পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম পাখি ‘ক্যাসোয়ারি’

পাখি হলেও আকাশে উড়তে পারে না, কমজোরি ডানা ও ওজনের জন্য।

 

দ্য ওয়াল: উচ্চতায় ও ওজনে উটপাখির পরে থাকলেও, হিংস্রতার দিক থেকে পাখিদের মধ্যে ক্যাসোয়ারি দখল করেছে প্রথম স্থান। উত্তরপূর্ব অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় জঙ্গল, নিউগিনি এবং সংলগ্ন কিছু দ্বীপের স্যাঁতস্যাঁতে রেনফরেস্টে দেখতে পাওয়া যায় পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক পাখি ক্যাসোয়ারি

এরা বাস করে দুর্গম অরণ্যের একেবারে গভীরে। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার এবং ষাট কেজি ওজনের ক্যাসোয়ারি বাঁচে প্রায় পঞ্চাশ বছর। স্ত্রী ক্যাসোয়ারি পুরুষ ক্যাসোয়ারির চেয়ে আকারে বড় হয়। তাদের পালকের রঙ বেশি উজ্জ্বল হয়। ক্যাসোয়ারিরা পাখি হলেও আকাশে উড়তে পারে না, কমজোরি ডানা ও ওজনের জন্য।

মসৃণ কালো পালকে ঢাকা থাকে সারা শরীর। গলার পালকের রঙ মায়াবী নীল। গলা থেকে গোলাপী চামড়ার ঝালর ঝোলে। মাথার ওপর ৭ ইঞ্চি লম্বা, চ্যাপ্টা ও প্রচণ্ড শক্ত একটি ঝুঁটি বা ‘ক্যাসক’ থাকে। যা কেরাটিন নামক প্রোটিন দিয়ে তৈরি। শক্ত সূচালো ঠোঁট ও  ক্রুর দৃষ্টি বুকে কাঁপন ধরায়।

ভারী দেহের নীচে থাকে  শক্তিশালী দুটি পা। প্রতিটি পায়ে থাকে তিনটি করে আঙ্গুল। প্রতিটি আঙ্গুলে থাকে শক্ত  নখ। মাঝের আঙ্গুলের নখটি ছুরির ফলার মতো ধারালো। ক্যাসোয়ারি এমনিতে লাজুক পাখি। তবে ভয় পেলে, এরা হয়ে ওঠে ভয়াবহ আক্রমণাত্মক ও নৃশংস।

তীক্ষ্ণ ঠোঁট ও পায়ের আঙুলে থাকা ধারালো নখ দিয়ে মুহুর্তের মধ্যে ফালাফালা করে দিতে পারে যেকোনও প্রাণিকে। মাটি থেকে ৬-৭ ফুট ওপরে লাফিয়ে উঠে শত্রুর ওপরে আক্রমণ হানতে এরা পটু।  ক্যাসোয়ারিরা খুবই নিচুস্বরে ডাকে। তাদের ডাক সচরাচর শুনতে পাওয়া যায় না। তাই আক্রমণের আগে টের পাওয়া যায় না এদের উপস্থিতি।

একটি পুরুষ ক্যাসোয়ারি প্রায় ৭ বর্গ কিলোমিটার জায়গা নিজের দখলে রাখে। সেই এলাকায় অন্য কোনও পুরুষ ক্যাসোয়ারি ঢুকতে পারেনা। ঢুকলেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অনিবার্য। একটি স্ত্রী ক্যাসোয়ারি নিজের দখলে রাখে প্রায় ২০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা। স্ত্রী ক্যাসোয়ারিরা সাধারণত একই জায়গায় থাকে আজীবন। ওই এলাকায় থাকা বিভিন্ন পুরুষ ক্যাসোয়ারির সঙ্গে প্রজনন করে।

গ্রীষ্মের শেষ ও বর্ষার শুরু, এই সময়টা হলো ক্যাসোয়ারিদের প্রজননকাল। এইসময় স্ত্রী ক্যাসোয়ারির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রজনন নৃত্য শুরু করে পুরুষ ক্যাসোয়ারিরা। প্রজনন নৃত্যের সময় পুরুষ ক্যাসোয়ারি মাথাটা মাটির কাছে এনে নাটকীয় ভঙ্গীতে শরীর কাঁপাতে থাকে। মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করে। গলার ঝালরগুলি ফুলে ওঠে।

