ইউরোপের সমর্থকরা যা পারেন, আমরা তা পারি না, তাই সুপার লিগ বাতিল হয়, চলে আইএসএল!

শুভ্র মুখোপাধ্যায়

ইউরোপে ফুটবল সমর্থকদের রোষানলে পড়ে সুপার লিগ স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশে সমর্থকদের বিপ্লবের ঘটি ডোবে না।
রাতারাতি পাশার দান উলটে দিয়েছেন লন্ডনের নামী ক্লাবগুলির সমর্থকরা। তাঁরা ক্লাব ঘেরাও করে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। ব্যানার, পোস্টারে লেখা ছিল, ‘‘অর্থের পিছনে ছোটা নয়, ফুটবলের প্রতি প্রেম দেখান, ওটাই আসল।’’
যেদিন সুপার লিগ নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরিন্তিনো পেরেজ সাংবাদিক সম্মেলন করে জানালেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নয়, আমাদের লিগই হবে ইউরোপের ফুটবলের সূচক। তারপরেই ধিকধিক করে জ্বলছিল প্রতিবাদের আগুন।
অর্থই যেখানে শেষ কথা, সেখানে মোট ১২টি ক্লাব একজোট হয়ে গেল। একদিকে থাকল অর্থের লোভ, অন্যদিকে রাখা হল চিরন্তন আবেগকে। কোনটি বেশি শক্তিশালী, ভালবাসা না মোহ? ফুটবলের জন্য অর্থ, না অর্থের জন্য ফুটবল, কোনটি বেশি প্রাসঙ্গিক!
সুপার লিগ কর্তা-ব্যক্তিদের ইচ্ছে ছিল, সাড়ে তিন হাজার কোটি যৌতুক দিয়ে ২০টি ক্লাবকে কিনে নেওয়া। তারপর ২০টি দলকে নিয়ে লিগ চালু করা, যাতে অন্য ছোট ক্লাবগুলি অচিরেই অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। উঠে যাবে প্রমোশন ও অবনমন। এই নিয়ম ফুটবলের বিরোধী, সেটি বুঝতে পেরেই কর্পোরেট লিগের প্রতিবাদে নেমে পড়ল সমর্থকরা। তাঁরা রাস্তায় ধর্না দিলেন।
মুখ খুললেন পেপ গুয়ার্দিয়লা, জুরগেন ক্লপের মতো বরেণ্য কোচেরা। এমনি বেকহ্যাম, রবি ফাউলারের মতো ফুটবলাররাও বিরোধিতা করলেন এই নয়া লিগ নিয়ে।
আমাদের দেশে যা কল্পনাই করা যায় না। এখানে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মধ্যেও একতার অভাব। তাঁরা নিজেদের মধ্যে এত ইগো সমস্যায় ভোগে, ভাবেন, ওদের হয়ে আমরা প্রতিবাদ করব কেন? কিন্তু লন্ডনে দেখা গেল, আর্সেনাল, ম্যান ইউনাইটেড, ম্যান সিটি, চেলসির সমর্থকরা সবাই একযোগে রাস্তায় নেমেছেন।
আমাদের ভারতে যা সম্ভবই নয়, এমনকি বাংলা ফুটবলকে বোঝানো হতো ফুটবলের পীঠস্থান, তাদের সমর্থকদের মধ্যেও এই মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধতা বলে কোনও বস্তু নেই। সবটাই ফাঁকা আওয়াজ। এমনকি প্রাক্তন ফুটবলারাও সবাই নিশ্চুপ হয়ে রইলেন, পাছে যদি ফেডারেশনের আগামী দিনের জন্য কোনও বড় পদ হারাতে হয়। কিংবা অনেকে আবার সহকারি কোচ, নিদেনপক্ষে কোনও দলে ছোট-মাঝারি কোচ হয়ে গেলেও ভাল চুক্তির অর্থ পাবেন, এই আশাতে মুখটাই খুললেন না।
না হলে আই লিগের সমান্তরাল লিগ শুরু হওয়া যখন ভারতে তুমুল বিরোধিতা চলছে, সেইসময় মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল কর্তারা ফেডারশনের বিপক্ষে কিছু বলতেই পারলেন না। তাঁদের পরিচালনা করল রিলায়েন্স গোষ্ঠী, আরও ভাল করে বললে নীতা আম্বানিরা।
মোহনবাগানের এক শীর্ষ কর্তা তাঁর হেস্টিংসের অফিসে ডেকে আইএসএল-র বিরোধিতা নিয়ে কতসব কাগজপত্তর দেখিয়েছিলেন। যা নিয়ে আদালত পর্যন্ত যাওয়ার হুমকি দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেটি যে পর্বতের মূষিক প্রসব ছিল, সেটি বোঝা গিয়েছিল একবছরের মধ্যেই।
ময়দানের দুই প্রধানের কর্তাদের বক্তব্য, আমাদের ইউরোপ দেখিয়ে লাভ নেই, আমাদের তো সমর্থকদের পয়সায় ক্লাব চলে না। ভাল স্পনসর না পেলে অচিরেই আমাদের মতো ক্লাব বন্ধ হয়ে যাবে। হয়তো এটা তাঁদের এটা অজুহাত, দুই প্রধান পাবলিক ক্লাব, এই কথা তাঁরা আবেগ দেখানোর সময় বলেন। আর যখন কর্পোরেটের অঙ্গুলিহেলনে বড় কোনও সিদ্ধান্তের কথা আসে, সেইসময় আর্থিক অপ্রতুলতার প্রসঙ্গ টানা হয়।
একটা সময় মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল কর্তারা একজোট হয়ে নয়, আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, আমরা আইএসএল নয়, আই লিগই খেলতে চাই। কিন্তু ইডি ও সিবিআই হানায় যখন দুই দলের কর্তারা জেরবার, সেইসময় বহু কোম্পানি দুই ক্লাবকে স্পনসরের বিষয়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল। কারণ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সমস্যা রয়েছে, এই অভিযোগে।
তারপর যেই এটিকে আধিকারিকরা (মূলত গোয়েঙ্কা গোষ্ঠী) স্পনসরের বিষয়ে আগ্রহ দেখাল, আইএসএল খেলার জন্য ১৫ কোটি টাকা দিতে রাজি হয়ে গেল, অমনি রাজি হয়ে গেল আইএসএলে খেলার বিষয়ে।
এখন সবুজ মেরুন সমর্থকদের একাংশ #রিমুভ এটিকে স্লোগান রাখছেন, কিন্তু বিয়ের আগে আশীর্বাদের সময় তাঁরাই হাত-পা গুটিয়ে বসেছিলেন। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরে ডিভোর্সের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। সেইসময় তাঁদের ওই বিদ্রোহ কোথায় ছিল?
লাল হলুদের অবস্থা আরও হতশ্রী। তারা নিজেদের যুক্তিতে অনড়ই থাকতে পারলেন না। তারাও হাত তুলে দিয়েছিল ১৫ কোটি টাকা আইএসএলের এন্ট্রি ফি দিতে পারবে না বলে, কিন্তু ইনভেস্টর দিতে তারাও আই লিগের ছাতা ত্যাগ করল।
আরও করুণ অবস্থা ফুটবলার ও কোচদের। তাঁরা ধরেই নিয়েছেন, পয়সা যেখানে বেশি সেখানে আমরা যাব। সে যান ক্ষতি কিছু নেই। কিন্তু আই লিগে তাও ভারতীয় কোচরা মূল কোচের চেয়ারে বসতেন। আইএসএলে তাঁরা অনামী বিদেশী কোচদের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছেন। কারণ ফ্রাঞ্চাইজি কর্তারা সাদা চামড়ার লোকদের বেশি পছন্দ করে। তাঁরা মনে করে, অর্থই যদি ঢালতে হয়, তা হলে ইউরোপের দ্বিতীয় ডিভিশনের কোচদের নিয়ে এসে দলকে খেলাব।
ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও সেই একই বিষয়। নতুন কোনও ফুটবলার ওঠা তো দূরের কথা, দেশের বুকে ভাল কোনও অ্যাকাডেমি পর্যন্ত নেই। সব ওই ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক ‘মরসুমী লিগ’, বাকি সময় দেশের সাধারণ মানের ফুটবলাররা আঙুল চোষা ছাড়া কোনও কাজ নেই। কারণ ফেডারেশন তো সর্বভারতীয় সব টুর্নামেন্ট বন্ধ করে বসে রয়েছে। রোভার্স, ডুরান্ড, বরদলুই, ডিসিএম, নাগজি, এয়ারলাইন্স সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শিল্ড আবার আইএফএ-র সৌজন্যে পাড়ার টুর্নামেন্ট হয়ে গিয়েছে।


