বাংলায় ‘৫২-র ভোট: কংগ্রেসের জয়জয়কার, হিন্দুত্ববাদীদের ভরাডুবি, কোনওমতে অস্তিত্বরক্ষা বামেদের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিধানসভা ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েছে। চারদিকে দলবদল, চাপান-উতোর আর চড়া পর্দায় রাজনৈতিক প্রচারের মধ্যে একবার দেখে নেওয়া যাক, পশ্চিমবঙ্গে আগের ভোটগুলো কেমন ছিল। তাহলে বোঝা যাবে, গত ৭০ বছরে রাজ্য রাজনীতি কোন পথে এগিয়েছে।

স্বাধীনতার পরে প্রথমবার রাজ্যে নির্বাচন হয় ১৯৫২ সালে। তখন লোকসভা ও বিধানসভা ভোট একসঙ্গে হত। পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা আসনের সংখ্যা ছিল ৩৪। বিধানসভা আসন ছিল ২৩৮টি।

সেই সময়টা ছিল এখনকার থেকে অনেক আলাদা। রাজনীতিতে এত টাকার আমদানি ছিল না। রাজনীতির ভাষা ছিল সংযত। ব্যক্তিকুৎসা ছিল না বললেই চলে। রাজনীতিকদের সততা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারত না। অতীতে তাঁরা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। ব্রিটিশ সরকারের মোকাবিলা করতে গিয়ে বহুবার লাঠি-গুলির মুখে পড়েছেন। দীর্ঘদিন কারাবাস করেছেন। তাঁদের এক বড় অংশ ছিলেন চিরকুমার। দেশসেবা করবেন বলে বিবাহ করেননি। তাঁরা পাবলিকের টাকা চুরি করবেন, কেউ ভাবতেই পারত না।

A Polling Officers affixes indelible ink mark on the fore-finger of a voter before allowing her to cast the vote.

সেযুগে রাজ্যে তথা দেশে সবচেয়ে বড় দল ছিল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গে তার নেতৃত্বে ছিলেন প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক বিধান রায়। এছাড়া ছিলেন অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল সেন, কালীপদ মুখোপাধ্যায়ের মতো নামডাকওয়ালা নেতা। তাঁরা জনসভা করলে বহু লোকের ভিড় হত।

কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন বামপন্থীরা। সবচেয়ে বড় বামপন্থী দল ছিল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া। এছাড়া আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরসিপিআই, কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি, সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান পার্টি, বলশেভিক পার্টির মতো দলও ছিল। শেষে উল্লিখিত তিনটি দলের এখন আর অস্তিত্ব নেই।

‘৫২-র ভোটে বামপন্থীরা দু’টি জোটে ভাগ হয়ে লড়াই করেছিলেন। একটি জোটে ছিল সিপিআই। তাদের সঙ্গী ছিল ফরওয়ার্ড ব্লক (মার্কসবাদী), সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান পার্টি এবং বলশেভিক পার্টি। অপর বাম জোটে ছিল ফরওয়ার্ড ব্লকের অন্য একটি গোষ্ঠী, সোশ্যালিস্ট পার্টি, রেভলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টির একটা অংশ এবং আরও কয়েকটি ছোট বামপন্থী গ্রুপ।

হিন্দুত্ববাদীরা সেযুগেও ছিল। ভারতীয় জনসংঘ এবং অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা নামে দু’টি দল ‘৫২-র ভোটে লড়াই করেছিল। জনসংঘের নেতা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

ভোটে উদ্বাস্তুরা ছিলেন এক বড় ফ্যাকটর। তার পাঁচ বছর আগেই দ্বিখণ্ডিত হয়েছে ভারত। লক্ষ লক্ষ মানুষ পিতৃপুরুষের দেশ হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। তাঁদের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করতেন বামপন্থীরা।

কংগ্রেস প্রার্থী দিয়েছিল বিধানসভার ২৩৬টি আসনে। পেয়েছিল ১৫০টি আসন। মোট আসনের ৬৩.৫৬ ছিল তাদের দখলে। তারা পেয়েছিল ৩৮.৮২ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সেবার কংগ্রেসের জয়জয়কার হয়েছিল ঠিকই কিন্তু শতাংশের বিচারে তাদের অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না।

কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি ১৩৬ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছিল ১৫টি। কমিউনিস্ট পার্টি ৮৬ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছিল ২৮ টি। ভারতীয় জনসংঘ ৮৫ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছিল ন’টি। হিন্দু মহাসভা ৩৩ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছিল চারটি।

ভোটের কয়েকবছর আগে, ১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলায় ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিশেষ পাত্তা পায়নি। বরং নেহরুর সমাজতন্ত্রের নীতিতেই বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল মানুষ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More