খুঁজছিল আমেরিকা, আপন করেছিল মুণ্ডশিকারি নাগারা, ভারতে প্রাণ দিয়েছিলেন এই ‘জন হেনরি’

বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ভারতের মাটিতে।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। ভারত, বার্মা ও চিন সীমান্ত হয়ে উঠেছিল উত্তাল। ১৯৪২ সালেই বার্মায় ঢুকে পড়েছিল জাপান। পুবের রণাঙ্গনে চিন লড়ছিল জাপানের সঙ্গে। ভারত থেকে যুদ্ধের রসদ চিনে পাঠাতে চাইছিল মিত্রপক্ষ। কিন্তু বার্মা রোড দখল করে নিয়েছিল জাপানি সেনা।

তাই মিত্রপক্ষ ১৯৪২ সালের অক্টোবর মাস থেকেই বানাতে শুরু করেছিল ১৭২৬ কিলোমিটার লম্বা লেডো রোড। যে রাস্তাটি অসমের তিনসুকিয়ার ছোট্ট শহর লেডো থেকে যাত্রা শুরু করে বার্মা হয়ে প্রবেশ করবে চিনে। যাত্রা শেষ করবে চিনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরে। যে শহরটি ছিল চিনের নেতা ও সেনানায়ক চিয়াং কাইশেকের হেড-কোয়ার্টার।

ম্যাপে লেডো রোড (স্টিলওয়েল রোড)

 ‘নরকের পথ’

আমেরিকার জেনারেল জোসেফ স্টিলওয়েল, চিয়াং কাইশেককে খুশি করার জন্য শুরু করেছিলেন প্রায় অসাধ্য ও অযৌক্তিক প্রজেক্টটি। তিনি চিনকে বোঝাতে চাইছিলেন জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিনের পাশে আছে আমেরিকা ও ব্রিটেন। তাই কোটি কোটি ডলার খরচ করে তৈরি হচ্ছিল লেডো রোড। রাস্তা বানানোর কাজে লাগানো হয়েছিল ভারত, বার্মা ও চিনের শ্রমিকদের। আনা হয়েছিল আমেরিকার সেনা। যাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। যাঁরা জীবনে এরকম ভয়াবহ পরিবেশে কাজ করে অভ্যস্ত নন।

শত শত কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করতে হবে দুর্গম পাহাড়, দুর্ভেদ্য অরণ্যের মধ্যে দিয়ে। অন্ধাকারাচ্ছন্ন রেন-ফরেস্ট, এলিফ্যান্ট গ্রাস ও পাহাড়ি খাদে ছিল প্রায় সব ধরনের বিপজ্জজনক প্রাণি। ছিল ম্যালেরিয়া, কলেরা ও আমাশার ভয়। জাপানি ল্যান্ড মাইন ও বুবি ট্র্যাপের ভয়। দুর্ঘটনা ও ধস নামার ভয়। তবুও স্যাঁতস্যাঁতে অরণ্যে বিষাক্ত সাপ, জোঁক, মশা, দৈত্যাকৃতি মৌমাছি ও ভিমরুলের আক্রমণ সহ্য করে কাজ করছিলেন হাজার হাজার শ্রমিক ও আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ সেনারা। প্রতি এক মাইল রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছিলেন দু’জন মানুষ। তাই লেডো রোডের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘নরকের পথ’।

তৈরি হচ্ছিল লেডো রোড

এত বিপদ সত্ত্বেও কোনও কথা শুনতে চাইছিলেন না রাস্তা তৈরির দায়িত্বে থাকা আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ অফিসাররা। রাস্তার কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। নিজেদের শ্রমিক ও কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের ওপর তাঁদের অমানুষিক অত্যাচার হার মানিয়েছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও। অবাধ্য শ্রমিক ও সেনাদের জন্য লেডোতে আমেরিকা বানিয়েছিল কারাগার। অনেক সময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সেখানে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হতেন বন্দিরা।

রাস্তার কাছ দ্রুত শেষ করার জন্য বার্মা সীমান্তে আরও কৃষ্ণাঙ্গ সেনা নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমেরিকা। বিপজ্জনক জায়গায় ও পরিশ্রমসাধ্য কাজে, আমেরিকা সবসময় পাঠিয়ে দিত কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের। অনেক সময় জোর করে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকদের সেনাবাহিনীতে নিয়ে এসে পাঠিয়ে দেওয়া হত রণক্ষেত্রে।

