২০০১-এর ভোট : দুই পক্ষের সেনাপতি বদল, কেশপুর-গড়বেতায় রক্তক্ষয়, জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর তৎপরতা

দ্য ওয়াল ব্যুরো : পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত চারটি বিধানসভা ভোট হয়েছিল একতরফা। কংগ্রেস আদপেই সুবিধা করতে পারেনি। ‘৮২ সাল থেকে বিজেপি রাজ্যে প্রার্থী দিচ্ছে। কিন্তু তারা একটা আসনও পায়নি। ওইসময় সিপিএম তথা বামফ্রন্ট বিপুলভাবে জিতত। প্রতিবার ভোটের পরে বিরোধীরা রিগিং ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলত ঠিকই কিন্তু কিছু প্রমাণ করতে পারেনি।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল ‘৯৮ সাল থেকে। ওই বছরের শুরুতে কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘ আড়াই দশকের সম্পর্ক ছেদ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরি করলেন নতুন দল। তার নাম অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। বছর দু’য়েক বাদে ২০০০ সালে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়লেন জ্যোতি বসু। অর্থাৎ নতুন শতকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে শাসক ও বিরোধী, দু’পক্ষেরই সেনাপতি বদল হল। শাসক শিবিরের অধিনায়ক হলেন বুদ্ধদেব। বিরোধী শিবিরের অবিসংবাদী নেত্রী হলেন মমতা।

২০০০ সাল নাগাদ মেদিনীপুরের কেশপুর-গড়বেতা অঞ্চলে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষ শুরু হয়। বহু মানুষ হতাহত হন। তার সূত্রপাত হয়েছিল একটি উপনির্বাচন থেকে।

সিপিআই নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায় মারা যাওয়ার পরে পাঁশকুড়া আসনে উপনির্বাচন হয়। সকলকে চমকে দিয়ে বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা গুরুদাস দাশগুপ্তকে পরাজিত করেন তৃণমূলের বিক্রম সরকার।

এই পরাজয়ের মধ্যে অশনি সংকেত লক্ষ করলেন সিপিএম নেতারা। তাঁরা হিসাব করে দেখলেন পাঁশকুড়া বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত পিংলা, সবং, কেশপুর, দাসপুর ও নন্দনপুরে কম ভোট পেয়েছেন বাম প্রার্থী। সাতের দশক থেকে বামফ্রন্টের জনসমর্থন ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলে। শহরে ততদিনে তাদের ভিত নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং যে করেই হোক গ্রামাঞ্চল দখলে রাখতে ঝাঁপাল সিপিএম।

সিপিএম পার্টির অনিল বিশ্বাস রাজ্য রাজনীতিতে চাণক্য বলে পরিচিত ছিলেন। পাঁশকুড়ায় উপনির্বাচনের পরে তিনি ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তিনজনের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। তাঁরা হলেন মন্ত্রী সুশান্ত ঘোষ, বাঁকুড়া জেলা সিপিএমের সম্পাদক অমিয় পাত্র এবং আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ অনিল বসু। সেই বৈঠকে গ্রামাঞ্চলে জমি পুনর্দখলের ছক কষা হয়।

ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, পাঁশকুড়া, বিষ্ণুপুর ও আরামবাগ, এই পাঁচটি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৩৫ টি বিধানসভা আসন আছে। সিপিএম স্থির করেছিল, তার মধ্যে অন্তত ৩০ টি তৃণমূলের হাত থেকে দখল করতে হবে। শোনা যায়, সেই পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও হুগলি জেলার পুলিশ সুপার বদল করা হয়। পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তায় সিপিএমের সশস্ত্র সমর্থকরা গ্রাম দখল শুরু করে।

সেই সময় অন্ধ্রের জনযুদ্ধ গোষ্ঠী জঙ্গলমহলে সংগঠন গড়তে চেষ্টা করছিল। তারা সিপিএমের সঙ্গে হাত মেলায়। ২০০০ সালের ১৩ জুলাই গড়বেতার চমকাইতলা থেকে শুরু হয় তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযান। ৩১ অগাস্টের মধ্যে গড়বেতা দখল হয়। সেপ্টেম্বরের মধ্যে কেশপুর থেকেও তৃণমূল উৎখাত হয়।

২০০০ সালের ২৭ জুলাই নানুরের সূচপুরে ১১ জন ভূমিহীন কৃষক খুন হন। সিপিএম দাবি করে, তারা ডাকাত ছিল। তাই জনরোষের বলি হয়েছে। ২০০১ সালের ৪ জানুয়ারি গড়বেতার ছোট আঙ্গারিরা গ্রামে জনৈক বক্তার মণ্ডলের বাড়িতে গোপনে জড়ো হয়েছিলেন কয়েকজন তৃণমূল নেতা। অভিযোগ, সিপিএমের দুই দাপুটে নেতা তপন ঘোষ ও সুকুর আলির নেতৃত্বে বন্দুকবাজরা বক্তার মণ্ডলের বাড়িতে হানা দেয়। বাড়ি ঘিরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। তৃণমূলের বেশ কয়েকজন মারা যায়। পরে শোনা গিয়েছিল, দেহগুলি তপন-সুকুর বাহিনী মেজিয়ার পরিত্যক্ত কয়লাখনিতে পুঁতে ফেলেছে।

২০০১ সালের ভোটের আগে দক্ষিণবঙ্গের এক বড় অংশ থেকে তৃণমূলকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশা ছাড়েননি। তিনি সম্ভবত ভেবেছিলেন, সিপিএমের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মানুষ তৃণমূলকে ভোট দেবে।

১৯৯৯ সালে মমতা যোগ দিয়েছিলেন এনডিএ-তে। অটলবিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় পেয়েছিলেন রেলমন্ত্রীর পদ। ২০০১ সালের শুরুতে তহেলকা স্টিং অপারেশনে কয়েকজন বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মমতা বিজেপি জোট থেকে বেরিয়ে আসেন। ২০০১ সালের ভোটের আগে তাঁর সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হয়।

২০০১ সালের মে মাসে বিধানসভা ভোট হয়। সেইসময় ব্যাপক টেনশন ছিল। মানুষ ভাবছিল ভোটকে কেন্দ্র করে আর একদফা গণ্ডগোল শুরু হবে। সৌভাগ্যবশত তা হয়নি।

ফলাফল বেরোতে দেখা যায়, জিতে গিয়েছে বামফ্রণ্ট। তবে সিপিএমের আসন আগের বারের চেয়ে কিছু কমেছে। তৃণমূল পেয়েছে ৬০ টি আসন। জিততে না পারলেও কংগ্রেসকে পিছনে ফেলে বিরোধী দলের মর্যাদা আদায় করে নিয়েছে তারা।

এই ভোটের পরে তৃণমূল সমর্থকেরা মুষড়ে পড়েন। পাঁচবছর তাঁদের বিশেষ সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। ২০০৬ সালে সিঙ্গুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় মমতার দলের জয়যাত্রা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More