‘হেই সামাল হো’ বা ‘শঙ্খচিল’, হেমাঙ্গ-সলিলদের ঐতিহ্যে কি কালি ছেটাল টুম্পা

শোভন চক্রবর্তী

শুক্রবার সন্ধেবেলা থেকে বাম জনতার ওয়াল টুম্পাময়। ব্রিগেডের প্রচার গানে টুম্পার প্যারোডি যে গতিতে ভাইরাল হয়েছে তা বোধহয় সাম্প্রতিক সময়ে বামেদের কোনও প্রচারে এমন হয়নি। কিন্তু তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে থেকেই আরও ভাইরাল হয়েছে বিতর্ক। কার্যত আড়াআড়ি দুভাগ বামপন্থীরা।

বিপক্ষের যুক্তি

একাংশের বক্তব্য, অত্যন্ত নিম্ন রুচি পরিবেশিত হয়েছে গানটির মাধ্যমে। যা বামপন্থী সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শঙ্খচিল বা সলিল চৌধুরীর হেই সামাল হো ধানের যে সোনালি ঐতিহ্য রয়েছে, জর্জ বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উত্‍পল দত্ত কিংবা ঋত্বিক ঘটকরা যে গৌরব লিখেছেন তাতে কালি লেপে দিয়েছে টুম্পা। তাছাড়া বিরুদ্ধে যে অংশ সওয়াল করছেন, তাঁদের বক্তব্য, প্রচ্ছন্ন ভাবে লিঙ্গ বৈষম্য রয়েছে গানটির মধ্যে। সুপ্ত ভাবে থাকা বিষয়টি বাইরে চলে এসেছে যা বামপন্থীদের কাছে লজ্জাজনক।

পক্ষের যুক্তি

আর একটা অংশের বক্তব্য, সংস্কৃতি ফর্ম বদলায়। উদ্দেশ্যটা কী সেটা গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত হেই সামাল হো ধান যেমন কৃষকদের কথা ভেবে লেখা হয়েছিল তেমন টুম্পার প্যারোডিতে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বেকারত্ব, দুর্নীতি, ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে।

পক্ষে যাঁরা সওয়াল করছেন, তাঁদের আরও একটি যুক্তি রয়েছে। তা হল, গণ সঙ্গীত মানে যেখানে গণ স্বর উঠে আসে। তার নির্দিষ্ট ফর্ম হয় না। সব সময়ে হারমোনিয়াম-তবলা নিয়ে তা পরিবেশিত করতে হবে তারও কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।

প্যারোডি এবং বিতর্ক

বেশির ভাগ প্যারোডিই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে আজ পর্যন্ত। বামেদের গণসঙ্গীত ‘জন হেনরি’র প্যারোডি করেছিল চন্দ্রবিন্দু। মার্কিন মুলুকের রেল শ্রমিককে নিয়ে লেখা গান গেয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তারপর চন্দ্রিল, উপল, অনিন্দ্যরা সেই সুরে গেয়েছিলেন:

“এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল/ কড়া ডিসিপ্লিনের ধ্বজা ওড়ে,
হাফপ্যান্ট পরা স্যার অঙ্কের ক্লাস নেয়/ মিস ঢোকে মিনিস্কার্ট পরে!”

তা নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি এক সময়ে। নচিকেতা যখন ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ লাইনটা ব্যবহার করে একটা গান সাজিয়েছিলেন তখনও তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। এবার টুম্পার প্যরোডি বাম মহলে বিতর্কের তুঙ্গে।

বাম গণসঙ্গীতে প্যারোডি

বাম শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন বা সামগ্রিক গণ আন্দোলনের গানে যে প্যারোডি হয়নি তা নয়। ১৯৬৫ সালে গুমনাম ছবিটি রিলিজ করেছিল। তার টাইটেল ট্র্যাক ‘গুমনাম হ্যায় কোয়ি, বদনাম হ্যায় কোয়ি’র সুরে ‘৬৭-র প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে যাওয়ার পর বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যা হয়েছিল বাংলায়। তার মধ্যে বামেদেরই অনেক শ্রমিক নেতা খুন হয়েছিলেন। সেই সময়ে গুমনামের সুরে লেখা হয়েছিল:

“খুন হয়ে যাবে সবাই/ গুম হয়ে যাবে সবাই,
এ যে গুণ্ডামি রাজ/ তাই খুন হয় আজ/ কেউ আর পাবে না রেহাই!
হিন্দমোটর হারাল শ্রমিক সেদিন/ খুন হয়ে গেল যোগিন্দর সিং…….”

উপসংহার

এই প্রতিবেদনে দ্য ওয়াল-এর কোনও মতামত নেই। যা ঘটছে এবং অতীত-বর্তমানের আয়নায় শুধুমাত্র ঘটনা বা ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। তবে এটা ঠিক, অনেকদিন পর বামেদের কোনও সাংস্কৃতিক প্রোডাকশন নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা প্রগতিশীল সংস্কৃতির জন্য স্বাস্থ্যকর বলেই মত অনেকের।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More