লেডো রোডে কর্মরত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সেনা

 ডাক পেয়েছিলেন একুশ বছরের হার্মান 

আমেরিকার উত্তর ক্যারোলিনার মনরো শহরের বস্তিতে জন্ম হয়েছিল হার্মান পেরির। তুলোচাষ করার জন্য তাঁর পূর্বপুরুষদের ক্রীতদাস হিসেবে আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছিল। বিবাহবিচ্ছিন্না মা দিনমজুরি করে তিন ছেলের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি হার্মান। তিনিও দিনমজুরি করতেন। যখন আমেরিকার সেনা তাঁকে ডেকেছিল, সেই সময় তিনি কসাইয়ের দোকানে চামড়া ধোয়ার কাজ করতেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই আর্মি ট্রেনিং নেওয়াটা বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছিল আমেরিকার যুবকদের কাছে। ট্রেনিং নিয়েছিলেন হার্মানও। কিন্তু তিনি বিনা কারণে মানুষ মারতে পারবেন না। তাই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেনার চিঠি। ফলে হার্মানকে জোর করে পাঠানো হয়েছিল নিউইয়র্কের ‘এইট ফর্টিনাইন’ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ক্যাম্পে। সেখানে গিয়ে হার্মান দেখেছিলেন তাঁরই মতো অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে। তাঁরা জানতেন না কোথায় পাঠানো হচ্ছে তাঁদের।

হার্মান পেরি

মহাসাগর পেরিয়ে ভারতের পথে

১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, নিউইয়র্ক বন্দর থেকে সেনাবাহিনীর জাহাজে উঠেছিলেন হার্মান পেরি। জাহাজে ওঠার পর হার্মান অনুভব করেছিলেন আমেরিকার সেনাবাহিনীতে কৃষ্ণাঙ্গরা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক। জাহাজের খোলে গরু ভেড়াদের মত থাকতে হত তাঁদের।

ডেকে ওঠার অধিকার ছিল না। সবার শেষে খেতে দেওয়া হত। দাঁড়িয়ে খেতে হত, কারণ টেবিলে বসে খাওয়ার অধিকার ছিল না। জাহাজের অন্ধকার খোলের গোলাকৃতি জানলা দিয়ে নীল আকাশ দেখতেন হার্মান। দেখতেন সিগালদের ওড়াউড়ি। ঝিমিয়ে পড়া কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের মন ভালো করে দিতেন গান গেয়ে, মজার মজার গল্প বলে।

নিউইয়র্ক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন, সেখান থেকে ভারতের বম্বেতে এসে পৌঁছেছিল হার্মানদের জাহাজ। তিন মাসের সমুদ্রযাত্রায় কাহিল হয়ে গিয়েছিলেন জাহাজের খোলে বন্দি থাকা কৃষ্ণাঙ্গ সেনারা। বম্বেতে নামার পর, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো জন্য হার্মানদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহারাষ্ট্রের দেওলালিতে। সেখানে আমেরিকার সেনার ক্যাম্প ছিল।

এবার ভারতের পূর্ব সীমান্তে

কিছুদিন পর হার্মানদের চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ট্রেনে। প্রথম গন্তব্য ছিল কলকাতা, সেখান থেকে অসমের তিনসুকিয়ার লেডো। যাত্রাপথে ছিল খাবার ও জলের নিদারুণ অভাব। অথচ শ্বেতাঙ্গ সেনা ও অফিসারদের কামরায় বিভিন্ন স্টেশন থেকে উঠত হরেকরকম খাবার ও মদ।

ভয়াবহ এই ট্রেনযাত্রায় আমাশায় আক্রান্ত হয়েছিলেন হার্মান। ট্রেনে মেলেনি চিকিৎসা। লেডোয় পৌঁছবার পর তাঁকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল মিলিটারি হাসপাতালে। ওষুধ ছাড়া সেখানে সামান্য যত্নও পাননি একুশ বছরের তরুণটি। মনের মধ্যে ক্রমশ জমতে শুরু করেছিল ক্ষোভ। সামান্য সুস্থ হওয়ার পর হার্মানকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল নেফা (অরুণাচল) ও বার্মার সীমান্তে।

