শুধু নির্বাচন কমিশনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই

আমাদের স্বভাব হল, কোনও বিপদে পড়লেই কাউকে বলির পাঁঠা বানানো। তার ওপরে সব দোষ চাপিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত হই। নিজেদের নির্দোষ প্রতিপন্ন করি। করোনার এই বাড়বাড়ন্তের সময় নির্বাচন কমিশন হয়েছে সেই বলির পাঁঠা।

দেশের করোনা পরিস্থিতি সত্যিই গুরুতর হয়ে উঠেছে। দৈনিক প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন। তাঁদের একাংশের অবস্থা গুরুতর। এত রোগীর চাপ বাড়লে কোনও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ভারতেও এখন হাসপাতালে বেড অমিল, অক্সিজেন অমিল, স্ট্রেচার অমিল, চারদিকে ত্রাহি ত্রাহি রব। দিল্লি ও আরও কয়েকটি শহরে জ্বলছে গণ চিতা। ভারতের কোভিড বিপর্যয়ের দিকে নজর পড়েছে সারা বিশ্বের। অনেকেই বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। স্বাধীন ভারতে এমন অবস্থা আগে কখনও হয়নি।

দেশে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ অতিমহামারীর কবলে পড়ছেন, তখনই চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হয়েছে ভোট। পশ্চিমবঙ্গে এক দফা ভোটগ্রহণপর্ব এখনও বাকি। অন্য জায়গায় শেষ হয়ে গিয়েছে। গণনা হবে ২ মে। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, অতিমহামারীর মধ্যে ভোট করা কি জরুরি ছিল? ভোটের মিটিং-মিছিল-জমায়েতের ফলে কি সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়নি? করোনায় এত মানুষের মৃত্যুর দায় কি নির্বাচন কমিশনের ওপরে বর্তায় না?

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কথাগুলো ঠিকই। সত্যিই তো, করোনার প্রকোপ একটু কমার পরে ভোট করলে কী ক্ষতি হত? মানুষের জীবন কি ভোটের চেয়েও দামি নয়?

এখানে কিন্তু পাল্টা যুক্তিও আছে। কয়েকটা রাজ্যে ভোটের সমাবেশ, মিটিং-মিছিলের জন্য করোনা বেড়ে থাকতে পারে, কিন্তু যেখানে ভোট হয়নি, সেখানে বাড়ল কী করে? আমরা জানি, অতিমহামারী শুরু হওয়ার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে মহারাষ্ট্রে। এখনও রোজ ওই রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে তো ভোট হয়নি। তাহলে সংক্রমণ এত বাড়ল কেন?

শুধু মহারাষ্ট্র নয়, দিল্লি, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, করোনা ঝড়ে সব জায়গার অবস্থাই টলমল। ওই রাজ্যগুলোতেও ভোট হয়নি। সুতরাং সংক্রমণ বাড়ার জন্য শুধু ভোটকে দোষ দেওয়া ভুল।

দ্বিতীয়ত, যেখানে ভোট হচ্ছে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণও কেমন ছিল?

ভোটের আগে বার বার বলে দেওয়া হয়েছিল, প্রচার করতে হবে কোভিড বিধি মেনে। কেউ কি তা করেছে? মিটিং-মিছিলে ক’জনের মুখে মাস্ক ছিল। কোনও দলই কি জনসমাবেশে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলেছে? মনে রাখতে হবে, দেশে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ এসেছে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে। তখন প্রচার চলছে পুরোদমে। রোজ করোনাগ্রাফ উর্ধ্বমুখী হচ্ছে দেখেও কারও হুঁশ হয়নি। যে রাজনীতিকরা দেশ শাসন করেন, তাঁরা যদি এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হন, একা নির্বাচন কমিশন কী করবে? মানুষ যদি সতর্ক না হয়, কোনও আইনই কি তাদের বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে?

নির্বাচন কমিশনের তরফে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। তারা এবারের ভোটে বুথের সংখ্যা বাড়িয়েছে। কোনও বুথে যাতে বেশি ভিড় না হয়, সেজন্য এই ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গে আট দফায় ভোট করার জন্য অনেকে কমিশনকে দোষ দিচ্ছেন। বাস্তবে এর দায়ও রাজনীতিকদের ওপরে বর্তায়। একসময় সিপিএম ভোট চুরির ব্যাপারটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। পরে তৃণমূলের আমলেও সেই ট্রাডিশন বজায় আছে। চুরি বন্ধ করার জন্যই দফায় দফায় ভোট করতে হয়েছে।

এপ্রিলের মাঝামাঝি এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অ্যাঙ্কর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, এই মুহূর্তে রাজ্যে কোভিড পরিস্থিতি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে?

ওই অ্যাঙ্কর নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে বলেন, অতিমহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে মারা গিয়েছেন সাড়ে ১০ হাজার মানুষ। মমতা বলেন, এরকম কোনও তথ্য তাঁর কাছে নেই।

অদ্ভূত ব্যাপার! রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষে যিনি বসে আছেন, তিনিই জানেন না, কত লোকের জীবনহানি হয়েছে। এর পরেও কি সেকেন্ড ওয়েভের জন্য সব দায় নির্বাচন কমিশনের ওপরে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে?

দোষ সাধারণ মানুষেরও আছে। এখন টিকাকরণ কেন্দ্রগুলিতে গেলে দেখা যাবে ষাটোর্ধ্ব মানুষের ভিড়। তাঁরা ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য লাইন দিয়েছেন। তাঁদের তো দু’মাস আগেই টিকা নেওয়ার কথা ছিল। আগে নেননি কেন? আসলে তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, সংক্রমণ যখন কমছে, টিকা না নিলেও চলবে। টিকা নিয়ে অহেতুক ভয়ও ছিল। তারপর যখন দৈনিক সংক্রমণ হয়েছে আকাশছোঁয়া, টিকা নেওয়ার জন্য তাঁরা দৌড়ে এসেছেন।

এখনও কি সবাই করোনা নিয়ে সতর্ক হয়েছে? পুলিশকে রাস্তায় রাস্তায় ঘোষণা করতে হচ্ছে, কেউ মাস্ক ছাড়া বেরোলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা থাকলে কি পুলিশকে এমন বলতে হত?

ভারতের করোনা পরিস্থিতি যে জায়গায় পৌঁছেছে, সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার মোকাবিলা করতে হবে। কাউকে দোষারোপ করে নিজেরা ভাল সাজলে লাভ হবে না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More