তেসরা মে-র পর

সব কিছুরই শেষ আছে। অতিমহামারীও একদিন থেমে যায়। যত শক্তিশালী জীবাণুই হোক, তার ক্ষমতা ফুরিয়ে আসে। করোনার গতিবিধির ওপরে যাঁরা নজর রাখছিলেন, তাঁরা বলছেন, হয়তো ভাইরাস দুর্বল হতে চলেছে। যে দেশটি একসময় করোনাভাইরাসের এপিসেন্টার হয়ে উঠেছিল, সেই ইতালিতে লক্ষণীয়ভাবে কমেছে আক্রান্ত ও মৃতের হার। ফ্রান্স এবং জার্মানিতেও করোনা গ্রাফ প্রায় স্থিতিশীল। যেখান থেকে এই রোগের সূত্রপাত, সেই চিন এখন জোরকদমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ভারতে করোনাভাইরাসের গতি হয়েছে ধীর। আগের চেয়ে দ্রুত অনেক বেশি সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। যে রাজ্যে প্রথম করোনা রোগীর খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল, সেই কেরল ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করেছে। করোনামুক্ত হয়েছে গোয়া। আর পাহাড়ের বুকে ঘুমিয়ে থাকা সিকিম এখনও পর্যন্ত করোনাকে ঢুকতেই দেয়নি।

লকডাউনের মেয়াদ একদফা বেড়েছে। ফের কি বাড়বে? মন্ত্রীরা রাজি নন। গত এক মাস ধরে দেশ অচল। আরও বেশিদিন লকডাউন চললে অর্থনীতির ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে উঠবে। তা বলে একসঙ্গে সবকিছু খুলেও দেওয়া যায় না। দেশের যে অঞ্চলগুলি গ্রিন জোন বলে চিহ্নিত হয়েছে, সেখানে তেসরা মে-র পর থেকে অনেকাংশে শিথিল হবে কড়াকড়ি। অন্যত্র মানতে হবে বিধিনিষেধ। ১৫ মে মন্ত্রীরা ফের খতিয়ে দেখবেন, রেড বা অরেঞ্জ জোনগুলিও স্বাভাবিক হয়ে এসেছে কিনা। যদি দেখা যায়, করোনা রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন, নতুন করে সংক্রমণের খবর নেই, তাহলে সেখানেও একটু একটু করে চালু হবে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ।

আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রক থেকে রোজ যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তাতে দেখা যায়, করোনা থেকে সেরে উঠেছেন তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। আগামী দিনে আরও অনেকে নিশ্চয় সেরে উঠবেন। আমেরিকার জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা বলছে, আক্রান্তদের ৯৭ শতাংশের শরীরেই রোগের লক্ষণ মৃদু। মাত্র তিন শতাংশের অবস্থা সংকটজনক।

তার মানে লকডাউনে কাজ হয়েছে। কিন্তু আত্মসন্তুষ্ট হয়ে পড়লে বিপদ। করোনা হয়তো শক্তি হারাতে বসেছে, তা বলে পরাজিত হয়নি। সতর্কতার সামান্য অভাবেই সে ফিরে আসবে আগের চেয়ে সাংঘাতিক রূপ নিয়ে।

তেসরা মে-র পরেও আমাদের মেনে বজায় রাখতে হবে সামাজিক দূরত্ব। রাস্তায় বেরোলেই ব্যবহার করতে হবে মুখোশ। বড় জমায়েত একেবারে নিষিদ্ধ করতে হবে। কারও দেহে রোগের সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেই যেতে হবে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।

এরকম চলবে আরও এক-দেড় বছর। ততদিনে হয়তো মানুষের শরীরেও তৈরি হয়ে যাবে প্রতিরোধের ক্ষমতা। তাছাড়া বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীরা প্রতিষেধক বার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পরীক্ষায় অগ্রগতিরও খবর আসছে। আশা করা যায়, ভ্যাকসিন এলে দুর্ভাবনা ঘুচবে অনেকাংশে। করোনার সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করা যাবে। কিন্তু তার পরেও কি পুরোপুরি আগের মতো হয়ে যাবে সবকিছু। তেমনটা বোধহয় সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের পৃথিবী যেমন ছিল, পরে আর তেমন থাকেনি। করোনার বিরুদ্ধে যে লড়াই, তাও বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে কম নয়। সুতরাং অতিমহামারীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পরেও আমাদের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More