প্রজননের পর তিন থেকে ন’টি সবুজ রঙের ডিম পাড়ে স্ত্রী ক্যাসোয়ারি। ডিমগুলি গড়ে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা হয়। ডিম পাড়ার পর ডিমের প্রতি সামান্যতমও যত্ন থাকে না স্ত্রী ক্যাসোয়ারির। ডিম পেড়েই স্ত্রী ক্যাসোয়ারি ডিম ফেলে চলে যায় অন্য পুরুষ ক্যাসোয়ারির সঙ্গে প্রজননে লিপ্ত হওয়ার জন্য। 

প্রাক্তন হয়ে যাওয়া পুরুষ সঙ্গী বসে পড়ে ডিমে ‘তা’ দিতে। বাহান্ন দিন পরে ডিম ফুটে শাবকেরা জন্ম নেয়। এই সময়ে বাবা ক্যাসোয়ারিরা ডিম ছেড়ে নড়ে না। এই বাহান্ন দিন না খেয়ে ডিম পাহারা দেয় পুরুষ ক্যাসোয়ারিরা। ডিম ফুটে শাবক জন্ম নেওয়ার পর পুরুষ ক্যাসোয়ারিরা ভীষণ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। শাবকদের কাছে কাউকে ঘেঁষতে দেয় না। প্রায় ন’মাস ধরে মায়ের যত্নে শাবকদের বড় করে তোলে বাবা ক্যাসোয়ারি। বাচ্চারা বড় হয়ে গেলে বাবা তাদের খাবার খুঁজতে শেখায়। বড় হয়ে পুরুষ ক্যাসোয়ারিরা চলে যায় নিজের নিজের এলাকা দখলের উদ্দেশ্যে।

ক্যাসোয়ারিদের মূল খাবার ফল। কোনও গাছে একবার প্রচুর ফল পেয়ে গেলে, গাছ আগলে বসে থাকে ক্যাসোয়ারিরা। অন্য কোনও প্রাণিকে গাছের কাছে ভিড়তে দেয় না। গাছের ফল খেতে দেয় না। গাছ সাবাড় করে তবে এলাকা ছাড়ে।

ফল ছাড়াও ক্যাসোয়ারিরা বিভিন্ন ফুল,ছত্রাক, শামুক, পতঙ্গ, ব্যাঙ, পাখি, মাছ, ইঁদুর, খায়। একটি পূর্ণবয়স্ক ক্যাসোয়ারি দিনে গড়ে প্রায় পাঁচ কেজি ফল খায়। বেশি খাওয়ার ফলে পরিপাক সম্পূর্ণ হয় না। মলের পরিপাক না হওয়া ফল বেরিয়ে আসে। সেগুলি ক্যাসোয়ারিরা আবার খেয়ে নেয়।

নিউগিনির কোনও কোনও আদিবাসীরা গোষ্ঠী ক্যাসোয়ারি পোষেন পালকের দাম থাকায়। তাঁরা ক্যাসোয়ারির মাংসও খান। ক্যাসোয়ারির মাংস অতীব সুস্বাদু হলেও ভীষণ শক্ত। নিউগিনিতে মজাদার একটি প্রবাদ আছে ক্যাসোয়ারির মাংস রান্না নিয়ে। সেটা হলো, ক্যাসোয়ারির মাংস রান্না করার সময় পাত্রে একটা পাথর ফেলা উচিত। পাথরটা গলে গেলে বোঝা যাবে ক্যাসোয়ারির মাংস নরম হয়েছে।

তবুও এই ক্যাসোয়ারিই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক পাখি। এখনও পর্যন্ত ২২১ টি আক্রমণের খবর লিপিবদ্ধ করা আছে, যার মধ্যে ১৫০ টি আক্রমণেরই লক্ষ্য ছিল মানুষ। প্রতি ঘন্টায় ৫০ কিমি গতিতে দৌড়াতে পারে এরা। তিন কিলোমিটার দৌড়ে গিয়ে আক্রমণ করার নজিরও আছে। আছে জলে সাঁতরে গিয়ে আক্রমণ করার নজিরও।

তবে এ পর্যন্ত মাত্র দু’জন মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে ক্যাসোয়ারিরা। একটি অস্ট্রেলিয়ায় ও অপরটি ফ্লরিডায়। আসলে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়েই পালিয়ে যায় ক্যাসোয়ারিরা। যদি আক্রমণের সময় আরও বাড়াত, তাহলে মৃত্যু সংখ্যাও আরও বাড়ত বলে মনে করেন অনেক পক্ষীবিশারদ।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More