বার্মা পৌঁছে হার্মান জানতে পেরেছিলেন, কেন তাঁকে এখানে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই পাটকই পর্বতমালার দুর্গম পাঙ্গসাউ গিরিপথ (৩৭২৭ ফুট) পেরিয়ে লেডো রোড এগিয়েছে উত্তর বার্মার দিকে। সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিপদসংকুল অরণ্যের মধ্যে থাকা পাথুরে পাহাড়। হার্মানকে পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা বানানোর কাজ করতে হবে অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের সঙ্গে। আগে আসা কৃষ্ণাঙ্গ সেনারা ডিনামাইট ও বুলডোজার দিয়ে পাহাড় ফাটানোর কাজ করছিলেন। হার্মান ও কয়েকশো কৃষ্ণাঙ্গ সেনাকে দেওয়া হয়েছিল পাথর ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করার কাজ।

 হিরো ‘হার্মান’

পূর্ণ উদ্যমে কাজে লেগে পড়েছিলেন হার্মান। তাঁর চল্লিশ পাউন্ডের হাতুড়ির ঘায়ে চূর্ণ হয়ে যেত বোল্ডার। একই সঙ্গে গানে গল্পে সারাদিন মাতিয়ে রাখতেন সঙ্গীদের। সামনের পথ ছিল ভয়ঙ্কর। বন্যজন্তুর আক্রমণের ভয়ে সে পথে শ্বেতাঙ্গ সেনারা যেতে চাইতেন না। ঠেলে দেওয়া হত হার্মানকে। অকুতোভয় হার্মান ০.৩০ ক্যালিবারের কার্বাইন হাতে একা অসম ও বার্মার মধ্যে যাতাযাত করতেন। বিপজ্জনক অরণ্যপথে ট্রেক করে দেখে আসতেন বিপদসঙ্কুল পথের পরিস্থিতি। এভাবেই বার বার যাতায়াত করতে করতে হার্মান শিখে নিয়েছিলেন স্থানীয় গ্রামবাসীদের ভাষা।

অবহেলিত ও অত্যাচারিত কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের কাছে হার্মান হয়ে উঠেছিল বীরত্বের প্রতীক। কিন্তু তার এই বীরত্ব দেখে হীনমন্যতায় ভুগতেন শ্বেতাঙ্গ সেনা ও অফিসাররা। পদে পদে হার্মানকে তাচ্ছিল্য করতেন তাঁরা। ছেড়ে কথা বলতেন না হার্মানও। জবাব দিয়ে দিতেন মুখের ওপর। কোনও কৃষ্ণাঙ্গ সেনার ওপর অত্যাচার দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। হাতাহাতিতেও জড়িয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। হার্মানকে শায়েস্তা করার জন্য দিনে ষোল ঘণ্টা কাজ করানো হত।

বর্ণবিদ্বেষ জন্ম দিয়েছিল এক আগ্নেয়গিরির

অসহনীয় পরিবেশ, অমানুষিক পরিশ্রম, শ্বেতাঙ্গ সেনা ও অফিসারদের মাত্রাতিরিক্ত দুর্ব্যবহারে প্রবল মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেছিলেন হার্মান। সন্ধ্যা হলেই তাঁকে ঘিরে ধরত একাকিত্ব। বার্মার সীমান্তে তখনও সহজলভ্য ছিল আফিম। অবসাদ কাটাতে হার্মান ধরেছিলেন আফিমের নেশা।

জানতে পেরে চরম অত্যাচার শুরু করেছিলেন শ্বেতাঙ্গ অফিসাররা। হার্মান প্রতিবাদ করায় তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল লেডোর কারাগারে। শুরু হয়েছিল আরও ভয়ানক অত্যাচার। বন্দি করে রাখা হয়েছিল আলো বাতাসহীন ছোট কুঠুরিতে। হার্মান বলতেন, সাহস থাকে তো হাতকড়া খুলে দিয়ে মারো। ফলে প্রহারের মাত্রা আরও বেড়ে যেত।