আই লিগকেও ফেডারেশন দ্বিতীয় সারির টুর্নামেন্ট করে ফেলল কর্পোরেট কর্তাদের কারসাজিতে। যার ফলে ওই আইএসএল এসে বাকি ছোট দল, অনামী ফুটবলারদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিল। আর এই কাজে সহায়তা করল ভারতের ক্লাব ও ফেডারেশন আধিকারিকরা।
তাঁরা ভারতীয় ফুটবলকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে শীত ঘুম দিয়ে বসে রয়েছেন। আর ভাবছেন কোনওভাবে যদি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের গদিতে বসা যায়, তা হলে বাংলার গর্ব হিসেবে অহঙ্কার ও গর্ব করা যাবে। হয়তো আইএফএ অফিসের পাশে সুতারকিন স্ট্রিট তাঁর নামে রাস্তা হওয়ার দাবি উঠবে সেদিন, আর ভারতীয় ফুটবলের অন্তর্জলী যাত্রাও নিশ্চিত হবে।
তাই তো বলতে হচ্ছে, ইউরোপের সমর্থকরা পারলেও আমাদের বুকের পাটা নেই যে দিল্লির ফেডারেশন হাউসের সামনে ধর্না দেওয়ার। সব ওই ভিক্টোরিয়া হাউস পর্যন্তই ঠিক রয়েছে, তারপর এগোনোর স্পর্ধা নেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More