতুতো খুড়তুতো ভাইদের হত্যা করেছিলেন।

ঠিক সেই সময় আর্মেনিয়া থেকে পারস্যে পৌঁছেছিলেন শিরিন। মাতৃসমা শিরিনের রূপে এবার মুগ্ধ হয়েছিলেন খুসরুর পুত্র শেরোয়। পথের বাধা সরানোর জন্য কারাগারে বন্দি থাকা পিতা খুসরুকে গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যা করিয়েছিলেন পুত্র শেরোয়। তারপর শিরিনকে বলেছিলেন বিবাহের জন্য প্রস্তুত হতে। এক সপ্তাহ শোক পালনের পর শিরিনকে বিবাহ করবেন তিনি।

সন্তানসম শেরোয়ের এই প্রস্তাবে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন শিরিন। নিজের সৌন্দর্যের জন্য নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা হয়েছিল তাঁর। শেরোয়ের সামনেই ছুটে গিয়ে খিড়কি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নীচে। শ্বেতপাথরের দালানে আছড়ে পড়েছিলেন শিরিন। রক্তে ভেসে গিয়েছিল চারদিক।

খুসরু ও শিরিনকে একই কবরে সমাধি দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর পর কবরের অন্ধকারে মিলিত হয়েছিলেন রাজকন্যা শিরিন ও শাহেনশা খুসরু। বেহিস্তান পাহাড়ের নীচে থাকা কবরে শুয়ে ফারহাদ হয়ত তখনও আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন শিরিনের প্রস্তরমূর্তি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More