দু’সপ্তাহ পরে লেডোর কারাগার থেকে হার্মানকে আবার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর কর্মস্থলে। ভেঙে পড়া হার্মানকে দেখে চমকে উঠেছিলেন তাঁর সঙ্গীরা। খুশি হয়েছিলেন শ্বেতাঙ্গ সেনা ও অফিসাররা। কারও সঙ্গে কথা বলতেন না হার্মান। শুরু হয়েছিল রক্ত-আমাশা। শরীর অত্যন্ত দুর্বল থাকায় কাজেও মন ছিল না। কর্তব্যে অবহেলা করার জন্য একদিন হার্মানকে সবার সামনে মারাত্মক অপমান করেছিলেন শ্বেতাঙ্গ লেফটেন্যান্ট হ্যারল্ড ক্যাডি। পরদিন সকালের লাইনে খুঁজে পাওয়া যায়নি হার্মানকে।

 আগ্নেয়গিরি ঘটিয়েছিল বিস্ফোরণ

দিনটি ছিল ১৯৪৪ সালের ৫ মার্চ।তন্নতন্ন করে খোঁজা শুরু হয়েছিল হার্মানকে। দুপুরের দিকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তাঁকে। পিঠে ব্যাকপ্যাক ও হাতে কার্বাইন নিয়ে, লেডো রোড দিয়ে প্রায় টলতে টলতে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটি হেঁটে চলেছেন বার্মার দিকে। হার্মানের পাশে থেমেছিল লেফটেন্যান্ট হ্যারল্ড ক্যাডির জিপ। আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে এসেছিলেন ক্যাম্পে, তাই খালি হাতেই হার্মানের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট। জিপের আওয়াজ পেয়ে পিছন ফিরে তাকিয়েছিলেন হার্মান। দূরত্ব বেশি ছিল না। জিপে বসে থাকা তাঁর সঙ্গীরা দেখেছিলেন হার্মানের চোখে জল। সম্ভবত গতকাল সারারাত হেটেছেন হার্মান, এই বিপজ্জনক অরণ্যপথে।

হার্মান শান্ত গলায় লেফটেন্যান্ট ক্যাডিকে বলেছিলেন,”ফিরে যান লেফটেন্যান্ট, আমার রাস্তায় আসবেন না।” হার্মানের কাঁধের পোশাক হাত দিয়ে চেপে ধরেছিলেন লেফটেন্যান্ট ক্যাডি। চকিতে ঘুরে গিয়েছিলেন হার্মান। কার্বাইনের নলটা ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট ক্যাডির বুকে। চিৎকার করে বলেছিলেন, “ফিরে যান লেফটেন্যান্ট, আমার রাস্তায় আসবেন না।” লাল টকটকে চোখ দুটো দিয়ে তখনও টপ টপ করে জল পড়ছিল।

কথা না শুনে লেফটেন্যান্ট ক্যাডি বন্দুকটি কেড়ে নিতে গিয়েছিলেন। পর পর দু’বার ট্রিগার টিপে দিয়েছিলেন হার্মান। লেডো রোডের ওপর আছড়ে পড়েছিল লেফটেন্যান্ট ক্যাডির মৃতদেহ। জিপে বসা সঙ্গীদের শেষবারের মত দেখে নিয়ে, তিরের বেগে দৌড়াতে শুরু করেছিলেন হার্মান পেরি। সেনার জিপ ছুটেছিল উলটো দিকে। ক্যাম্পের পথে।

শুরু হয়েছিল এক বিশাল তল্লাশি অভিযান

কৃষ্ণাঙ্গ সেনার হাতে শ্বেতাঙ্গ অফিসারের মৃত্যুতে চমকে উঠেছিল আমেরিকা। গভীর অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া হার্মান পেরিকে খুঁজতে নামিয়েছিল বিশাল বাহিনী। তবে এই ঘটনার পর থেকে কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের ওপর অত্যাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই কৃষ্ণাঙ্গ সেনারা মনেপ্রাণে চাইতেন, হার্মান যেন ধরা না পড়েন।

