শফি বিবির ভ্যান ছুটছে শনশনিয়ে! আগে বইতেন মাতাল স্বামীকে, এখন সাজানো আনাজের পসরা

রোজ নাসিরকে ভ্যানে করে তুলে আনাই যেন কাজ ছিল তাঁর। এদিকে ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে। সংসার চালানোই দায়। এই অবস্থায় ওই ভ্যানকেই সম্বল করেন শফি।

দ্য ওয়াল ব্যুরো, ডায়মন্ড হারবার: ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন নাসির। অভাব থাকলেও, অভিযোগ ছিল না সংসারে তেমন। খুশিই ছিলেন কিশোরী বৌ শফি বিবি। মুশকিল শুরু হল, মদের নেশা নাসিরকে গিলে ফেললে। প্রায়ই খবর আসত, মদ খেয়ে এদিক-ওদিক পড়ে রয়েছেন স্বামী। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে শফি দেখতেন, অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছেন নাসির। গড়াগড়ি খাচ্ছে ভ্যান। উপায় না দেখে, স্বামীকে ভ্যানে তুলে নিজেই সেই ভ্যান টেনে চালিয়ে নাসিরকে ঘরে ফেরাতেন শফি। কিন্তু কে জানত, এই ভ্যান চালানোর অভ্যাসই তাঁর জীবন গড়ে দেবে!

অভাবের সংসারে দাদু-দিদার কাছে বড় হয়ে ওঠে অনাথ শফি। তবে পুরোপুরি বড় হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় ডায়মন্ডহারবারের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শফির। প্রথম দিকে সংসার কিছুটা ভালো হলেও, পরে শুরু হয় সমস্যা। ভ্যানচালক স্বামী নাসির মদের পেছনে ওড়াতে থাকেন রোজগারের সব টাকা। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন বাড়িতে বাসন মাজার কাজ করতে হয় শফিকে। দীর্ঘ চার বছর এভাবে কাটে।

তার পরে দিনকেদিন বাড়তে থাকে নাসিরের নেশা করার পরিমাণ। শুরু হয় শফির ওপর অত্যাচারও। এরই মধ্যে চার ছেলে ও দুই মেয়ের মা হয়েছেন শফি। এদিকে দিনে দিনে সংসারের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। নাসিরের নেশা এত বেড়ে গেল, তিনি আর ভ্যানই চালাতে পারতেন না। এদিক ওদিক পড়ে থাকতেন নেশা করে।

এখান থেকেই শুরু শফির লড়াই। রোজ নাসিরকে ভ্যানে করে তুলে আনাই যেন কাজ ছিল তাঁর। এদিকে ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে। সংসার চালানোই দায়। এই অবস্থায় ওই ভ্যানকেই সম্বল করেন শফি। একদিন জমানো টাকা দিয়ে ফলমূল, সব্জিপাতি কিনে, সেই ভ্যানে সাজিয়ে তাই নিয়ে বাজারে গিয়ে বসেন তিনি। ভারী ভ্যান টানার অভ্যেস আগে থেকেই ছিল। এবার সেই অভ্যেসই কাজে লাগল জীবন চালানোর জন্য।

এখন ৫৫ বছরের প্রৌঢ় তিনি। একে একে বিয়ে দিয়েছেন ছেলেমেয়েদের। এখনও রোজ ভোরবেলা ভ্যান নিয়ে চলে যান বাজারে। সারা দিন পরিশ্রম করেন। কারও সাহায্য নিতে রাজি নন তিনি, নিজের ছেলে হলেও নয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মিহির মণ্ডল বলেন, “একাই বাজারে যান শফি। মাল কেনেন, বিক্রি করেন। কখনও মনে হয় না, এক জন মহিলা এই কাজটা করছেন।” শফির প্রতিবেশী দুলালি বিবি বলেন, “ওকে ছোট থেকেই দেখছি। লড়তে লড়তে সব দুঃখকে হাসিমুখ দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। একাই চলে, কারও তোয়াক্কা করে না। নিজের রোজগারে নিজেই খায়, এটাই ওর জীবন। ছেলেরা কাছে রাখতে চাইলেও শফি কারও বোঝা হয়ে থাকতে চায় না।”

তাই তো লড়াকু শফির একমাত্র সঙ্গী তাঁর সেই ভ্যানটাই। মাতাল স্বামীর ভ্যানই শফিকে এগিয়ে নিয়ে  যাচ্ছে তাঁর জীবন যাত্রার পথে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More