সেকেন্ড ওয়েভকে ঠেকাতেই হবে

নভেম্বরের শেষ থেকেই যেভাবে করোনা সংক্রমণ কমছিল, তাতে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন অনেকে। মনে হচ্ছিল, এযাত্রা বিপদ কেটে গেল। অতিমহামারী বিদায় নিচ্ছে। ১০০ বছর বাদে সে হয়তো নতুন রূপে ফিরে আসবে। কিন্তু আপাতত আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি।

সংক্রমণ কমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সতর্কতাও হয়ে আসছিল শিথিল। মাস্ক পরা, ভিড়ের মধ্যে না যাওয়া, স্যানিটাইজ করা ইত্যাদি ঠিকঠাক হয়ে উঠছিল না। মহারাষ্ট্র এবং কেরল, এই দু’টি রাজ্যে অবশ্য সংক্রমণ বিশেষ কমেনি। প্রথম দিকে অতিমহামারীর প্রকোপ যথেষ্ট কমিয়ে রেখেছিল কেরল। সবাই প্রশংসাও করেছিল রাজ্য প্রশাসনের। তারপর সম্ভবত তারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে বিপদ ডেকে এনেছে।

আমরা ভাবছিলাম, সারা দেশে যখন কমছে, তখন দুই রাজ্যেও কমবে করোনা। কমতে একটু দেরি হচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমবেই।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন, এখনই নিশ্চিত হওয়ার কারণ নেই। করোনার নতুন নতুন মিউটেশন হচ্ছে। ভাইরাসের নতুন স্ট্রেন আরও অনেক বেশি সংক্রামক। অতিমহামারীর একটা সেকেন্ড ওয়েভ আসে। অনেক সময় তা প্রথম ওয়েভের থেকে বেশি বিপজ্জনক হয়। প্রধানমন্ত্রীও বলেছিলেন, ‘দাওয়াই ভি কড়াই ভি’। অর্থাৎ ভ্যাকসিন এসে গিয়েছে বটে কিন্তু কড়াকড়ি মেনে চলতে হবে।

কিন্তু একবছর ধরে নানা বিধিনিষেধের মধ্যে থেকে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। এসব কথায় কান দেওয়ার মতো মনের অবস্থা ছিল না। তাছাড়া আমাদের দেশের এক বড় সংখ্যক মানুষ দিনমজুরিতে কাজ করেন। রোজ বাইরে না বেরোলে তাঁদের চলে না। কাজে বেরিয়ে অত কড়াকড়িও মেনে চলা সম্ভব হচ্ছিল না।

এইভাবে যখন আস্তে আস্তে চারপাশ স্বাভাবিক হয়ে আসছিল, তখনই দেখা গেল করোনা গ্রাফ উঠছে। খুব ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বাড়ছে করোনা। ২৩ তারিখে জানা গেল, তার আগের এক সপ্তাহে ১৬ টি রাজ্যে বেড়েছে সংক্রমণ। তার মধ্যে সাত-আটটি রাজ্যের অবস্থা উদ্বেগজনক।

স্বাস্থ্যমন্ত্রকের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, এক সপ্তাহে মহারাষ্ট্রে সংক্রমণ বেড়েছে ৮১ শতাংশ। মধ্যপ্রদেশে বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। পাঞ্জাবে বেড়েছে ৩১ শতাংশ। জম্মু কাশ্মীরে বেড়েছে ২২ শতাংশ। ছত্তিসগড় ও হরিয়ানায় বেড়েছে যথাক্রমে ১৩ ও ১১ শতাংশ।

আশার কথা একটাই। সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যুহার বাড়ছে না। গত সোমবার করোনায় দেশে ৭৭ জন মারা গিয়েছেন। গতবছর ৩ মে-র পরে মৃত্যুর সংখ্যা কখনও এত নীচে নামেনি। সাধারণত দেখা যায়, কোনও ভাইরাস যখন প্রথম আসে তার শক্তি থাকে সবচেয়ে বেশি। যত দিন যায়, সে দুর্বল হয়ে আসে। করোনার ক্ষেত্রেও কি তাই হচ্ছে? এক বছর ধরে লক্ষ লক্ষ প্রাণ নেওয়ার পরে কি ক্রমশ কমে আসছে তার মারণক্ষমতা? আশা করি যেন তাই হয়।

আশার সঙ্গে আশঙ্কাও কম নেই। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার সম্ভাবনা আছে যথেষ্টই। ভ্যাকসিন এখন শুধুমাত্র সরকারের হাতে রয়েছে। শোনা যাচ্ছে শীঘ্র খোলা বাজারেও পাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে সরকারের ভরসায় না থেকে নিজেরাই প্রতিষেধক নিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি পুরানো অভ্যাসগুলি ফিরিয়ে আনতে হবে নতুন করে। বাইরে বেরোলে মাস্ক পরতেই হবে। এবং সেই মাস্কে যথাযথভাবে ঢেকে রাখতে হবে নাক-মুখ। এখন অনেকে যেমন মাস্কটা থুতনিতে নামিয়ে রাখছেন, তেমন করলে চলবে না। ঘন ঘন হাত ধোয়া, প্রয়োজনে স্যানিটাইজার ব্যবহার, সবই আগের মতো চালু করতে হবে। বিয়েবাড়ি কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠানে করোনা বিধি মেনে চলতে হবে কঠোরভাবে।

সামনেই আসছে ভোট। তার আগে জনসভা হচ্ছে, হবে। কিন্তু সেখানেও মেনে চলতে হবে সামাজিক দূরত্ব।

মানুষ যদি সতর্ক না হয়, তাহলে হয়তো ফের লকডাউন বা অন্যান্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে সরকার। গতবছর লকডাউনের জন্য অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে এবছর অর্থনীতি ফের বিকশিত হবে। কিন্তু অতিমহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে যদি ফের বেশি কড়াকড়ি করতে হয়, তাহলেই বিপদ। সবকিছু ফের লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে।

দেশের বিপদের সময়ই দেশপ্রেম দেখানোর প্রয়োজন হয়। মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করার জন্যই এখন করোনা সতর্কতা মেনে চলতে হবে কঠোরভাবে। এটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক কাজ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More