অরণ্যের সবথেকে দুর্গম ও ভয়ঙ্কর অংশটি চিনতেন হার্মান। যেখানে যেতে ভয় পেতেন আমেরিকান সেনারা। সেখানেই আত্মগোপন করেছিলেন হার্মান। অরণ্যের ভেতর হেঁটে চলেছিলেন উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে। বুনো ফল এবং ঝর্নার জল খেতেন। রাত কাটাতেন গাছের ওপরে। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে একদিন চোখে পড়েছিল অরণ্যের ভেতরে থাকা এক জনপদ। সেখানে পৌঁছে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাঁশ দিয়ে তৈরি শুয়োরের খোঁয়াড়ের ছাদে। গ্রামটি ছিল হেইমি নাগাদের ডেরা। ভয়ঙ্কর হেইমি নাগারা মুণ্ডশিকারি হিসাবে কুখ্যাত ছিল এলাকায়। তাই তাদের কাছে কেউ ঘেঁষত না।

আপন করে নিয়েছিল মুণ্ডশিকারিরা

তাদের গ্রামে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে দেখে অবাক হয়েছিল নাগারা। স্থানীয় ভাষায় হার্মান কথা বলেছিলেন নাগাদের দলপতির সঙ্গে। দলপতিকে উপহার দিয়েছিলেন ব্যাকপ্যাকে থাকা টিনের খেজুর ও মাংস। হার্মানের কার্বাইনটি নেড়েচেড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন নাগা দলপতি। যুবক হার্মানকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁর গ্রামে। ধীরে ধীরে নাগাদের একজন হয়ে গিয়েছিলেন হার্মান। নাগাদের সমাজজীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিলেন।

নাগাদের মত পোশাক পরতেন হার্মান। একসঙ্গে শিকার করতে যেতেন। নাগা দলপতি তাঁর চোদ্দ বছরের মেয়ের সঙ্গে হার্মানের বিয়ে দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন একখণ্ড চাষের জমিও। নর্থ ক্যারোলিনার হার্মান পেরি, মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে হয়ে গিয়েছিলেন হেইমি নাগা। এভাবেই কেটে গিয়েছিল প্রায় ছ’মাস। কিন্তু পাহাড়ে পাহাড়ে খবর ছড়িয়ে গিয়েছিল, এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর হেইমি নাগাদের সঙ্গে।

একমাত্র উপায় এনকাউন্টার

খবর এসেছিল আমেরিকার গোয়েন্দাদের কাছেও। কিন্তু হার্মানকে ধরতে হেইমি নাগাদের গ্রামে যাওয়া অসম্ভব। কারণ গ্রামে পৌঁছনোর আগেই অরণ্যের অন্ধকার থেকে বিষ তির উড়ে এসে প্রাণ নিয়ে নেবে। তাই ঠিক হয়েছিল, গ্রামের বাইরে এনকাউন্টার করে মেরে ফেলা হবে হার্মানকে। লাগানো হয়েছিল স্থানীয় চর।

এরপর একদিন আমেরিকার সেনার রাইফেলের পাল্লায় এসে গিয়েছিলেন হার্মান। গুলি লেগেছিল হার্মানের গোড়ালিতে। গভীর খাদে ঝাঁপ মেরে পালিয়ে গিয়েছিলেন আহত হার্মান। কিন্তু গোড়ালির আঘাত ক্রমশ কাবু করে ফেলছিল হার্মানকে। নাগাদের জড়িবুটিতেও ক্ষত সারছিল না।

হার্মান জানতেন তিনি কী করেছেন এবং তার পরিণতি কী। তিনি জানতেন, তাঁকে ক্ষেপা হায়নার মত খুঁজছে মার্কিন সেনারা। পাছে ধরা পড়েন, রাতে থাকতেন গ্রামের বাইরের পাহাড়ে। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। আবার একদিন হার্মান পড়ে গিয়েছিলেন আমেরিকার সেনার রাইফেলের পাল্লায়। এবার গুলি লেগেছিল হার্মানের অ্যাকিলিস টেন্ডনে। চলার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন হার্মান। সরীসৃপের মত বুকে হেঁটে, রক্তাক্ত হার্মান নিজেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন একটি পাথরের আড়ালে। তারপর জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

 জ্ঞান ফিরেছিল মার্কিন সেনার ক্যাম্পে

কোর্ট মার্শাল হয়েছিল তাঁর। লেফটেন্যান্ট ক্যাডিকে হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল হার্মানকে। হাতে পায়ে বেড়ি পরিয়ে হার্মানকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল লেডোর কারাগারে। চলছিল হার্মানকে ফাঁসি দেওয়ার প্রস্তুতি। কিন্তু শিকল ভেঙে কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন হার্মান। তবে পায়ের ক্ষতের জন্য হারিয়ে ফেলেছিলেন তিরের বেগে ছোটার ক্ষমতা। দূরে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। তাই লেডোর কাছে থাকা গভীর অরণ্যে আত্মগোপন করেছিলেন।

শুরু হয়েছিল বন্যপশুর মত সারাদিন ধরে অরণ্যের ভেতর ঘোরা ও খাবার খোঁজা। বিশাল বাহিনী নিয়ে হার্মানের খোঁজে নেমেছিল মার্কিন সেনা। নামানো হয়েছিল স্নিফার ডগ। কিন্তু হার্মানের খোঁজ পাওয়া যায়নি। কেটে গিয়েছিল মাসের পর মাস। এসে গিয়েছিল ১৯৪৫ সাল।

হার্মানের পায়ের ক্ষত পরীক্ষা করা হচ্ছে

হাতছানি দিয়েছিল মৃত্যু

আহত হার্মান খোলা আকাশের নীচে কাটিয়েছিলেন পাহাড়ের দুঃসহ শীত। গায়ে ছিল না কোনও শীতবস্ত্র। পায়ের ক্ষত ক্রমশ পচতে শুরু করেছিল। ভয়ানক অপুষ্টির শিকার হতে শুরু করেছিলেন হার্মান। বাধ্য হয়ে একদিন পৌঁছে গিয়েছিলেন অরণ্যের কিনারায় থাকা চা বাগানের শ্রমিকবস্তিতে।

চা শ্রমিকরা ভেবেছিলেন হার্মান যুদ্ধে আহত কোনও সৈনিক। তাঁরা হার্মানকে আশ্রয় ও খাবার দিয়েছিলেন। তাঁদের সেবায় কিছুটা সুস্থ্ হয়ে উঠেছিলেন হার্মান। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে তাঁর খবর পৌঁছে দিয়েছিল চর। ১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ, মার্কিন সেনার হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হার্মান পেরি। তাঁর সুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেনি মার্কিন সেনা। ১৫ মার্চ ভোরে, লেডোর কারাগারে বাইশ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ধরা পড়ে যাওয়ার পর হার্মান পেরি

জন হেনরিদের মৃত্যু হয় না

বিশ্ব জানে জন হেনরির কথা। যিনি শ্বেতাঙ্গ ঠিকাদারদের আমদানী করা স্টিম ড্রিল মেশিনের সঙ্গে পাহাড়ে গর্ত করার লড়াইয়ে নেমেছিলেন। একটি মাত্র হাতুড়ি সম্বল করে, নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব।

পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পাহাড়ি সুড়ঙ্গে মেশিনের সঙ্গে পেশীর লড়াইয়ে জিতে, বীরের মত ছেড়েছিলেন পৃথিবী। জন হেনরি তাই আজ সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কাছে বীরত্ব ও প্রতিবাদী মানসিকতার প্রতীক। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কৃষ্ণাঙ্গদের জয়ের প্রতীক।

ফাঁসির একদিন আগে হার্মান পেরি

পাহাড় কেটে রাস্তা বানাতে এসেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক হার্মান পেরিও। তিনিও বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে। তাঁর জন্যেই কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের ওপর আর অত্যাচার করার সাহস করেনি মার্কিন সেনার শ্বেতাঙ্গ অফিসারেরা। আসলে জন হেনরিদের মৃত্যু হয় না। এভাবেই জন হেনরিরা যুগে যুগে আবির্ভূত হন, অন্য পরিবেশে, অন্য পটভূমিকায়, অন্য নামে। এভাবেই তাঁরা জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে যান নিপীড়িত সঙ্গীদের।

তথ্যসূত্র: Now the Hell Will Start by Brendan I. Koerner,  Manhunt in Burma and Assam: World War II in the China-Burma-India Theater by Earl Owen Cullum 

চিত্র কৃতজ্ঞতা:   www.murderpedia.org, www.pacificatrocities.org, www.beardedtravelingsoul.com, www.thetrentonline.com, www.military.com

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More